৪০টিরও বেশি দেশ চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক এড়িয়ে যেতে সহায়তা করেছে। এসব দেশের তুলনামূলক কম মার্কিন আমদানি শুল্কের সুবিধা নিতে চীনা পণ্য ওই দেশগুলোর মাধ্যমে ঘুরিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে বলে জানিয়েছে হোয়াইট হাউস।
বৃহস্পতিবার (১৩ আগস্ট) হোয়াইট হাউস থেকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ কথা বলা হয়।
তালিকায় থাকা দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে কানাডা, ভারত, মেক্সিকো, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া। হোয়াইট হাউসের দাবি, এসব দেশ চীনকে কয়েক হাজার কোটি ডলারের শুল্ক ফাঁকি দিতে সহায়তা করেছে।
হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো বলেন, এর ফলে ‘মার্কিন কর্মসংস্থান ও বিপুল পরিমাণ রাজস্ব’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বিবিসির প্রশ্নের জবাবে ওয়াশিংটনে চীনা দূতাবাসের এক মুখপাত্র বলেন, ‘বাণিজ্যযুদ্ধে কোনো বিজয়ী নেই।’ তিনি আরও জানান, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্কমূলক পদক্ষেপ এবং চীনা কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারের বিরোধিতা করে চীন।
মুখপাত্র আরও বলেন, ‘পুনঃপ্রেরিত পণ্যসংক্রান্ত যেকোনো একতরফা পদক্ষেপ বা চুক্তি তৃতীয় কোনো পক্ষের স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করতে বা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারবে না।’
প্রতিবেদনটিতে তালিকাভুক্ত কানাডা, ভারত, মেক্সিকো, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক অংশীদার দেশের যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসগুলোর সঙ্গে মন্তব্যের জন্য যোগাযোগ করেছে বিবিসি।
যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা আরোপের পর এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হলো। এর কয়েক সপ্তাহ পর ওয়াশিংটনে চীনা নেতা শি জিনপিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের।
হোয়াইট হাউসের উদ্ধৃত সরকারি ও বেসরকারি খাতের হিসাব অনুযায়ী, ৩০ বিলিয়ন ডলার থেকে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য বেশি শুল্কের দেশগুলো থেকে কম শুল্কের দেশগুলোর মাধ্যমে স্থানান্তর করা হয়েছে।
এই প্রক্রিয়াকে ‘পণ্য পুনঃপ্রেরণ’ বলা হয়। এর অর্থ হলো, কোনো পণ্য চূড়ান্ত গন্তব্যে যাওয়ার পথে অন্য একটি দেশের মাধ্যমে পরিবহন বা স্থানান্তর করা।
কম শুল্ক আরোপ করা হয় এমন দেশগুলোর মাধ্যমে পণ্য পাঠিয়ে এই প্রক্রিয়ার ‘সুযোগ নেওয়ার’ জন্য যুক্তরাষ্ট্র চীনকে অভিযুক্ত করেছে।
হোয়াইট হাউস তার প্রতিবেদনে বলেছে, কম শুল্কের সুবিধা পেতে চীন তৃতীয় দেশগুলোকে যাত্রাবিরতির স্থান হিসেবে ব্যবহার করেছে এবং পণ্যের প্রকৃত উৎপত্তি গোপন করতে সেগুলো নতুন করে প্যাকেটজাত করেছে। হোয়াইট হাউস এই প্রক্রিয়াকে ‘কাগজপত্রের আড়ালে লুকানো প্রতারণা’ হিসেবে বর্ণনা করেছে।
হোয়াইট হাউস লিখেছে, ‘আজকের বৃহৎ পণ্য পুনঃপ্রেরণ কেলেঙ্কারিতে যা পরিবর্তিত হয়েছে, তা কেবল এই আধুনিক ধরনের চোরাচালানের গতি ও পরিসর নয়; বরং চীনের শুল্ক ফাঁকি এখন যে বৈশ্বিক ছায়া পণ্য পুনঃপ্রেরণ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে, তার বিস্তার, গভীরতা ও জটিলতাও বেড়েছে।’
হোয়াইট হাউস আরও জানিয়েছে, পণ্য পুনঃপ্রেরণের প্রচেষ্টা শনাক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক সরঞ্জাম ব্যবহার করেছে।
সেপ্টেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রে ট্রাম্প ও শির বৈঠকের প্রস্তুতির মধ্যে এই প্রতিবেদন দুই দেশের মধ্যকার গুরুত্বপূর্ণ বিরোধের বিষয়গুলো আরও বাড়িয়ে তুলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের মে মাসে আলোচনার পর অধিকাংশ শুল্ক আরোপ সাময়িকভাবে স্থগিত করা হলেও ওয়াশিংটন ও বেইজিং পরস্পরের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ অব্যাহত রেখেছে। এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো মানবসদৃশ রোবটের ওপর বিধিনিষেধ এবং চীনের পক্ষ থেকে ড্রোন রপ্তানির ওপর আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণও রয়েছে।
২০২৫ সালের এপ্রিলে ট্রাম্প যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক ডজন বাণিজ্যিক অংশীদারের ওপর ব্যাপক শুল্ক আরোপের ঘোষণা দেন। এর পেছনে ছিল দীর্ঘদিনের সেই বিশ্বাস যে, শুল্ক আরোপের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মসংস্থান ও অর্থনীতি শক্তিশালী করা সম্ভব হবে।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্ট ওই শুল্কগুলো বাতিল করে দেয়। তবে ট্রাম্প তার প্রধান নীতিকে অব্যাহত রাখতে বিকল্প আইনি ক্ষমতা ব্যবহার করে বারবার নতুন শুল্ক আরোপ করেছেন।

