রাজধানীর ভাটারায় গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনায় করা মামলায় সাবেক মেজর মো. সাদিকুল হক কারাগারে থেকে কীভাবে গাড়ি পুড়িয়েছেন-সেই ব্যাখা দিয়েছে ভাটারা থানার পুলিশ। ভাটারা থানার বসুন্ধরা এলাকায় প্রাইভেটকার পোড়ানোর ঘটনায় করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় তিনি সন্দিগ্ধ আসামি।
রোববার (১৬ আগস্ট) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলামের আদালতে লিখিত ব্যাখা জমা দেন ভাটারা থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম এবং তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. চাঁদ আলী।
লিখিত বক্তব্য পড়ে বিচারক এ বিষয়ে আদেশ দেবেন বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশনের পুলিশের এসআই কামাল হোসেন।
লিখিত ব্যাখায় বলা হয়, মামলার তদন্তে উঠে এসেছে সন্দিগ্ধ আসামি চাকুরিচ্যুত সাবেক মেজর সাদিক সেনাবাহিনীতে চাকরি করা থাকা অবস্থায় ২০২৫ সালের ৩ জুলাই থেকে ৮ জুলাই বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা সংলগ্ন কেবি কনভেনশন হলের দ্বিতীয় তলার হল রুমে গোপন সভা করেন। সেদিন সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত দিনব্যাপী কার্যক্রমে নিষিদ্ধা থাকা আওয়ামী লীগ এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের অংশ গ্রহণে সেটি ছিল একটি ‘গোপন সভা’।
ব্যাখায় উল্লেখ করা হয়, ওই সভায় আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডকে গতিশীল ও সমর্থকদের উৎসাহিত করা এবং দেশে অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে আলোচনা এবং প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে তারা সবাই একত্রিত হন। এ ঘটনায় ভাটারা থানায় গেল বছরের ১৩ জুলাই সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা দায়ের করা হয়। ওই মামলায় তদন্তে প্রাপ্ত আসামি হিসাবে কারাগারে আছেন মেজর মো. সাদিকুল হক সাদিক।
ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়, সাবেক মেজর সাদিক প্রধান প্রশিক্ষক এবং কানেক্টরের ভূমিকায় থেকে রুপগঞ্জ থানার পূর্বাচল সি-সেল নামের রিসোর্ট, কাঁটাবনের একটি রেস্টুরেন্ট, মিরপুর ডিওএইচএসসহ উত্তরায় ১২ নম্বর সেক্টর এবং আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের বিপরীতে প্রিয়াংকা সিটিতে তার স্ত্রী সুমাইয়া যাফরিনসহ তার ফ্ল্যাটের একাধিকবার এ ধরনের গোপন প্রশিক্ষণ/ওয়ার্কশপ আয়োজন করেছিলেন। এ ধরনের গোপন সভা, প্রশিক্ষণ/ওয়ার্কশপে অংশগ্রহনকারী আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের মধ্যে অনেকেই পরবর্তীতে গ্রেপ্তার হয়েছেন, আবার অনেকেই হননি। ফলে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেশে প্রত্যাবর্তনের জন্য দেশকে অস্থিতিতিশীল করার লক্ষ্যে পলাতক নেতা কর্মীরা মেজর সাদিকের ওই সভা থেকে পরিকল্পনা গ্রহন ও প্রশিক্ষণ নেয় এবং আসামির পূর্বের নির্দেশনা, অর্থায়নে ও মদদে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে পরবর্তীতে মামলার ঘটনার তারিখ ও সময় বাদীর গাড়ি পোড়ায়।” এজন্য সন্দিগ্ধ আসামি মেজর সাদিকেরর এ মামলার সাথে জড়িত থাকার তথ্য গোপন ও প্রকাশ্যে তদন্তে পাওয়া যায়।
এর আগে, গত বছরের ১১ নভেম্বর রাজধানীর বসুন্ধরা এলাকায় একটি প্রাইভেট কার পোড়ানোর মামলায় সন্দিগ্ধ আসামি হিসেবে সাদিকুল হককে গ্রেপ্তার দেখাতে গত ৭ অগাস্ট তদন্ত কর্মকর্তা ভাটারা থানার এসআই চাঁদ আলী আবেদন করেন।
সেই আবেদনে বলা হয়, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এবং দেশকে অস্থিতিশীল করতে ওই ঘটনা ঘটানো হয়। আসামি সাদিক ভাটারা থানার অন্য একটি সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন। তদন্তে এ ঘটনায় তার ‘প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে’।
আদালত আসামির উপস্থিতিতে শুনানির দিন রাখেন গেল সোমবার। ওই দিন শুনানিকালে মেজর সাদিককে আদালতে হাজির করা হয়। আসামিপক্ষের আইনজীবী এইচ. এম আল-আমিন সেদিন আদালতে বলেন,"ঘটনার সময় আসামি কারাগারে ছিলেন। কারাগারে থেকে তিনি কিভাবে গাড়ি পোড়ান।"
এর আগে, ঘটনার সময় সাদিকুল কারাগারে ছিলেন, আসামিপক্ষের এমন বক্তব্যের পর কারাগারে থেকে কীভাবে সাবেক মেজর সাদিক গাড়িতে আগুন দিলেন তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন আদালত।
এ বিষয়ে ভাটারা থানার ওসি মাজহারুল ইসলাম এবং মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই মো. চাঁদ আলীকে আগামী ১৬ আগস্টের মধ্যে ব্যাখ্যা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সোমবার (১০ জুলাই) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ এহসানুল ইসলাম এ আদেশ দেন। একই দিন মামলাটির পরবর্তী শুনানি অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন প্রসিকিউশন বিভাগের এসআই কামাল হোসেন।
আদালত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানা যায়, ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর ভাটারা থানার বিটুমিন গেটের সামনে একটি প্রাইভেটকারে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় দায়ের করা সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় সাদিকুলকে গ্রেপ্তার দেখানোর জন্য গত ৭ আগস্ট আদালতে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা এসআই চাঁদ আলী।
পুলিশের আবেদনে দাবি করা হয়, ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে গাড়িটিতে আগুন দেওয়া হয়। তদন্তে সাদিকুলের ওই ঘটনার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে শুনানিতে সাদিকুলের আইনজীবী আদালতের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, অগ্নিসংযোগের দিন তার মক্কেল কারাগারে ছিলেন। ফলে কারাগারে অবস্থান করেও তিনি কীভাবে ওই ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
এদিকে গত বছরের ১ আগস্ট আন্তঃবাহিনী গণসংযোগ পরিদপ্তরের (আইএসপিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, “অভিযোগটি পাওয়ার সাথে সাথে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে। এর পরিপ্রেক্ষিতে, গত ১৭ জুলাই উক্ত সেনা কর্মকর্তাকে তার নিজ বাসস্থান রাজধানীর উত্তরা এলাকা থেকে আটক করে সেনা হেফাজতে নেওয়া হয়।”
ঘটনাটির সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের লক্ষ্যে ইতোমধ্যে একটি তদন্ত আদালত গঠন করা হয়েছে জানিয়ে আইএসপিআর বলেছে, প্রাথমিক তদন্তে অভিযোগের ‘সত্যতা’ পাওয়া গেছে।
এর আগে, সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত সাদিকুলকে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর একটি সামরিক আদালত তিন মাসের কারাদণ্ড দেন। ওই রায়ের পর তাকে কারাগারে পাঠানো হয়। পরে ভাটারা থানার আরেক মামলায় তাকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। সেই থেকে তিনি কারাগারে আছেন।

