চীনের শুল্ক ফাঁকিতে সহায়তা করেছে ৪০টির বেশি দেশ: হোয়াইট হাউস

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৬, ১৫:৫১

যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ শুল্ক এড়াতে চীন ৪০টির বেশি দেশকে ব্যবহার করে পণ্য মার্কিন বাজারে পাঠিয়েছে বলে অভিযোগ করেছে হোয়াইট হাউস। এসব দেশের মাধ্যমে চীনা পণ্য পাঠিয়ে তুলনামূলক কম হারে আমদানি শুল্ক দেওয়ার সুযোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।

হোয়াইট হাউসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কানাডা, ভারত, মেক্সিকো, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়াসহ ৪০টির বেশি দেশ চীনা পণ্য তৃতীয় দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানোর প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। এর মাধ্যমে চীন কয়েক হাজার কোটি ডলারের মার্কিন শুল্ক এড়িয়েছে বলে দাবি ওয়াশিংটনের।

হোয়াইট হাউসের বাণিজ্য উপদেষ্টা পিটার নাভারো বলেন, এ ধরনের বাণিজ্যপথের কারণে মার্কিন কর্মসংস্থান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ রাজস্ব হারিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে চীনের ওয়াশিংটন দূতাবাসের মুখপাত্র অভিযোগটি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, ‘বাণিজ্যযুদ্ধে কেউ জয়ী হয় না।’ একই সঙ্গে চীনা কোম্পানির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপ ও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ব্যবহারেরও সমালোচনা করেন তিনি।

তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে একতরফা পদক্ষেপ বা কোনো চুক্তি যেন অন্য দেশের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত না করে, সে বিষয়েও সতর্ক করেছেন চীনা মুখপাত্র।

হোয়াইট হাউসের প্রতিবেদনে সরকারি ও বেসরকারি খাতের বিভিন্ন হিসাবের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ৩০ বিলিয়ন থেকে প্রায় ৩০০ বিলিয়ন ডলারের পণ্য উচ্চ শুল্কের আওতাভুক্ত দেশ থেকে কম শুল্কের আওতাভুক্ত দেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে।

বাণিজ্যের এ প্রক্রিয়াকে ‘ট্রান্সশিপমেন্ট’ বলা হয়। এতে পণ্য চূড়ান্ত গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে তৃতীয় কোনো দেশে পাঠানো হয়। যুক্তরাষ্ট্রের অভিযোগ, চীন কম শুল্কের দেশগুলোকে ব্যবহার করে এই পদ্ধতিতে মার্কিন শুল্ক এড়িয়ে গেছে।

প্রতিবেদনে আরও দাবি করা হয়েছে, চীন তৃতীয় দেশকে মধ্যবর্তী গন্তব্য হিসেবে ব্যবহারের পাশাপাশি পণ্যের মোড়ক ও কাগজপত্র পরিবর্তন করে প্রকৃত উৎপত্তিস্থল গোপন করেছে। এর ফলে চীনা পণ্য কম শুল্কে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছে। হোয়াইট হাউস এ প্রক্রিয়াকে ‘কাগজপত্রের মাধ্যমে প্রতারণা’ হিসেবে উল্লেখ করেছে।

চীনের শুল্ক ফাঁকি শনাক্ত ও ঠেকাতে যুক্তরাষ্ট্র কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

সিঙ্গাপুর ম্যানেজমেন্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক চ্যাং পাও লি মনে করেন, হোয়াইট হাউসের এই প্রতিবেদন যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য আলোচনায় ওয়াশিংটনের দর-কষাকষির অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে।

তিনি বিবিসিকে বলেন, চীন তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পরোক্ষভাবে মার্কিন বাজারে প্রবেশের সুযোগ ধরে রেখেছে—এমন যুক্তি দেখাতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। ভবিষ্যতে বড় কোনো বাণিজ্য চুক্তি হলে সরাসরি চীনা রপ্তানির পাশাপাশি তৃতীয় দেশের মাধ্যমে পণ্য পাঠানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।

তবে চ্যাং পাও লি সতর্ক করে বলেন, বাণিজ্যপথ পরিবর্তনের সব ঘটনাই যে শুল্ক ফাঁকির উদ্দেশ্যে হয়েছে, তা নয়। অন্য দেশে উৎপাদন স্থানান্তর বা সরবরাহব্যবস্থার পুনর্গঠনের কারণেও এ ধরনের পরিবর্তন হতে পারে। এতে চীনের সরবরাহব্যবস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত দেশগুলো বাড়তি ঝুঁকি ও ব্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা এখনো অব্যাহত রয়েছে। ২০২৫ সালের মে মাসে দুই দেশের আলোচনার পর বেশির ভাগ শুল্ক স্থগিত করা হলেও পারস্পরিক নিষেধাজ্ঞা ও বাণিজ্য বিধিনিষেধ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।

সম্প্রতি চীনের মানবাকৃতির রোবটের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এর পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে ড্রোন রপ্তানিতে আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে চীন।

এরই মধ্যে কয়েক সপ্তাহ পর ওয়াশিংটনে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের সঙ্গে বৈঠক করার কথা রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের। ফলে নতুন এই প্রতিবেদন দুই দেশের আসন্ন বাণিজ্য আলোচনায়ও প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রতিবেদনটি যুক্তরাষ্ট্র-চীন বাণিজ্য আলোচনায় ওয়াশিংটনের অবস্থান শক্তিশালী করতে পারে, তবে বৈধ সরবরাহব্যবস্থা ও শুল্ক ফাঁকির পার্থক্য কীভাবে নির্ধারণ করা হবে—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

সূত্র: বিবিসি

 
ইত্তেফাক/এসজে