ব্রিটিশদের ১০৯ বছর আগে ধার দেওয়া টাকা এখন সুদসহ ফেরত চায় ভারতীয় পরিবার

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১১:৫১

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া ৩৫ হাজার টাকা ঋণ ১০৯ বছর পর সুদসহ ফেরত চেয়েছে ভারতের মধ্যপ্রদেশের রুঠিয়া পরিবার। ব্যবসায়ী জুম্মালাল রুঠিয়ার এই কথিত ঋণের সপক্ষে ১৯১৭ সালের ৪ জুন তারিখের একটি শংসাপত্র তাদের কাছে আছে বলে দাবি করেছে পরিবারটি। এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাজ্যের ঋণ ব্যবস্থাপনা দপ্তর (ডিএমও) পরিবারটির কাছ থেকে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র চেয়ে পাঠিয়েছে।

পরিবারের দাবি অনুযায়ী, ১৯১৭ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ বাহিনীর পক্ষে লড়াই করা ভারতীয় সৈন্যদের ভরণপোষণের জন্য তহবিল সংগ্রহ করছিল সরকার। সেই প্রেক্ষাপটে জুম্মালাল রুঠিয়া ভোপাল এজেন্সিতে কর্মরত একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তার মাধ্যমে ওই অর্থ সরকারকে দিয়েছিলেন।

জুম্মালাল রুঠিয়ার প্রপৌত্র গৌতম রুঠিয়া জানিয়েছেন, ব্রিটিশ কর্মকর্তারা বিষয়টি আরও বিস্তারিতভাবে মূল্যায়নের জন্য উচ্চতর কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়েছেন। তিনি বলেন, 'আমরা ব্রিটিশ সরকারের কাছ থেকে একটি ইমেইল পেয়েছি, যেখানে বিষয়টি নিশ্চিত করার জন্য কিছু তথ্য চাওয়া হয়েছে। তারা আরও জানিয়েছে যে বিষয়টি তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। যাচাইয়ের জন্য যা যা তথ্য প্রয়োজন, আমরা তা পাঠিয়ে দিচ্ছি।'

তবে ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ এখনো পরিবারটির দাবি মেনে নেয়নি। নথি চাওয়াটি কেবলই দাবি যাচাই প্রক্রিয়ার অংশ।

পরিবারটি চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে নথিটি খুঁজে পেয়েছিল। জুম্মালালের নাতি ও গৌতমের বাবা বিনয় রুঠিয়া বলেন, 'অন্য একটি মামলার জন্য পুরোনো কাগজপত্র ঘাঁটতে গিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে দেওয়া ঋণের এই নথিটি পাওয়া যায়। এরপর একজন আইনজীবীর মাধ্যমে ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে যোগাযোগ করি আমরা।' কয়েক মাসের মধ্যে প্রথমবার যুক্তরাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে সাড়া পেয়ে পরিবারটি উচ্ছ্বসিত। বিনয় রুঠিয়া বলেন, 'এই বিষয়টি টাকার ঊর্ধ্বে। আমাদের কাছে এটি পৈতৃক ঐতিহ্যের প্রশ্ন।'

ঋণটির প্রকৃতি প্রসঙ্গে গৌতম রুঠিয়া বলেন, সাধারণ ব্যাংক ঋণে পাঁচ বা দশ বছরের মেয়াদ উল্লেখ থাকে। কিন্তু এটি ছিল যুদ্ধকালীন ঋণ, যেখানে যুদ্ধ কতদিন চলবে তার কোনো নিশ্চয়তা ছিল না। তাই মেয়াদও উল্লেখ করা হয়নি।

যুক্তরাজ্যের ডেট ম্যানেজমেন্ট অফিস পরিবারটির কাছে পারিবারিক নথিপত্র, বংশতালিকা, পুরোনো সনদপত্র, ঋণের পরিমাণ এবং সে সময়কার সংশ্লিষ্ট ফর্ম সম্পর্কে তথ্য চেয়েছে। পরিবারটি জানিয়েছে, কর্তৃপক্ষ প্রমাণ করতে চায় যে, ১৯১৭ সালে যে পরিবার অর্থ দিয়েছিল এবং এখন যে পরিবার তা দাবি করছে, তারা একই পরিবার।

