বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও জি এম কাদেরকেই চাই

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০১৯, ২১:৩৯

এইচএম এরশাদের অবর্তমানে তাঁর রেখে যাওয়া দল জাতীয় পার্টির (জাপা) নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে দ্বন্দ্ব আরও প্রকট হচ্ছে। আর এই দ্বন্দ্ব এরশাদপত্নী রওশন এরশাদ ও তাঁর সহোদর জিএম কাদেরকে ঘিরে সৃষ্ট দুটি বলয়ের মধ্যে। জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন, আর রওশন সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হবেন- এতদিন এই ধরনের মানসিক সমঝোতার কথা শোনা গেলেও এখন তা ভেস্তে যেতে বসেছে। রওশন বলয়ের নেতারা যখন প্রকাশ্যে বলেছেন- রওশনই দলের চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হবেন, তখন বিপরীত অবস্থান জানান দিয়েছেন কাদের বলয়ের নেতারাও। গতকাল শনিবার রাজধানীর বনানীতে জাপা কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও সংসদ সদস্যদের যৌথসভায় অংশ নেওয়া মোট ৩৫ জনের মধ্যে বক্তব্য রাখা ১৭-১৮ জনের প্রত্যেকেই তাদের বক্তব্যে প্রায় অভিন্নভাবে বলেছেন, ‘জিএম কাদের দলের চেয়ারম্যান আছেন, থাকবেন; তাঁকে আমরা চেয়ারম্যানের পাশাপাশি সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও দেখতে চাই।’

এই যৌথসভায় সভাপতিত্ব করেন জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের। সভায় অংশ নেওয়া বেশ কয়েকজনের সঙ্গে পৃথকভাবে কথা বলে জানা গেছে, সভায় তাঁকে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও দেখতে চাওয়ার দাবির জবাবে জিএম কাদের বলেছেন, ‘দল গঠনতন্ত্র অনুযায়ী পরিচালিত হয়, হবে। কে কি হবেন, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী এবং সবার সঙ্গে আলোচনা করেই সেব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। যেন পার্টিতে কোনো বিভেদ সৃষ্টি হতে না পারে।’ এসময় জিএম কাদের এ-ও বলেন, জাপায় হয়তো নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা রয়েছে-তবে কোনো দ্বন্দ্ব বা বিরোধ নেই। পার্টি ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। সভা শেষে সংবাদ ব্রিফিংয়ে জাপা মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গাও বলেছেন, বিরোধীদলীয় নেতা কে হবেন সেটি  দলের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ঠিক হবে।

এদিকে, স্বামীর মৃত্যুর কারণে বর্তমানে নিরব রয়েছেন রওশন এরশাদ। ৪০ দিন পর্যন্ত তিনি নিরব থাকবেন বলে তাঁর ঘণিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন। আগামী ২৩ আগস্ট এরশাদের চল্লিশা অতিক্রান্ত হওয়ার পর নিরবতা ভেঙ্গে প্রকাশ্যে তত্পর হবেন তিঁনি। জাপায় রওশন বলয়ের অন্যতম নেতা হিসেবে প্রকাশ্যে সরব ফখরুল ইমাম বৃহস্পতিবার ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘২৩ আগস্টের পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাত্ চাইবেন রওশন। এরপর তিনি করণীয় ঠিক করবেন।’

জানা গেছে, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সংসদের আসন্ন অধিবেশনের আগেই দলের নেতৃত্ব নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা সমাধান করতে চান রওশন। অধিবেশন শুরু হওয়ার আগেই সংসদ ভবনে দলীয় এমপিদের বৈঠক ডাকবেন সংসদের বর্তমান বিরোধীদলীয় উপনেতা রওশন। সেখানে সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা মনোনীত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। সেক্ষেত্রে রওশন নিজেই বিরোধীদলীয় নেতা হতে চাইবেন। রওশন বিরোধীদলীয় নেতা হলে নতুন বিরোধীদলীয় উপনেতা কাকে করা হবে সেটা নিয়েও আলোচনা হবে। জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্য ফখরুল ইমাম ইত্তেফাককে বলেছেন, ‘জাপার চেয়ারম্যান হতে রওশন এরশাদের তেমন আগ্রহ নেই, তবে আমরা চাই তিনি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব গ্রহণ করুন।’

