বিষাক্ত গ্যাসে ৯ শ্রমিকের মৃত্যু

মামলা করেও থামানো যায়নি ফেরদৌস স্টিলের ঝুঁকিপূর্ণ কাজ

আপডেট : ১৪ আগস্ট ২০২৬, ২১:০০

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে ফেরদৌস স্টিলের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে বিষাক্ত গ্যাসে নয় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির নিরাপত্তা ব্যবস্থার ঘাটতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। দুর্ঘটনার মাত্র এক মাস আগে পেশাগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না করার অভিযোগে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে মামলা করেছিল কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর (ডিআইএফই)। এর আগে একাধিকবার নোটিশ ও তাগিদ দেওয়ার পরও নিরাপত্তা নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করার অভিযোগ ছিল প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকাল ৮টার দিকে সীতাকুণ্ড উপজেলার ভাটিয়ারী এলাকায় ফেরদৌস করপোরেশন লিমিটেডের শিপব্রেকিং ইয়ার্ডে এ দুর্ঘটনা ঘটে।

ডিআইএফইর তাৎক্ষণিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইয়ার্ডে নোঙর করে রাখা এলএনজি পরিবহনকারী একটি পুরোনো জাহাজে স্ক্র্যাপ কাটার কাজ করছিলেন শ্রমিকরা। কাজের একপর্যায়ে জাহাজের ভেতর গ্যাস লিক হয়ে অতিরিক্ত কার্বন মনোক্সাইড ছড়িয়ে পড়ে। এতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরি হয়ে শ্রমিকদের তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয় এবং অনেকে অচেতন হয়ে পড়েন।

ঘটনাস্থলেই পাঁচ শ্রমিকের মৃত্যু হয়। পরে হাসপাতালে নেওয়ার পর ও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও তিনজন মারা যান। বিকেলে চট্টগ্রামের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আরও একজন। এ ঘটনায় আরও ১০ থেকে ১২ জন শ্রমিক অসুস্থ ও গুরুতর আহত হয়েছেন। তারা চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

একাধিকবার নোটিশ, পরে মামলা

ডিআইএফই সূত্রে জানা গেছে, শিপইয়ার্ডটিতে আগে একাধিকবার পরিদর্শন করে বিভিন্ন নিরাপত্তা ত্রুটি চিহ্নিত করা হয়েছিল।

চট্টগ্রাম কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মোহাম্মদ মাহবুবুল হাসান জানান, নিয়মিত পরিদর্শনের অংশ হিসেবে ইয়ার্ডে গিয়ে কর্মকর্তারা বিভিন্ন অনিয়ম দেখতে পান। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ২ ফেব্রুয়ারি প্রতিষ্ঠানটিকে নোটিশ দেওয়া হয়।

পরবর্তী সময়ে ৪ মে আবার পরিদর্শন করে আগের নির্দেশনা বাস্তবায়নের অগ্রগতি না পাওয়ায় কর্তৃপক্ষকে তাগিদ দেওয়া হয়। এরপর ৮ জুন অগ্নি ও পেশাগত নিরাপত্তা জোরদারের জন্য চূড়ান্ত নোটিশ দেওয়া হয়।

একাধিকবার তাগিদ দেওয়ার পরও নির্দেশনা বাস্তবায়ন না করায় গত ১৫ জুলাই চট্টগ্রাম শ্রম আদালতে ফেরদৌস স্টিলের বিরুদ্ধে মামলা করে ডিআইএফই। পরিদর্শক মো. সাহেদ পারভেজ তালুকদার বাদী হয়ে মামলাটি করেন।

পরিদর্শনে গিয়ে আহত দুই শ্রম পরিদর্শক

দুর্ঘটনার খবর পেয়ে ডিআইএফইর প্রতিনিধি দল ঘটনাস্থল পরিদর্শনে গেলে স্থানীয় উত্তেজিত জনতার হামলায় দুই শ্রম পরিদর্শক গুরুতর আহত হন।

পরে স্থানীয় প্রশাসন, ফায়ার সার্ভিস ও ডিআইএফইর প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

স্থানীয় শ্রমিকনেতা ফজলুর কবির মিন্টু অভিযোগ করেন, জাহাজের ভেতরে জমে থাকা তরল বর্জ্য বা গ্যাসের উপস্থিতি পরীক্ষা না করেই শ্রমিকদের সেখানে কাজ করতে পাঠানো হয়েছিল। তাঁর দাবি, এটি মালিকপক্ষের গাফিলতি। তিনি আরও বলেন, ছুটির দিনেও সেখানে কাজ চলছিল। দুর্ঘটনার কারণ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

জাহাজ ভাঙার অনুমতি ছিল কি না, তদন্তে জানা যাবে

ওই শিপইয়ার্ডে জাহাজ ভাঙার অনুমতি ছিল কি না, জানতে চাইলে চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মোজাহিদুর রহমান বলেন, শুধু পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতিই যথেষ্ট নয়; বিস্ফোরক অধিদপ্তরসহ আরও কয়েকটি সংস্থার অনুমতি প্রয়োজন।

ফেরদৌস করপোরেশনের কোন কোন জাহাজের অনুমোদন রয়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি বলে জানান তিনি। পুরো এলাকা ঘিরে রাখায় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিদর্শকেরা ঘটনাস্থলে যেতে পারেননি। তদন্তের পর বিষয়টি পরিষ্কার হবে বলে জানান তিনি।
 

ইত্তেফাক/এসজে