বেশির ভাগই বাল্যবিবাহের অভিযোগে অভিযুক্ত

শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের বাসিন্দা ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০২৬, ০৮:০০

সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তর পরিচালিত গাজীপুর শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রের ধারণক্ষমতা ৩০০ জন, কিন্তু সেখানে বাস করছে ৭৫০ জন বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত কিশোর। কোন কোন অপরাধে শিশুরা বেশি অভিযুক্ত জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক মো. এমরান খান জানান, সবচেয়ে বেশি আছে নারী ও শিশু নির্যাতনে ১৮২ জন। এদের সিংহভাগ বাল্যবিবাহ করে, আবার কিছু ক্ষেত্রে সরাসরি ধর্ষণের অভিযোগে অভিযুক্ত । একই চিত্র দেখা যায় গাজীপুর কোনাপড়ায় কিশোরীদের জন্য প্রতিষ্ঠিত দুস্থ শিশু প্রশিক্ষণ ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে। ১৫০ জন শিশু-কিশোরীদের উন্নয়নের সক্ষমতা নিয়ে চলা এই কেন্দ্রে বর্তমানে বাস করছে ১১৭ জন । যাদের মধ্যে ৭০ জন্যই বাল্যবিবাহের অভিযোগে আদালত হয়ে আসে । তাদের মধ্যে দুই জন আছে শিশু নিয়ে, ১২ জন গর্ভবতী । কিন্তু তাদের জন্য যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই ।

প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের 'বিটুইন চয়েস অ্যান্ড কনস্ট্রেইন্ট : এক্সামিনিং ইনস্টিটিউশনাল গ্যাপস অ্যান্ড এমার্জিং ট্রেন্ডস রিলেটেড টু চাইল্ড ম্যারেজ ইন বাংলাদেশ' (২০২৫-এর নভেম্বর প্রকাশিত) গবেষণা দেখা যায়, নতুন বাস্তবতায় অনেক কিশোর-কিশোরীর স্ব-উদ্যোগে বাল্যবিবাহ করছে। গবেষণার তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপট জলবায়ুপ্রবণ উপকূলীয় এলাকা, সীমান্তবর্তী অঞ্চল, দুর্গম অঞ্চল ও শহুরে বস্তি থেকে সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, কিশোরীদের মধ্যে নিজেদেরই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। গবেষণায় আরো দেখা গেছে, বিয়ের এক বছরের মধ্যে প্রায় অর্ধেক মেয়েই গর্ভবতী হয়ে যায়। যার ফলে প্রসবজনিত জটিলতা এবং নবজাতকের মৃত্যুঝুঁকি বেড়ে যায় ।

বিজ্ঞজন যা বলেন : শিশু সহায়তা হেল্প লাইন ১০৯৮-এর ব্যবস্থাপক চৌধুরী মোহাইমেন বলেন, বাড়িতে বাবা-মা ছাড়া দাদা-দাদি, মামা-ফুফুর মতো আত্মীয়দের পায় না। ফলে কোনো অপরাধ করলে বাবা-মা বকা দিলে সে কারো আশ্রয়ও পায় না। মোবাইল ফোন ব্যবহারে তারা অল্প বয়সে প্রেমে পড়ে। বিভিন্ন পর্নগ্রাফির সাইটে নিয়মিত যাওয়ার ফলে তাদের শারীরিক চাহিদা বাড়ে । তারা বাবা-মাকে জিম্মি করে বিয়ে করছে, এমন সংখ্যা নিতান্তই কম না ।

শিশু যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কাজ করছে শিশু যৌন হয়রানি প্রতিরোধে নেটওয়ার্ক । নেটওয়ার্কের সেক্রেটারিয়েট ব্রেকিং দ্যা সাইন্সে। সংস্থার নির্বাহী পরিচালক রোকসানা সুলতানা বলেন, অর্থনৈকিত চাপে এখন নিম্নবিত্ত বাবা-মা উভয়ও কাজ করছে । ফলে শিশুরা অরক্ষিত অবস্থায় বড় হচ্ছে। তাদের কাছে আছে স্মার্ট ফোন—এই ফোনের দৌরাত্ম্যে বয়ঃসন্ধিকাল পর্যন্ত ছেলেমেয়েরা অপেক্ষা করে না । তাদের মধ্যে সম্পর্ক হয়। শারীরিক সম্পর্ক হয়, নিজেরা বিয়ে করে—পারিবারিক নিয়মনীতিগুলো এখানে কাজ করে না। যেহেতু তারা ছোট, তাদের
বোঝালে অনেক সময় তারা ভুল বোঝে। বাবা-মার কথা শোনে না ।

বাল্যবিবাহে নারীর শিক্ষাজীবন হারিয়ে যায় : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পপুলেশন সায়েন্সেস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মঈনুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশে বাল্যবিবাহের হার এখনো অনেক বেশি হলেও, নারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা অর্জনের ওপর এর প্রভাব নিয়ে গবেষণা তুলনামূলকভাবে সীমিত। আমাদের এক গবেষণায় দেখা যায় ১৮ বছরের আগে বিয়ের তুলনায় ১৬ বছরের আগেই বিয়ে হলে নারীদের মাধ্যমিক শিক্ষা অসম্পূর্ণ থেকে যাওয়ার হার বেশি এবং সামগ্রিক শিক্ষাগত অর্জনও কম হয়। এছাড়া, প্রথম বিয়ের বয়স এক বছর কমে গেলে একজন নারীর গড়ে প্রায় ছয় মাসের শিক্ষাজীবন হারিয়ে যায়।

উন্নয়নে করণীয় : অবস্থা পরিবর্তনে পরিবার, পাড়াপ্রতিবেশী এবং সামাজিক সম্পর্কের ওপর গুরুত্বারোপ করেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞানের অধ্যাপক সাবিনা শরমিন । তিনি বলেন, পারিবারিক সামাজিক বন্ধনগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছে। এগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে। পাঠ্যসূচিতে এগুলো গুরুত্ব দিয়ে উপস্থাপন জরুরি। উন্নয়নকেন্দ্রেগুলোতে যতজন থাকার কথা ততজনই রাখতে হবে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রতিষ্ঠান) সমির মল্লিক বলেন, সমাজকল্যাণ মন্ত্ৰী অতি সম্প্রতি এই উন্নয়ন কেন্দ্রগুলো পরিদর্শন করে প্রয়োজনী সব ব্যবস্থা গ্রহণের কথা বলেন ।

ইত্তেফাক/এনএন