সরকারের ১৮০ দিন: শিক্ষা খাত

দৃশ্যমান কম, বাস্তবায়নের পথে অনেক

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৭:০৭

তারেক রহমান সরকারের ছয় মাসে শিক্ষা খাতে বেশকিছু অগ্রগতি দৃশ্যমান। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত এরই মধ্যে পড়েছে প্রভাব। শিক্ষার মান বাড়ানো, শিক্ষার্থীদের ক্লাসমুখী করা, নকলমুক্ত পরীক্ষা ও সঠিক মূল্যায়ন থেকে শুরু করে উচ্চশিক্ষায় সুবিধা বাড়ানো ও গবেষণার দ্বার উন্মোচিত করা—প্রায় সবকিছুতেই এসেছে ইতিবাচক পরিবর্তন। পাশাপাশি বাজেটে রেকর্ড বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে শিক্ষা খাতে। এসব পদক্ষেপকে বড় সফলতা উল্লেখ করে ভবিষ্যতে এ ধারা চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান শিক্ষাবিদরা। 

জানা গেছে, নির্বাচনি ইশতেহারে শিক্ষা খাতের জন্য ঘোষিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনার অগ্রগতি প্রতিবেদন শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে গেছে। ৩৬টি প্রতিশ্রুতির মধ্যে অবকাঠামো উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল শিক্ষা, গবেষণা, ক্রীড়া-সংস্কৃতি, বৈষম্য নিরসন ও শিক্ষার্থী কল্যাণে বিভিন্ন কার্যক্রম বেশ কিছুটা এগিয়েছে। কিছু উদ্যোগ রয়েছে মাঝপথে। আবার কিছু উদ্যোগ প্রকল্প প্রস্তাব, সম্ভাব্যতা যাচাই, অনুমোদন কিংবা দরপত্র পর্যায়ে রয়েছে।

চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে সরকার গঠনের পর বিএনপির জন্য অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল শিক্ষা খাত। বিশেষ করে গণঅভ্যুত্থানের পর বিমুখ হয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে ফেরত আনা এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা—দুটিই ছিল বেশ কঠিন। সেই অবস্থা থেকে ছয় মাসের মাথায় এসে অনেকটাই ঘুরে দাঁড়িয়েছে শিক্ষা খাত। শ্রেণিকক্ষে ফিরেছে শিক্ষার্থীরা। পরিবর্তন এসেছে পরিবেশেও। এরই মধ্যে এসএসসি ও এইচএসসির মতো বড় দুটি পাবলিক পরীক্ষা সময়মতো হয়েছে। প্রশ্নফাঁস ঠেকানো, নকলমুক্ত পরীক্ষা এবং সর্বোপরি এসএসসির ফলাফলে সঠিক মূল্যায়নও এই সরকারের সাফল্যের আলোচনায়। তবে গত ছয় মাসে শিক্ষা খাতে দৃশ্যমান অর্জনে অন্যতম শিক্ষায় রেকর্ড বরাদ্দ। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ১ লাখ ৩৬ হাজার ৬০৫ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। যা জাতীয় বাজেটের ১৩ দশমিক ১ শতাংশ এবং জিডিপির প্রায় ২ শতাংশ। বিএনপির নির্বাচনি ইশতেহার অনুযায়ী, পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে জিডিপির পাঁচ শতাংশ বরাদ্দের পরিকল্পনায় প্রথম পদক্ষেপ এটি। সরকারের প্রথম ছয় মাসে প্রাথমিক ও গণশিক্ষায় বেশকিছু অর্জনও রয়েছে আলোচনায়। প্রাথমিক শিক্ষায় মান উন্নয়ন, ঝরে পড়া রোধ এবং শিক্ষকদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে নেওয়া পদক্ষেপ চোখে পড়ার মতো। ফ্রি ইউনিফর্ম, জুতা এবং স্কুল ব্যাগ বিতরণের ঘোষণা এসেছে এরই মধ্যে। এছাড়া উপস্থিতি বাড়াতে মিডডে মিল, শিখন পাঠদান প্রক্রিয়াকে আধুনিকায়নে আইটিভিত্তিক মনিটরিং চালুর কথাও বলা হয়েছে। এসেছে প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য প্রশিক্ষণ, ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা বৃদ্ধি, তৃণমূলে গণিত অলিম্পেয়ার্ড, বিতর্ক প্রতিযোগিতার মতো বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার কথাও। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা স্তরে শিক্ষাক্রম সংস্কার, মুখস্থবিদ্যা পরিহার এবং শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের বকেয়া পরিশোধেও বড় অগ্রগতি হয়েছে। এছাড়া জাতীয় শিক্ষাক্রম পর্যালোচনা, কারিগরি ও কর্মমুখী শিক্ষা, বেসরকারি শিক্ষকদের অবসর ও কল্যাণ তহবিলের অর্থ প্রদান, কারিগরি ও মাদ্রাসায় ডিজিটাল কানেক্টেভিটি, মাদ্রাসায় কারিগরি শিক্ষা চালুর উদ্যোগও আলোচনায় রয়েছে।

