সীতাকুণ্ডে বিষাক্ত গ্যাস বিস্ফোরণ

ময়নাতদন্ত ছাড়াই ৮ লাশ হস্তান্তর, ৪৮ ঘণ্টায়ও হয়নি মামলা

আপডেট : ১৬ আগস্ট ২০২৬, ১৭:৫৩

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীতে বিষাক্ত গ্যাসে নয় শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজের সব কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে নিহতদের মধ্যে আটজনের মরদেহ ময়নাতদন্ত ছাড়াই স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের পর দাফন করা হয়েছে। এতে দুর্ঘটনার ঘটনায় ভবিষ্যতে ফৌজদারি দায় নির্ধারণ ও অপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা কঠিন হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আইন বিশেষজ্ঞ ও শ্রমিক নেতারা।

শুক্রবার (১৪ আগস্ট) সকালে ভাটিয়ারী স্টেশন রোডসংলগ্ন সাগর উপকূলে ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইন্ডাস্ট্রিজে স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার সময় বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে নয় শ্রমিকের মৃত্যু হয়।

ঘটনার ৪৮ ঘণ্টা পরও সীতাকুণ্ড থানায় কোনো এজাহার জমা পড়েনি। থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাহিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গ্যাস কাটার সময় একে একে অচেতন

প্রত্যক্ষদর্শী ও উদ্ধারকাজে যুক্ত শ্রমিকদের বরাতে জানা গেছে, শুক্রবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে ‘এমটি রাসি’ নামের এলএনজি-এলপিজি বহনকারী একটি স্ক্র্যাপ জাহাজের ট্যাংকের অংশ কাটার কাজ শুরু হয়। একটি ট্যাংকের চারপাশ কেটে ফেলার পর হঠাৎ গ্যাস বের হতে শুরু করে।

কিছুক্ষণের মধ্যেই কাজ করা দুই শ্রমিক অচেতন হয়ে পড়েন। তাদের উদ্ধারে এগিয়ে গিয়ে আরও দুই শ্রমিক বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হন। পরে উদ্ধার করতে গিয়ে কারখানার ফোরম্যান এবং নিরাপত্তা মাস্ক পরা সেফটি অফিসারও ঘটনাস্থলে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়েন।

সরকারি বিস্ফোরক পরিদপ্তর ও ফায়ার সার্ভিসের প্রাথমিক পরিদর্শনে দুর্ঘটনাস্থলে হাইড্রোজেন সালফাইড, কার্বন ডাই-অক্সাইড, মিথেন ও অ্যামোনিয়ার মতো বিষাক্ত গ্যাসের উপস্থিতি পাওয়া যায়।

নিহতদের মধ্যে সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারী ইউনিয়নের মৌলভীপাড়া ও শনি ঠাকুরবাড়ি এলাকার দুই সহোদর মনসুর উদ্দিন (৪০) ও নাসির উদ্দিন (৩৮), পলাশ জলদাস (৩০), সানি জলদাস (২২), মতিউর রহমান সাজ্জাদ (২০), হাবিবুর রহমান (৫০) এবং গাইবান্ধার রানা মিয়া ও খোকন রয়েছেন।

নিহতদের মধ্যে শুধু পাবনার বাসিন্দা ও শিপইয়ার্ডটির সেফটি কর্মকর্তা আব্দুল আলিম সুজনের (৩৮) মরদেহের ময়নাতদন্ত হয়েছে।

পোস্টমর্টেম ছাড়াই দাফন, উঠছে প্রশ্ন

পুলিশের দাবি, নিহত শ্রমিকদের স্বজনেরা লিখিতভাবে ময়নাতদন্ত না করার অনুরোধ এবং কোনো অভিযোগ না করার কথা জানানোয় সুরতহাল শেষে মরদেহগুলো তাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

নিহত দুই ভাইয়ের ভগ্নিপতি মো. মহিউদ্দিন বলেন, শুক্রবার অনেক দেরি হয়ে যাওয়ায় দ্রুত মরদেহ বাড়িতে নিয়ে দাফন করা ছাড়া তাদের উপায় ছিল না। ভবিষ্যতে প্রয়োজন হলে পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগের কথাও তারা জানিয়েছেন।

তবে শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ, দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের পরিবারগুলোকে চাপ দেওয়া কিংবা বড় অঙ্কের ক্ষতিপূরণের আশ্বাস দিয়ে আইনি প্রক্রিয়া থেকে দূরে রাখা হচ্ছে।

বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের মহাসচিব অ্যাডভোকেট এ এইচ এম জিয়া হাবীব আহসান বলেন, অবহেলা বা কাঠামোগত গাফিলতির কারণে মৃত্যু হলে ফৌজদারি মামলায় সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে কাজ করে। ময়নাতদন্ত না থাকলে ভবিষ্যতে কারখানার মালিকদের ফৌজদারি দায় প্রমাণ করা কঠিন হতে পারে।

অনির্দিষ্টকালের জন্য ইয়ার্ড বন্ধ

দুর্ঘটনার পর বাংলাদেশ শিপ রিসাইক্লিং বোর্ড (বিএসআরবি) ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিং ইয়ার্ডের সব ধরনের জাহাজ ভাঙা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম স্থগিত করেছে।

বিএসআরবির মহাপরিচালক জানিয়েছেন, তদন্ত প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত এবং কারখানার কর্মপরিবেশ নিরাপদ না হওয়া পর্যন্ত এই স্থগিতাদেশ বহাল থাকবে।

দুর্ঘটনার কারণ ও নিরাপত্তা ঘাটতি খতিয়ে দেখতে তিনটি পৃথক তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে। এর মধ্যে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি, চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি এবং বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইকেলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) নিজস্ব তদন্ত দল রয়েছে।

প্রাথমিক তদন্তে প্রশ্ন উঠেছে, এলএনজি বা গ্যাসবাহী স্ক্র্যাপ জাহাজ কাটার আগে সেটিকে সম্পূর্ণ ‘গ্যাস-ফ্রি’ ঘোষণা করে সনদ নেওয়ার আইনি বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে মানা হয়েছিল কি না।

আইনি পথ রুদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা

বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের (টিইউসি) চট্টগ্রাম সভাপতি তপন দত্ত ঘটনাটিকে ‘আইনি পথ রুদ্ধ করার চক্রান্ত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর দাবি, নিহতদের স্বজনেরা আতঙ্কিত এবং নিরাপত্তা বিধি না মানলে এ ধরনের দুর্ঘটনা ভবিষ্যতেও ঘটতে থাকবে।

বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) চট্টগ্রাম জেলার প্রধান আল কাদেরী জয় ঘটনাটিকে ‘স্বাভাবিক দুর্ঘটনা নয়, কাঠামোগত হত্যাকাণ্ড’ বলে মন্তব্য করেছেন।

জাহাজভাঙা শিল্পে শ্রমিক নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই প্রশ্ন রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, সীতাকুণ্ড উপকূলের প্রায় ১৫০টি নিবন্ধিত ও অনিবন্ধিত ইয়ার্ডে গত পাঁচ বছরে ১৭৯টি ছোট-বড় দুর্ঘটনায় অন্তত ৩৮ শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। আন্তর্জাতিকভাবে পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ ‘গ্রিন শিপ ব্রেকিং’ এর দাবি জোরালো হলেও মাঠপর্যায়ে নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও গ্যাস শনাক্তকরণে গাফিলতির অভিযোগ থেকেই যাচ্ছে।

 

ইত্তেফাক/এসএ