দুই বছরে অবকাঠামো পুনর্গঠন হয়েছে

গতি ফিরেছে পুলিশের কাজে, আক্রান্তও হচ্ছে

আপডেট : ১৭ আগস্ট ২০২৬, ০৬:২০

দুই বছর পরও এখনো পুরোপুরি ঘুরে দাঁড়াতে পারেনি পুলিশ। তবে মাঠে এখন প্রকাশ্যে পুলিশের তৎপরতা অনেক বেড়েছে। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে ‘মব’ করে আসামি ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। আক্রান্ত হচ্ছে পুলিশও। অবকাঠামোগত সংস্কার হলেও মনোবলের জায়গায় পুলিশ এখনো পিছিয়ে। এ বছরের প্রথম ৬ মাসে পুলিশের উপর ২৭১টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। বহু জায়গায় এখনো আসামি ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে গত মে মাস পর্যন্ত পুলিশের উপর ৮৭০টি হামলার ঘটনা ঘটেছে।

এমন পরিস্থিতির মধ্যে তদবির একটা বড় সমস্যা হিসেবে দেখছেন পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তারা। পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির গত বৃহস্পতিবার রাজারবাগে ‘আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত বিশেষ মতবিনিময় সভায়’ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের উদ্দেশে খানিকটা বিরক্ত হয়ে বলেছেন, বর্তমানে অনেক পুলিশ সদস্য গত ১৭ বছর ধরে ‘বঞ্চিত’ ছিলেন বলে দাবি করছেন। তারা তদবির নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছেন বিভিন্ন দপ্তরে। আইজিপি এসব পুলিশ সদস্যের উদ্দেশে বলেন, তদবির করে ভালো কোথাও পোস্টিং পাওয়া যায় না। মেধা ও যোগ্যতা দিয়ে পুলিশ সদস্যদের প্রমাণ করতে হবে। অনৈতিক লেনদেন থেকে বিরত থাকতেও নির্দেশনা দেন তিনি।

অভ্যুত্থানের পর পুলিশ বাহিনীটির শীর্ষ নেতৃত্বে বড় রদবদল এসেছে, অনেকের চাকরি গেছে এবং অনেকের বিরুদ্ধে মামলা ও বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে। তবে সার্বিকভাবে পুলিশের মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম ও অভিযানে এখনো নানা দুর্বলতা রয়ে গেছে। পুলিশে সংস্কার আনতে একটি কমিশন গঠনের কথা থাকলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। পুলিশ সপ্তাহে শীর্ষ কর্মকর্তারা বিষয়টি সরকারের কাছে তুলে ধরলেও সুনির্দিষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে বড় ধরনের কোনো সংস্কার হয়নি বলেই বাহিনীর অভ্যন্তরে আলোচনা রয়েছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক তৌহিদুল হক বলেন, সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জনে পুলিশ এখনো পিছিয়ে আছে। বারবার হামলার শিকার হয়েও তা তারা মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছে। বর্তমান নেতৃত্বে বড় পরিবর্তন আসলেও তাদের মূলধারার পুলিশিং কাজের পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই। আস্থার ঘাটতি ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়হীনতার কারণে শীর্ষ পর্যায়ের নির্দেশ মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়িত হচ্ছে না। আর এই সুযোগটি কাজে লাগিয়ে নতুন নতুন অপরাধী ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী তত্পর হয়ে উঠছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যমতে, ঐ সময়ে সারা দেশে ৪৬০টি পুলিশি স্থাপনায় আক্রমণ করা হয়। এর মধ্যে ৫৮টি থানা ও ২৬টি ফাঁড়িসহ মোট ২২৪টি স্থানে আগুন লাগানো হয়। এ ছাড়া ভাঙচুর চালানো হয় ৫৬টি থানা ও ২৪টি ফাঁড়িসহ ২৩৬টি স্থাপনায়। ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র এবং ৪ লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮টি গুলি লুট হয়, যার মধ্যে ১ হাজারের বেশি অস্ত্র এখনো উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। ক্ষতিগ্রস্ত থানা ও ফাঁড়িগুলো গণপূর্ত ও পুলিশ সদর দপ্তরের তত্ত্বাবধানে মেরামত করে কাজ শুরু করা হলেও পুলিশ এখন তীব্র যানবাহন সংকটে ভুগছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের অতিরিক্ত আইজিপি (ক্রাইম অ্যান্ড অপারেশনস) খন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, পুলিশ কমিশন গঠন নিয়ে সরকারের নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে এখনো দ্বিধা রয়েছে। তিনি বলেন, বর্তমানে মানুষের মধ্যে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া এবং সামান্য বিষয়েই প্রতিবাদী হওয়ার প্রবণতা বেড়েছে। তবে আগের তুলনায় পরিস্থিতির অনেকটাই উন্নতি হয়েছে, পুলিশ ঘুরে দাঁড়াচ্ছে এবং সরকারও এ বিষয়ে আন্তরিক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