দাবিকৃত অর্থের পরিমাণ নির্ধারণে পরিবারটি আসল ৩৫ হাজার টাকার সঙ্গে সুদ, চক্রবৃদ্ধি সুদ, সংশ্লিষ্ট ব্যয় এবং বর্তমান বাজারমূল্যের ভিত্তিতে মুদ্রাস্ফীতি সমন্বয় করে হিসাব করতে চায়। গৌতম রুঠিয়া বলেন, 'আমরা সব টাকাই দাবি করব। ৩৫ হাজার মূল ঋণ, তার সঙ্গে সুদ, চক্রবৃদ্ধি সুদ এবং যেকোনো উদ্ভূত খরচ। এরপর আজকের বাজারমূল্যের সঙ্গে তুলনা করব।' তবে চূড়ান্ত দাবির অঙ্ক এখনো ঠিক হয়নি।

বিনয় রুঠিয়া দাবি করেছেন, ২০১৫ সালে ব্রিটিশ সরকার প্রথম বিশ্বযুদ্ধের জন্য নেওয়া বিভিন্ন ঋণের বিপরীতে মোট ২২০ কোটি পাউন্ড পরিশোধ করেছে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ২০১৪ সালের ডিসেম্বরে দেওয়া এক সরকারি জবাবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ–সংশ্লিষ্ট প্রায় ২২০ কোটি পাউন্ড বকেয়া ঋণের কথা উল্লেখ ছিল। এর মধ্যে যুদ্ধকালীন ঋণ ২০১৫ সালের ৯ মার্চ পরিশোধ করা হয়। এ ছাড়া ১০ লাখ পাউন্ডের একটি কনসোলিডেটেড ঋণ ও একটি কনভার্শন ঋণও ২০১৫ সালেই পরিশোধ করা হয়েছিল।

পার্লামেন্টে দেওয়া অপর একটি জবাব অনুযায়ী, কনসোলিডেটেড ঋণের ৪ শতাংশ এবং যুদ্ধকালীন ঋণের ৩.৫ শতাংশ ছিল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় অর্থ সংগ্রহের জন্য জারি করা সরকারি বন্ড। সেই সময়কার মোট যুদ্ধকালীন বন্ডের প্রায় ৯৯ শতাংশই ছিল এই দুটি বন্ড। তবে ২০১৫ সালে পরিশোধিত ঋণের মধ্যে ১৯১৭ সালে জুম্মালাল রুঠিয়ার দেওয়া ৩৫ হাজার টাকাও অন্তর্ভুক্ত ছিল কি না, তা এখনো প্রমাণ সাপেক্ষ।

পরিবার সূত্রে জানা গেছে, জুম্মালাল রুঠিয়া সে সময়ে এলাকার একজন বিত্তশালী ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী ছিলেন। তার প্রায় তিন হাজার গরু নিয়ে একটি গোশালা ছিল। আফিম চাষেও যুক্ত ছিলেন তিনি। পরিবারের কাছে তার পুরোনো ছবি এবং সে সময় ব্যবহৃত একটি রোলস রয়েস গাড়ির ছবিও সংরক্ষিত আছে। বিনয় রুঠিয়া বলেন, 'তার কাছে টাকা ছিল এবং ঋণের নথিও রয়েছে। প্রশ্ন এটা নয় যে তিনি ঋণ দিয়েছিলেন কি না। প্রশ্ন হলো, এ বিষয়ে ব্রিটিশ সরকার কী পদক্ষেপ নেবে।'

ঋণ দেওয়ার প্রায় দুই দশক পর ১৯৩৭ সালে মারা যান জুম্মালাল রুঠিয়া। এর প্রায় দশ বছর পর, ১৯৪৭ সালে, ব্রিটিশ সরকার ভারত ছেড়ে যায়। পরিবারের দাবি, এই অর্থ কখনো পরিশোধ বা নিষ্পত্তি করা হয়নি।

এখন ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষের চাওয়া নথিপত্র সরবরাহের প্রস্তুতি নিচ্ছে পরিবারটি। সেগুলো যাচাই করে ১৯১৭ সালের নথির সঙ্গে ব্রিটিশ সরকারের নিজস্ব রেকর্ড মিলিয়ে দেখা হবে। প্রয়োজন হলে আইনি পদক্ষেপ বা সালিসের পথেও যেতে পারে বলে জানিয়েছে পরিবারটি। বিনয় রুঠিয়া বলেন, মূল নথিগুলো যাচাই হওয়ার পরেই পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

ইত্তেফাক/এনএন