গ্রীষ্মের প্রচণ্ড তাপদাহের একটি দিনে ফিলিস্তিনিদের ফসলি জমিতে সেচ দেওয়া পানি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিয়ে তৈরি একটি সুইমিং পুলে আনন্দে মেতেছিলেন ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা। অধিকৃত পশ্চিম তীরজুড়ে ফিলিস্তিনিদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে অচল করে দিতে এভাবে একের পর এক পানির উৎস কেড়ে নেওয়া হচ্ছে, এটি তার অন্যতম একটি উদাহরণ মাত্র।
শুক্রবার (১৪ আগস্ট) রয়টার্সের এক প্রতিবেদন থেকে এ তথ্য জানা যায়।
উর্বর জর্দান উপত্যকার নিকটবর্তী ফাসায়েল গ্রামের ফিলিস্তিনিদের জীবনের মূল চালিকা শক্তি ছিল এই পানির ফোয়ারা। খাবার, কর্মসংস্থান ও বাসাবাড়িতে মেটানো অনিয়মিত ইসরায়েলি পানি সরবরাহের ঘাটতি পূরণে বহু প্রজন্ম ধরে এর ওপর নির্ভর করে আসছে তারা।
স্থানীয় কৃষক সাদ নেমার বলেন, ‘আমাদের পানি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। ফলে আমরা ঘরবাড়ি, জীবিকা এবং কৃষিজমির জন্য প্রয়োজনীয় পানি থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।’
এর আগে, গত জুনে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীরা তার সেচের পাইপলাইন দখল করে নেয় এবং সেই পানি একটি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের প্রাচীন পুলে প্রবাহিত করতে শুরু করে। এরপরই বসতি স্থাপনকারীরা এটিকে ইসরায়েলি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে প্রচার করে এবং ইসরায়েলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী এতে আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেন।
তারা এখন পুলটির চারপাশে একটি বিনোদন পার্ক তৈরির কাজ করছে বলে জানান নেমার।
জানা যায়, পানির উৎস দখলের পাশাপাশি ফিলিস্তিনিদের অবরুদ্ধ করার ঘটনাও ঘটছে। সম্প্রতি পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামে ফিলিস্তিনিদের বাড়িঘর ঘেরাও করে রাখা কট্টরপন্থী বসতি স্থাপনকারীদের গ্রেপ্তার ও বিচারের মুখোমুখি করতে এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে ইসরায়েলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ফ্রান্স।
ফরাসি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, পশ্চিম তীরের কুসরা গ্রামে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের দ্বারা ফিলিস্তিনিদের বেশ কয়েকটি ঘরবাড়ি দখল এবং বেসামরিক নাগরিকদের বিরুদ্ধে সহিংস আচরণের আমরা তীব্র ভাষায় নিন্দা জানাচ্ছি।
গত রোববার থেকে বাড়িগুলো অবরুদ্ধ করে রাখে বসতি স্থাপনকারীরা। সামরিক বাহিনী তাদের সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেও তারা সরে যায়নি। ফলে অবরুদ্ধ বাসিন্দারা খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সরবরাহ থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।
অবরুদ্ধ ঘরগুলোর একটির মালিক এক মার্কিন নাগরিক হওয়ায় এ ঘটনায় ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকেও নজিরবিহীন ও কঠোর সমালোচনা এসেছে। ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এই অবরোধকে "ঘৃণ্য" বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং এ ধরনের "গুণ্ডামির কোনো অজুহাত হতে পারে না" বলে উল্লেখ করেছেন।
জুনের শুরুতে কানাডাসহ বেশ কয়েকটি দেশের নিষেধাজ্ঞার তালিকায় থাকা অবৈধ ইহুতি বসতি স্থাপনকারী নেতা এলিয়াভ লিবি একটি ভিডিও পোস্ট করেন, যেখানে পুলটিতে পানি ভরতে দেখা যায়। তিনি এবং অন্য ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের দাবি, পুলটি বাইবেল যুগের ইহুদি রাজা হেরোডের।
তবে ইসরায়েলি অধিকার রক্ষা সংস্থা ইমেক শেভের প্রত্নতাত্ত্বিক অ্যালন আরাদ জানান, পুলটির প্রকৃত উৎস বা ইতিহাস স্পষ্ট নয়। তিনি বলেন, পুলে পানি ভর্তি করে বসতি স্থাপনকারীরা মূলত এই প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের ক্ষতি করছে।
পুলের বাইরে ঝোলানো একটি বিলবোর্ডে বসতি সম্প্রসারণের অন্যতম রূপকার স্মোটরিচের পক্ষ থেকে ৩০ লাখ শেকেল বিনিয়োগের কথা প্রচার করা হয়েছে। টেলিগ্রাম পোস্টে স্মোটরিচ জানিয়েছিলেন, এই অর্থ হেরোডের পুল সংস্কার ও উন্নয়নের জন্য দেওয়া হয়েছে।
বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইন উপেক্ষা করে পশ্চিম তীরের বিভিন্ন বসতিতে ৫ লাখেরও বেশি ইসরায়েলি বাস করছেন, যা জাতিসংঘ ও অধিকাংশ দেশ অবৈধ মনে করে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে পশ্চিম তীর দখল করে নেয় ইসরায়েল, তবে তাদের দাবি এই ভূখণ্ডটি 'অধিকৃত' নয়, বরং 'বিতর্কিত'।
ফিলিস্তিনি গবেষক ফারেস ফোকাহা অনুমান প্রকাশ করেছেন যে, উত্তর জর্ডান উপত্যকার ৯৫ শতাংশ প্রাকৃতিক ঝরনার নিয়ন্ত্রণ এখন বসতি স্থাপনকারীদের হাতে চলে গেছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পানিবিষয়ক কর্মকর্তা আদেল ইয়াসিন একে "পানি যুদ্ধ" আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি হচ্ছে "শব্দহীনভাবে ফিলিস্তিনিদের হত্যা করার একটি নীরব বুলেট।"