কয়েকদিন আগে রাজধানীর আদাবরে অভিযানে গিয়ে ছিনতাইকারীদের হামলায় আহত হয়েছেন থানার ওসি ও এক এসআই। একই দিনে লালমনিরহাটের আদিতমারীতে শিশুর বস্তাবন্দি লাশ উদ্ধারের ঘটনায় আটক দুজনকে ছিনিয়ে নিতে স্থানীয়দের হামলায় এনডিসি, পুলিশ সদস্যসহ ৩০-৩৫ জন আহত হন। পুড়িয়ে দেওয়া হয় সরকারি ছয়টি গাড়ি। এর এক সপ্তাহ আগে কুমিল্লার বুড়িচংয়ে মহাসড়কে নিষিদ্ধ তিন চাকার যান আটককে কেন্দ্র করে হাইওয়ে পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর ও পুলিশ সদস্যদের মারধরের ঘটনা ঘটে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, আসামি গ্রেফতার, অপরাধবিরোধী অভিযান কিংবা আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে আক্রমণে বা প্রতিরোধের মুখে পড়ছেন পুলিশের সদস্যরা। শুধু পেশাদার অপরাধীরা নয়, অনেক ক্ষেত্রে স্থানীয় জনতা, বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ, আসামির স্বজন কিংবা সংঘবদ্ধ দলও পুলিশের ওপর হামলায় জড়াচ্ছে। আবার কোথাও কোথাও ‘মব’ তৈরি করে অপরাধী বা আসামিকে নিজেদের হাতে নিয়ে ‘বিচার’ করতে চাওয়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে। গণঅভ্যুত্থানের সময় পুলিশের ৪৪ জন সদস্য নিহত হন।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অতীতেও অভিযানে গিয়ে হামলার শিকার হয়েছেন পুলিশের সদস্যরা। ২০২১ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত প্রতি বছর গড়ে ৬০০টির মতো ঘটনা ঘটছে। ২০২৫ সালে ৬০১টি ঘটনায় পুলিশ আক্রান্ত হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের পুলিশ সদস্যরা বলছেন, সাম্প্রতিক হামলাগুলোর ধরনে পরিবর্তন এসেছে। আগে অনেক সময় দূর থেকে, নির্জন স্থানে বা রাতের আঁধারে হামলার ঘটনা বেশি দেখা যেত। এখন হামলার বড় অংশই হচ্ছে প্রকাশ্যে। আসামি ধরতে গেলে পুলিশকে ঘিরে ফেলা, অভিযানে বাধা, কুপিয়ে জখম, গুলি, আসামি ছিনতাই ও গাড়ি ভাঙচুর, এসব ঘটনা বেশি ঘটছে।

কেবল পুলিশ নয়, র‍্যাব, কোস্ট গার্ড, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ অন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের ওপরও হামলার ঘটনা ঘটছে। চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরে অস্ত্র উদ্ধার অভিযানে গিয়ে দুর্বৃত্তদের হামলায় র‍্যাব-৭-এর উপ-সহকারী পরিচালক মোতালেব হোসেন ভূঁইয়া নিহত হন। এর আগে ২০২৪ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর কক্সবাজারের চকরিয়ার ডুলাহাজারায় যৌথ বাহিনীর অভিযান চলাকালে ডাকাতদের হামলায় নিহত হন সেনাবাহিনীর লেফটেন্যান্ট তানজিম ছরোয়ার।

ইত্তেফাক/এমএস