পিংক বাস যেন আঁধারে না হারায়-

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৬:০০

ঢাকার রাস্তায় নারীর চলাচল এখনো একধরনের নিত্যযুদ্ধ। কর্মজীবী নারীকে অফিসে পৌঁছাইতে হইবে, শিক্ষার্থীকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাইতে হইবে, গৃহিণীকে সংসারের প্রয়োজন মিটাইতে বাহির হইতেই হইবে; কিন্তু গণপরিবহনে উঠিবার মুহূর্ত হইতেই তাহাদের অনেকের মধ্যে শুরু হয় একধরনের অস্বস্তিকর উৎকণ্ঠা। বাসে অতিরিক্ত ভিড়, উঠানামার সময় ধাক্কাধাক্কি, আসন দখল, অশোভন আচরণ, শারীরিক হয়রানি, কটূক্তি, অনিরাপদ বাসস্টপ এবং সন্ধ্যার পর পরিবহনের অনিশ্চয়তা নারীর নগরজীবনকে কঠিন করিয়া তোলে। গণপরিবহন তাহার চলার পথের স্বস্তিদায়ক সঙ্গী হইবার কথা ছিল; কিন্তু তাহাই অনেক সময় হইয়া উঠে তাহার ভয়ের আঁধার। এই বাস্তবতার মধ্যে রাজধানীর ৯টি রুটে বিআরটিসির 'পিংক বাস' চালুর উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। চালক ও কন্ডাক্টর হিসাবে নারীদের নিয়োগ-এই উদ্যোগকে আরো তাৎপর্যপূর্ণ করিয়াছে। ইহাতে নারীর নিরাপদ যাতায়াতের পাশাপাশি পরিবহন খাতে নারীর কর্মসংস্থানের একটি নূতন দরজাও খুলিতে পারে। ঢাকার বাহিরে বগুড়া ও চট্টগ্রামেও এই সেবা সম্প্রসারণের কথা বলা হইয়াছে। ফলে ইহা কেবল কয়েকটি বাস চালুর ঘটনা হইয়া না থাকিয়া একটি বৃহত্তর সামাজিক পরিবর্তনের সূচনা হইতে পারে।

তবে বাংলাদেশের উন্নয়ন-অভিজ্ঞতা আমাদের আশাবাদী হওয়ার পাশাপাশি সতর্ক হইতেও বাধ্য করে। জনবান্ধব অনেক উদ্যোগ বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সরকার গ্রহণ করিয়াছে। তাহাদের ঢাকঢোল পিটাইয়া উদ্বোধন করা হইয়াছে, প্রচার করা হইয়াছে, কিছুদিন মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনাও দেখা গিয়াছে; কিন্তু পরবর্তী সময়ে নিয়মিত পরিচালনা, রক্ষণাবেক্ষণ, অর্থায়ন অথবা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতায় সেই উদ্যোগের অনেকগুলিই গুরুত্ব হারাইয়াছে। ঢাকায় নারীদের জন্য পৃথক বাস চালুর উদ্যোগ ইহার পূর্বেও নেওয়া হইয়াছিল; কিন্তু তাহা দীর্ঘমেয়াদি ও নির্ভরযোগ্য গণপরিবহন ব্যবস্থায় পরিণত হয় নাই। অতীতের সেই অভিজ্ঞতা পিংক বাসের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় বিবেচনায় রাখা জরুরি।

প্রথমত, পিংক বাসকে প্রকল্প হিসাবে দেখিলে চলিবে না, ইহাকে গণপরিবহন ব্যবস্থার স্থায়ী অংশ করিতে হইবে। কতটি বাস চলিল, তাহা উদ্বোধনের দিন গুরুত্বপূর্ণ নহে। ছয় মাস পরে কতটি বাস নিয়মিত চলিতেছে, নির্ধারিত সময়ে যাত্রী পাইতেছে কি না, বিকল বাস কত দ্রুত মেরামত হইতেছে, সেবার মান কেমন, তাহাই সাফল্যের প্রকৃত মাপকাঠি।

দ্বিতীয়ত, শুধু বাসের ভিতরের নিরাপত্তা নিশ্চিত করিলেই দায়িত্ব শেষ হইবে না। বাসস্টপ, অপেক্ষমাণ যাত্রীদের স্থান, আলোকব্যবস্থা এবং বাসে উঠানামার পরিবেশও নিরাপদ করিতে হইবে। নারীরা যেন নির্দিষ্ট সময়ের পর পিংক বাসের অপেক্ষায় রাস্তার পাশে বিপন্ন অবস্থায় দাঁড়াইয়া না থাকেন, তাহাও বিবেচনায় রাখা দরকার। রুট নির্বাচনেও নিয়মিত তথ্য সংগ্রহ করা প্রয়োজন। কোন পথে নারীর যাতায়াত বেশি, কোন সময়ে চাপ বেশি, কোথায় বাসের প্রয়োজন বাড়িতেছে, এই সকল তথ্যের ভিত্তিতে রুট ও সময়সূচি প্রণয়ন করা জরুরি।

তৃতীয়ত, নারী চালক ও কন্ডাক্টর নিয়োগের উদ্যোগটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাহাদের প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ, নিরাপত্তা, ন্যায্য মজুরি এবং পেশাগত উন্নতির সুযোগ নিশ্চিত করা আবশ্যক। নারীকে সামনে আনিয়া বাস চালু করিয়া পরে সেই নারীদেরই কর্মক্ষেত্রে অনিরাপদ রাখা হইলে উদ্যোগের মূল উদ্দেশ্য ক্ষতিগ্রস্ত হইবে।

সুতরাং, আমরা আশা করিব-যেই মহতী উদ্দেশ্য লইয়া পিংক বাস চালু করা হইল-তাহা যেন ব্যর্থ না হয়। আমাদের জনসংখ্যার অর্ধেক জনগোষ্ঠী হইল নারী। তাহাদের আমাদের অর্ধেক আকাশ। অর্ধেক আকাশ অন্ধকার থাকিলে তাহা দেশের জন্যও মঙ্গলদায়ক নহে। নারীর চলাচলের স্বাধীনতা একটি শহরের সভ্যতার অন্যতম পরিমাপক। পিংক বাস সেই স্বাধীনতার পথে একটি ছোট অথচ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। তাহার সাফল্য কেবল একটি পরিবহনসেবার সাফল্য নহে, উহা অর্ধেক আকাশকে স্বস্তি, স্বাচ্ছন্দ্য ও নিশ্চিতি প্রদানের একটি মূল্যবান পদক্ষেপ।

ইত্তেফাক/এনএন