উচ্চশিক্ষা খাতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল সনদ প্রদানের কেন্দ্র না বানিয়ে গবেষণা ও আন্তর্জাতিক মানের কর্মসংস্থানের উপযোগী করে তুলতে কাজ করছে সরকার। গবেষণা বাড়াতে অনুদান বৃদ্ধি এবং বিদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য ঋণ সুবিধা চালু, আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্ট, সাইবার সিকিউরিটি, ডিজিটাল মার্কেটিংয়ের মতো সমসাময়িক বিষয়ে বেশ প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মাধ্যমে নারীদের সমাজে প্রতিষ্ঠিত করার ঘোষণাও এসেছে। নারী শিক্ষাকে ডিগ্রি পর্যন্ত অবৈতনিক ঘোষণা করেছে সরকার। দীর্ঘ ১৬ বছর বন্ধ থাকার পর দেশে প্রাতিষ্ঠানিক ও আলাদা মূল্যায়নের মাধ্যমে পুনরায় প্রাথমিক ও অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি পরীক্ষা চালু করা হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘ওয়ান টিচার, ওয়ান ট্যাব’ কর্মসূচির আওতায় ৫ লাখ শিক্ষককে আধুনিক ট্যাব দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এতে কাস্টমাইজড এডুকেশন অপারেটিং সিস্টেম, লার্নিং ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম, জাতীয় কনটেন্ট রিপোজিটরি, শিক্ষক প্ল্যাটফরম, পেশাগত প্রশিক্ষণ এবং প্রতি শিক্ষককে বিশেষায়িত সিম দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম বছরে ১ লাখ ৫০ হাজার, দ্বিতীয় বছরে ২ লাখ এবং তৃতীয় বছরে ১ লাখ ৫০ হাজার ট্যাব বিতরণের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে ‘টেকনোলজিক্যাল ক্যাপাসিটি বিল্ডিং অব সেকেন্ডারি অ্যান্ড হায়ার সেকেন্ডারি টিচার্স’ স্কিমের প্রস্তাব প্রণয়ন করা হয়েছে এবং ট্যাবের কারিগরি স্পেসিফিকেশনও সম্পন্ন হয়েছে। তবে মূল বাস্তবায়ন নির্ভর করছে স্কিম অনুমোদন ও অর্থায়নের ওপর।

মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম স্থাপনের ক্ষেত্রেও একাধিক প্রকল্প চলমান। লেইস প্রকল্পে ২০ হাজার ৬৮০টি মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুমের মধ্যে চলতি অর্থবছরে ৮ হাজার ৩৪০টির কারিগরি বিনির্দেশ ও ব্যয় প্রাক্কলন চূড়ান্ত হয়েছে। এসবের দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি চলছে। আইসিটি (দ্বিতীয় পর্যায়) প্রকল্পের অগ্রগতি ৫৫ দশমিক ২৪ শতাংশ। এই প্রকল্পে মাধ্যমিক উন্নয়ন অগ্রগতি ৪৫ দশমিক ৬ শতাংশ (১৬৫টি)। আনন্দময় শিক্ষা ও ক্রীড়া-সংস্কৃতিতে ১ হাজার ৫৮০ জন নবীন শিক্ষকের বেসিক প্রশিক্ষণ সম্পন্ন, ১ হাজার ৫২০ জনের প্রশিক্ষণ চলমান, লেইস প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালের জেনেরিক অংশ প্রণীত, লাইব্রেরি উন্নয়ন অনুদান প্রক্রিয়াধীন। ৫১৭টি প্রতিষ্ঠানে সিসিটিভি স্থাপনের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। এডুকেশনাল অ্যাক্সেলারেশন সাপোর্ট স্কিমে নিয়মিত খেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের কার্যক্রম চলমান। এছাড়া, অন্য একটি স্কিমে বই কর্মসূচি এবং মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনা মূল্যে ব্যাগ বিতরণ করা হবে। স্টার্টআপ সায়েন্স প্রজেক্ট অ্যান্ড ইনোভেশন আইডিয়া শোকেসিং প্রোগ্রাম গত ২৯ জুন অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ইত্তেফাক/এমএস