রওশন এরশাদ ও তাঁর সঙ্গে থাকা নেতাদের এই তত্পরতা ও বক্তব্যের প্রেক্ষিতেই গতকালের যৌথসভায় অনেকে জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও দেখতে চাওয়ার দাবি তুলেছেন। বৈঠক সূত্রে জানা গেছে, সভায় দলের প্রেসিডিয়াম সদস্য সালমা ইসলাম, সাহিদুর রহমান টেপা, হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, এটিইউ তাজ রহমান ও অ্যাডভোকেট শেখ সিরাজুল ইসলামসহ যারা বক্তব্য রেখেছেন তারা যুক্তি দেখিয়ে বলেছেন, দলের প্রয়াত চেয়ারম্যান এইচএম এরশাদই মৃত্যুর আগে লিখিতভাবে জিএম কাদেরকে দলের পরবর্তী চেয়ারম্যান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে গেছেন। সুতরাং চেয়ারম্যান পদ নিয়ে কোনো বিতর্কের সুযোগ নেই। আর গঠনতন্ত্র অনুযায়ী চেয়ারম্যানই দলের পার্লামেন্টারি পার্টির প্রধান, সেই হিসেবে জিএম কাদেরই সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হবেন-এটাই স্বাভাবিক। এটা নিয়েও বিতর্ক সৃষ্টি কিংবা বিকল্প ভাবনার অবকাশ নেই।

এই নেতারা সভায় এটাও বলেছেন, এরশাদের মৃত্যুর আগ থেকে শুরু করে এখন পর্যন্ত জিএম কাদেরই দলের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের আগলে রেখেছেন। ধারাবাহিক ও অনেকটা বিরামহীন কর্মসূচির মাধ্যমে তিনি ইতোমধ্যে চেয়ারম্যান হিসেবে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ দিয়েছেন। গত ১৬ জুলাই এরশাদকে রংপুরে দাফন করে এসে জিএম কাদের ঢাকায় কুলখানি ও শোকসভাসহ বিভিন্ন স্থানে দোয়া-মাহফিলে অংশ নিয়েছেন। প্রেসিডিয়াম বৈঠকে সিদ্ধান্ত নিয়ে জামালপুর, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটে বন্যা পরিস্থিতি দেখার পাশাপাশি বন্যার্তদের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। নিয়মিত বনানী কার্যালয়ে বসছেন, চেয়ারম্যান হিসেবে দলীয় তহবিলসহ সাংগঠনিক সকল কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। বিভিন্ন দিবস এবং ডেঙ্গু পরিস্থিতিসহ নানা ইস্যুতে গণমাধ্যমে বিবৃতিও দিয়েছেন। চেয়ারম্যান হিসেবে জাপায় জিএম কাদেরের নেতৃত্ব এখন প্রতিষ্ঠিত। হাতে গোনা কয়েকজন ছাড়া কেন্দ্র থেকে তৃণমূল নেতা-কর্মীদের সবাই তাঁর নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ।

জাপার প্রেসিডিয়ামের দায়িত্বশীল পাঁচজন নেতা ইত্তেফাককে জানান, গতকালের যৌথসভায় জিএম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবেও দেখতে চাওয়ার জোরালো দাবি উত্থাপিত হওয়ায় এটা রওশনের ওপর এক ধরনের চাপ সৃষ্টি করবে। নেতা-কর্মীরা এই দাবি তোলার ফলে রওশন এখন জিএম কাদেরকে চেয়ারম্যান হিসেবে মেনে নিতে নমনীয় হতে পারেন। সেক্ষেত্রে জিএম কাদের এবং তাঁর অনুসারীরাও রওশনকে শেষ পর্যন্ত সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে মনোনয়নে ছাড় দিতে পারেন। তাছাড়া দলের ভেতরে, গণমাধ্যমে ও জাতীয়ভাবে জিএম কাদের ইতোমধ্যে জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়ে যাওয়ায় এখন অন্য কেউ চাইলেও সহজে চেয়ারম্যান পদ থেকে তাঁকে সরাতে পারবেন না। প্রেসিডিয়ামের দুইজন সদস্যের মতে, গতকালের যৌথসভায় কার্যত রওশনের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশলের অংশ হিসেবেই এই দাবি তোলা হয়েছে।

