সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে এডিস মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গু। ইতিমধ্যে দেশের ৬৪ জেলায় ডেঙ্গুর রোগী শনাক্ত হয়েছে। এরই মধ্যে রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন জেলার হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে রোগীর চাপ। জুন-জুলাইয়ের চেয়ে আগস্টে সংক্রমণ উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। এডিস মশা নিধন এবং বাসাবাড়িতে জমে থাকা পানি নিয়মিত পরিষ্কার করার ওপর জোর দিয়েছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিসংখ্যান বলছে—চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট আক্রান্তের হার পুরুষদের মধ্যে বেশি, যা ৬১ দশমিক ৭ শতাংশ এবং নারীদের আক্রান্তের হার ৩৮ দশমিক ৩ শতাংশ। তবে পুরুষদের মধ্যে আক্রান্তের হার বেশি হলেও মৃত্যু হার বেশি নারীদের মধ্যে; যা ৫৮ দশমিক ১ শতাংশ এবং পুরুষদের মধ্যে এই হার ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ।
বরাবরের মতো ঢাকা বিভাগে আক্রান্তের হার বেশি হলেও দক্ষিণের জেলাগুলোতে আক্রান্তের হার বেশি। দেশের সব কয়টি জেলায় কম বেশি ডেঙ্গুর রোগী শনাক্ত হয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা তাদের রোগতাত্ত্বিক বিশ্লেষণে বলেছে, গত এক সপ্তাহে দেশের ছয় জেলায় ডেঙ্গুর সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই তালিকায় আছে ঝালকাঠি, খুলনা, পিরোজপুর, বান্দরবান, ঢাকা ও ময়মনসিংহ।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুমের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর ১ জানুয়ারি থেকে গতকাল ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার পর্যন্ত খুলনায় মোট ১ হাজার ৫৪২ রোগী, তার মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। পিরোজপুর জেলায় ১ হাজার ২১০ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে।
এর মধ্যে মারা গেছেন এক জন। বান্দরবানে আছে ৪৪৮ রোগী, মৃত্যৃ হয়েছে দুই জনের। ঢাকা জেলায় মোট আক্রান্ত রোগী ৬ হাজার ৭৫৭ জন, মৃত্যু হয়েছে ৩৩ জনের। ময়মনসিংহে আক্রান্ত মোট রোগী ৮৯৪ জন এবং মৃত্যু হয়েছে ছয় জনের।
গতকাল স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সর্বশেষ ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে নতুন ৭৫৩ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে তিন জনের। এ নিয়ে চলতি বছর মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা হয়েছে ২৫ হাজার ৬০১ জন এবং মৃত্যু হয়েছে মোট ৭৪ জনের।
সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, এ বছরও ঢাকায় বেশি রোগী। ঢাকা দুই সিটি করপোরেশনসহ ঢাকা বিভাগে এ পর্যন্ত রোগী ভর্তি হয়েছে ১০ হাজার ২৩৫ জন। অন্য সাত বিভাগের মধ্যে সবচেয়ে বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছে বরিশাল বিভাগে। এই বিভাগে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা ৪ হাজার ৫৫৯ জন। এরপরে চট্টগ্রামে আছে ৪ হাজার ১০৬ জন, খুলনায় ৩ হাজার ৪৬৬ জন, ময়মনসিংহে ১ হাজার ২২৩ জন, রাজশাহীতে ১ হাজার ১৭১ জন, রংপুরে ৭০৫ জন। সিলেটে সবচেয়ে কম ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হয়েছে, যা ১৩৬ জন।
তবে কীটতত্ত্ববিদেরা আগেই সতর্ক করে বলেছিলেন, আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়বে। সরকারি হিসাবে দেখা যাচ্ছে, মে মাসে দেশের হাসপাতালগুলোয় ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছিল ৭১৪ জন। জুনে রোগী বেড়ে হয় ২ হাজার ৯০৭ জন। জুলাই মাসে ৯ হাজার ২০৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়। আর আগস্টের প্রথম ১৮ দিনে সারা দেশে ডেঙ্গু রোগী ভর্তি হয়েছে ১০ হাজার ২৯১ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে—চলতি বছর এখন পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৭৪ জনের। এখন পর্যন্ত জুলাই মাসে সর্বোচ্চ ৩৪ জনের মৃত্যু হয়েছে, এর পরের অবস্থানে আছে আগস্টের ১৮ তারিখ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ২০ জনের। এর পরের অবস্থানে আছে জুনে ১৩ জনের এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুই জন করে এবং মে মাসে এক জনের মৃত্যুর তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ ইত্তেফাককে বলেন, জুন থেকে ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগী বাড়তে শুরু করেছে; জুলাইয়ে তার চেয়ে বেশি। ডেঙ্গুর সিজনে ডেঙ্গু বাড়বে এটা স্বাভাবিক। তবে দেশ জুড়ে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে; এই বৃদ্ধিটা যদি বেশি হয়, তাহলে সেটা কতদূর পৌঁছাবে—সেটা চিন্তার বিষয়। ডেঙ্গু এখন আর শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক নয়; এটা অন্যান্য জেলাতেও ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং এখন সরকারের পরিকল্পনা করতে হবে। দেশ জুড়ে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণে। এদিকে মশা নিয়ন্ত্রণের জন্যে সব পৌরসভা, সিটি করপোরেশনকে একযোগে কাজ করতে হবে। বৃষ্টি থেমে গেলে বড় ধরনের একটা ড্রাইভ দিতে হবে। যত কন্টেইনার পড়ে আছে যেখানেই পানি জমেছে—সেগুলো অপসারণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, বড় বড় পাত্রে পানি রাখা যেমন—মটকা, ড্রাম, কিংবা চৌবাচ্চায় পানি দুই-তিন দিন পরপর পুরোনো পানি ফেলে দিতে হবে। এবং ভালো করে ঘষে পাত্র পরিষ্কার করতে হবে। আর যেখানে পানি জমে থাকছে সেগুলো অপসারণ করতে হবে। এসব কাজ করে এডিসের বৃদ্ধির ধারাটা কমানো যেতে পারে।
পাশাপাশি রোগীদের চিকিত্সার জন্য স্বাস্থ্য বিভাগের কার্যক্রম গ্রহণ করতে হবে। স্বাস্থ্য নির্দেশিকাটা আপডেট করা, গত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে ছোটখাটো পরিবর্তন থাকলে তা করে স্বাস্থ্য নির্দেশিকা হালনাগাদ করা। এই নির্দেশিকা সারা দেশে পৌঁছানো—জেলা-উপজেলা সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে চিকিত্সকদের অরিয়েন্টেশন করানো, অনলাইনে হলেও অসুবিধা নেই। আর চিকিত্সার জন্যে আইভি ফ্লুইডসহ অন্যান্য সরঞ্জাম যেন হাসপাতালে থাকে, সেটা নিশ্চিত করা।
বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে (বিএমইউ) উপ-উপাচার্য অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, এছাড়া ডেঙ্গুতে আক্রান্ত রোগীর সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় করা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। সময়মতো রোগ নির্ণয় না হলে রোগীর অবস্থার অবনতি হতে পারে। তাই দ্রুত রোগ নির্ণয়ের পাশাপাশি সঠিক চিকিত্সা নিশ্চিত করতে হবে। সেপ্টেম্বর থেকে দেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ আরো বাড়তে পারে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় চিকিত্সা ব্যবস্থার প্রস্তুতির পাশাপাশি এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং দ্রুত রোগ শনাক্তকরণে সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। ডেঙ্গু বিষয়ক এক সেমিনারে তিনি এসব কথা বলেন।

