রাস্তার পাশে চায়ের দোকান। একই দোকানে বিক্রি হয় শাক-সবজি, চা, পান, কলা বিস্কুট। দোকানের নাম ‘সততা দোকান’। কেউ এই দোকানের নাম দিয়েছেন ‘ভরসার দোকান’। ব্যতিক্রমী এই দোকানে নেই কোনো নির্ধারিত বিক্রেতা। যারা চা খেতে আসেন বা কেনাকাটা করতে আসেন, তারাই দোকানের বিক্রেতা।
এমন ব্যতিক্রমী দোকান গড়ে উঠেছে ঝিনাইদহের হরিণাকুণ্ডু উপজেলার চারাতলা বাজারে। এই বাজারের একটি ছোট চায়ের দোকানে দাঁড়িয়ে নিজের চা নিজেই তৈরি করছিলেন ৬৫ বছর বয়সী হারুন অর রশিদ। শুধু নিজের জন্য নয়, অন্যদের জন্যও চা তৈরি করছিলেন তিনি।
চায়ের দোকানে চা তৈরি করা স্বাভাবিক দৃশ্য হলেও এখানে ছিল একটু ভিন্নতা। কারণ, হারুন ওই দোকানের দোকানদার নন। তিনি এসেছিলেন কেবল চা পান করতে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দোকানে মালিক বা দোকানদার নেই। পথচারীসহ বাজারের লোকজন দোকানে এসে নিজেরাই ইচ্ছেমতো কেক-বিস্কুট নিয়ে খাচ্ছেন। কেউ চা বানিয়ে নিজে পান করছেন, কেউ অন্যদের দিচ্ছেন। যাওয়ার সময় হিসাব করে টাকা রেখে যাচ্ছেন। টাকা না থাকলে হিসাব কষে পরে এসে টাকা দিয়ে যান। বিশ্বাসের সঙ্গে চলা এ দোকানে কেউ টাকা ফাঁকি দেন না।
চার বছর ধরে এভাবেই চলছে একটি চায়ের দোকান। দোকানের মালিক সমসের আলী। তিনি প্রতিদিন সকালে দোকান খোলেন, মালামাল গুছিয়ে রাখেন, চুলা জ্বালিয়ে দিয়ে নিজের মুদি ব্যবসার কাজে চলে যান। এরপর দুপুরে একবার এবং রাতে আবার ফিরে আসেন। এরপর সারাদিনের বিক্রির হিসাব করে দোকান বন্ধ করেন।
সমসের জানান, তিনি এই দোকানটি চালু করেছিলেন কারণ আগে অন্যের দোকানে বসে চা খেয়ে তার প্রতিদিন ২০০ টাকার বেশি খরচ হয়ে যেত।
তিনি বলেন, আমি এখানে সবসময় থাকতে পারি না, আবার দোকান চালানোর মতো কোনো লোকও আমার নেই। তাই আমি এটি মানুষের বিশ্বাসের ওপর ছেড়ে দিয়েছি। এই চায়ের দোকান থেকে তার প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা আয় হয়। এমনকি দোকানের মালামাল ফুরিয়ে গেলে অনেক সময় গ্রাহকেরা নিজেরাই তা কিনে আনেন।
এসময় যারা চা খেতে আসেন, তারা মাঝেমধ্যে আমার জন্যও চা বানিয়ে রাখেন বলে জানান সমসের।
পায়রাডাঙ্গা গ্রাম থেকে আসা মতলেব হোসেন জানান, প্রতিদিন তিনি বাজারে আসেন। এই দোকানে বেশির ভাগ সময় দোকানদার থাকেন না। চা পান করতে মন চাইলে নিজেই বানিয়ে নেন। তখন অন্য কেউ চা পান করতে চাইলে তাদেরও বানিয়ে দেন। পরে যা বিল হয়, দোকানে রেখে চলে যান।
চার বছর ধরে এভাবেই দোকানটি চলছে বলে জানিয়ে আফাঙ্গীর হোসেন বলেন, খেয়ে টাকা দেন না, এমন ঘটনা সাধারণত ঘটে না। দোকানের মালিক বিশ্বাস করে দোকান রেখে চলে যান। তারা ক্রেতারাও খেয়ে সততার সঙ্গে টাকা রেখে যান। কেউ ফাঁকি দেওয়ার চেষ্টা করেন না।
বাজারের একাধিক ব্যক্তি জানান, এমন ঘটনা বর্তমানে খুবই বিরল। মানুষের প্রতি দোকানদারের বিশ্বাস ও মানুষের সততা দেখে এলাকার সবাই মুগ্ধ। মানুষ সৎ হলে জীবন কত সুন্দর ও সহজ হয়, এখানে এলে উপলব্ধি করা সম্ভব।