গতকালের সভায় আগামী ২৩ আগস্ট মরহুম এইচএম এরশাদের চল্লিশা পালনের বিষয়েও দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। তবে ২৩ আগস্ট হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের জন্মাষ্টমী। এরশাদ ক্ষমতায় থাকাকালে জন্মাষ্টমীতে সরকারি ছুটি ঘোষণা করেছেন। তাই ২৩ আগস্টের পরিবর্তে ৩১ আগস্ট বাদ জোহর সারা দেশে প্রয়াত এরশাদের রুহের মাগফিরাত কামনায় দোয়া, আলোচনা সভা ও দ;ুস্থদের মাঝে খাবার বিতরণ করার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। সভায় এরশাদের চল্লিশা পালনের জন্য পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য ও এমপিদের এক লাখ টাকা করে দলের তহবিলে জমা দেওয়ার জন্য নির্দেশনা দেওয়া হয়।

এছাড়াও এই যৌভসভায় এরশাদের মৃত্যুতে শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনের আসন্ন উপ-নির্বাচনে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন নিয়েও কথা হয়েছে। এব্যাপারে সভাপতির বক্তব্যে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদের বলেছেন, উপ-নির্বাচনে রংপুরের স্থানীয় নেতাদের কাছ থেকে প্রার্থী হিসেবে চারজনের নাম চাওয়া হবে। সেটির উপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আর সভাপরবর্তী সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে মসিউর রহমান রাঙ্গা বলেছেন, প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে দলের গঠনতন্ত্রে দলীয় চেয়ারম্যানকে একক ক্ষমতা দেওয়া আছে। তারপরেও সবার সঙ্গে আলোচনা করেই মনোনয়ন বোর্ড প্রার্থী ঠিক করবে।

এরশাদের মৃত্যুতে গত ১৪ জুলাই শূন্য হওয়া রংপুর-৩ আসনটিতে সেপ্টেম্বরের প্রথমার্ধ্বের মধ্যে উপ-নির্বাচন হওয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। এরশাদ-রওশনের ছেলে রাহগির আল মাহির (সাদ এরশাদ) এই উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হতে চান। এব্যাপারে রওশনেরও আগ্রহ রয়েছে। তবে কখনও রাজনীতি না করা সাদকে নিয়ে রংপুরের নেতা-কর্মীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। জিএম কাদের ও রংপুরের নেতা-কর্মীরা এরশাদের আরেক ছোট ভাই যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী হোসাইন মঞ্জুর  মোরশেদকে প্রার্থী করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব ছেড়ে এই বয়সে রাজনীতিতে যুক্ত হতে আগ্রহী নন মঞ্জুর। এছাড়া এরশাদের ভাতিজা ও সাবেক এমপি আসিফ শাহরিয়ারও জাপার মনোনয়ন পেতে চান। কিন্তু এরশাদের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ায় আসিফ আগেই দল থেকে বহিষ্কৃত। এর বাইরে এরশাদের বোনদের মধ্য থেকে একজনকেও প্রার্থী তালিকায় বিবেচনায় রাখা হয়েছে। তিনি সমপ্রতি রংপুর গিয়ে এরশাদের কবর জিয়ারত করে এসেছেন। সার্বিক পরিস্থিতি ঠিকঠাক থাকলে শেষ পর্যন্ত এরশাদের বোনকেই প্রার্থী করা হতে পারে বলে জানা গেছে।

জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত যৌথসভায় দলের মহাসচিব মসিউর রহমান রাঙ্গা ছাড়াও প্রেসিডিয়াম সদস্য এমএ সাত্তার, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, আবুল কাশেম, হাফিজ উদ্দিন আহমেদ, গোলাম কিবরিয়া টিপু এমপি, আলহাজ্ব সাহিদুর রহমান, এ্যাড. শেখ মুহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম, নুর-ই-হাসনা লিলি  চৌধুরী, সালমা ইসলাম এমপি, সৈয়দ আব্দুল মান্নান, সুনীল শুভরায়, এস এম ফয়সল চিশতী, হাজী সাইফুদ্দিন আহমেদ মিলন, এ. টি. ইউ. তাজ রহমান, সোলায়মান আলম শেঠ, আব্দুর রশীদ সরকার, মেজর (অব.) খালেদ আখতার, ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী, পীরজাদা শফিউল্লাহ আল মুনির, লে. জে. (অব.) মাসুদ উদ্দিন  চৌধুরী, রেজাউল ইসলাম ভূইয়া, ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর, সৈয়দ দিদার বখ্ত, কাজী মামুনুর রশিদ, জাফর ইকবাল সিদ্দিকী, আলমগীর সিকদার লোটন ও এমরান হোসেন মিয়া এবং দলের সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম জিন্নাহ, পনির উদ্দিন আহমেদ ও আদেলুর রহমান অংশ নেন।