সাড়ে ৩৩ হেক্টর বীজতলা নষ্ট

গাইবান্ধায় দ্বিগুন দামে চারা কিনে ধান রোপন করছে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১২:৪৮

দশ শতক জমিত বেচন ছিটাছিনু (ধানের বীজতলা তৈরী করেছিল), ঝড়ির (বৃষ্টি) পানিত তাক তলি যায়্যা (ডুবি) পচি গ্যাছে। এ্যাখোন ৩ বিগা (বিঘা) জমিত আমোন ধান নাগামু (রোপন করবো)। এ্যাই জন্যে হাটোত বেচন (ধানের চারা) কিনবার আছছি। সাড়ে সাত’শ ট্যাকা করি দশপন বেচন সাড়ে সাত হাজার ট্যাকা দিয়্যা কিননু (ক্রয় করলাম)। ইজাদদারের নোক টোল নিলো দুই’শ ট্যাকা। এ্যাগলা (এগুলো) এ্যাখোন ভ্যানোত করি বাড়িত নিয়্যা যাবার ভাড়া, জমি হাল-চাষের খরচা, বেচন নাগাবার (রোপন করার) কামলার (শ্রমিক) দাম, সার-ওষুদ (কীটনাশক) কেনার ট্যাকা, নিরানি কামলা খরচা। শোগশুদ্ধা (সবসহ) এ্যাবার যে খরচ হবে, আমোন ধান বেচি তাক উঠপার নয়। 

শনিবার গাইবান্ধার সাদুল্লাপুর হাটে আমন ধানের চারা কিনতে এসে এইসব কথা বলেন সাদুল্লাপুর উপজেলার বনগ্রাম ইউনিয়নের হবিবুল্লাপুর গ্রামের বর্গাচাষী রাঙ্গা মোল্লা।

সম্প্রতি টানা কয়েক দিনের বৃষ্টি আর উজানের ঢলে জেলার আমন ধানের বীজতলা পানিতে ডুবে গিয়ে পচে নষ্ট হয়েছে। এতে ধান রোপনে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত খরচ। ধানের চারা তাঁদের বিভিন্ন হাট-বাজার থেকে দ্বিগুন দাম দিয়ে সংগ্রহ করতে হচ্ছে।
 
জেলা জুড়ে আমন ধানের চারা রোপন শুরু হয়েছে শ্রাবণ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে। ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময় পযর্ন্ত এই রোপন কার্যক্রম চলবে। 

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গাইবান্ধায় চলতি মৌসুমে আমন আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৩৩ হাজার ১২০ হেক্টর জমি। এসব জমিতে ধান রোপনের জন্য ৭ হাজার ২৫ হেক্টর জমিতে আমন বীজতলা করা হয়েছিল। টানা বৃষ্টিতে ১৩২ হেক্টর বীজতলা পানিতে ডুবে গেছে। এরমধ্যে পুরোপুরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ দশমিক ৫ হেক্টর। তবে বাস্তবে এই ক্ষতির পরিমান আরও বেশি।

সম্প্রতি সরেজমিনে জেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এসব বীজতলার চিত্র দেখা গেছে। এসময় বিভিন্ন এলাকার কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি থেকে আষাঢ় মাসের শেষ সপ্তাহ পর্যন্ত বীজতলা তৈরি করা হয়। এসব আমনের চারা শ্রাবন মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে ভাদ্র মাসের মাঝামাঝি সময় পযর্ন্ত রোপন করা হয়। গত জুলাই মাসে দুই সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। নদ-নদীর পানি বাড়তে শুরু করে। ফলে জেলার নিম্নাঞ্চলের প্রায় সব বীজতলা পানি নিচে ডুবে যায়। তবে যে সব এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা তুলনামূলক ভালো। সেসব এলাকায় বৃষ্টি থামার দুই-এক দিনের মধ্যে জমি থেকে পানি নেমে যায়। অরপদিকে জলাবদ্ধতার কারণে অনেক এলাকায় বীজতলা পুরোপরি পানির নিচে ডুবে পচে গেছে। 

কৃষকদের অভিযোগ, জেলার পানি নিষ্কাশনের অধিকাংশ খাল-বিল এখন প্রভাবশালীদের দখলে। এসব খাল-বিল ভরাট করে কেউ বাড়ি, কেউ ব্যবসা বানিজ্য গড়ে তুলেছেন। অনেকেই এই উম্মুক্ত সরকারি খাল-বিলে পানি প্রবাহ বন্ধ করে মাছ চাষ করছেন, আবার কেউ ফসল চাষ করছেন। অপরদিকে পানি প্রবাহের জন্য নির্মিত জেলা জুড়ে সড়কগুলোর একাধিক ব্রীজ ও কালভার্টের মুখ বন্ধ করে বাড়িঘর ও ইমারতও নির্মাণ করা হয়েছে। এতে পানি নিষ্কাশন ও প্রবাহের প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হচ্ছে। এসব কারণে বৃষ্টি বা বন্যার পানি সময় মতো সরছে না। 

পলাশবাড়ী উপজেলার হরিনাথপুর গ্রামের কৃষক আব্দুল সোবহান মিয়া জানান, এ বছর প্রায় আট বিঘা জমিতে আমন চাষের জন্য ২৫ শতক জমির বীজতলা তৈরি করেন। প্রায় ২০-২২ দিনের চারা এক সপ্তাহ ধরে পানির নিচে থেকে পচে যায়। এখন হাট থেকে বেশি দামে চারা কিনে জমিতে রোপণ করছেন। 

সুন্দরগঞ্জ উপজেলার পাঁচগাছি শান্তিরাম গ্রামের ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক ওসমান গনি জানান, সরকারিভাবে কৃষকদের প্রণোদনার ব্যবস্থা না করলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা এ বছর ঘুরে দাড়াতে পারবেন না। একই কথা বলেন, গাইবান্ধা সদরের বল্লমঝাড় ইউনিয়নের বর্গা চাষি সৈয়দ আলী।  

কৃষি সম্প্রসারণ গাইবান্ধা কার্যালয়ের অতিরিক্ত উপপরিচালক (উদ্যান) রোস্তম আলী জানান, বিষয়টি উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে। 

তিনি আরও জানান, আগামী রবি মৌসুমে ক্ষতিগ্রস্থ এইসব কৃষককে কৃষি বিভাগ থেকে  প্রণোদনার বীজ-সার প্রদানের ব্যাপারে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।  

ইত্তেফাক/এএইচপি