বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) বিভিন্ন কাজে অর্থ গ্রহণের পর নির্ধারিত সময়ে বিল-ভাউচার জমা না দেওয়ায় স্টাফদের কাছে ফেডারেশনের অগ্রিম পাওনা দাঁড়িয়েছে ৩৫ লাখ ১৪ হাজার ২৭০ টাকা। এর মধ্যে কয়েকজন স্টাফের কাছে পাওনা প্রায় লাখ টাকা বা তার বেশি হওয়ায় তাদের বেতন ‘ক্লোজড’ করে রাখা হয়েছে।
বাফুফের নির্বাহী কমিটি বিভিন্ন পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও সেগুলোর বাস্তবায়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বেতনভুক্ত স্টাফরা। ফেডারেশনের দৈনন্দিন কার্যক্রমের পাশাপাশি বিভিন্ন আর্থিক লেনদেনেও তাদের সম্পৃক্ততা রয়েছে। তবে নির্ধারিত সময়ে খরচের হিসাব ও বিল-ভাউচার জমা না দেওয়ায় দীর্ঘদিন ধরে অগ্রিম অর্থ সমন্বয় না হওয়ার বিষয়টি সামনে এসেছে।
বাফুফের সাময়িক অগ্রিম হিসাব অনুযায়ী, সর্বোচ্চ পাওনার তালিকায় রয়েছেন ওমেন্স উইংয়ের এক্সিকিউটিভ তৌহিদ। তার কাছে ফেডারেশনের অগ্রিম পাওনা প্রায় সাড়ে ৮ লাখ টাকা। এত বড় অঙ্কের অর্থের বিপরীতে প্রয়োজনীয় হিসাব জমা না হওয়ায় তার বেতন আটকে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ফেডারেশনের মিডিয়া বিভাগের দুই এক্সিকিউটিভের কাছেও অগ্রিম হিসেবে রয়েছে ১০ লাখ টাকার বেশি। মিডিয়া বিভাগে সরাসরি ব্যয় তুলনামূলক কম হলেও পুরুষ ও নারী জাতীয় দলের বিদেশ সফরের বিভিন্ন খরচ তাদের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একাধিক সফরের ব্যয়ের হিসাব জমা দিতে বিলম্ব হওয়ায় তাদের বেতনও ‘ক্লোজড’ রাখা হয়েছে।
নতুন নিয়োগ পাওয়া প্রশাসনিক কর্মকর্তা আহসানুর রবিনের কাছেও অগ্রিম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে। মে মাস পর্যন্ত তার কাছে অগ্রিম ছিল সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি। তবে জুলাই পর্যন্ত তিনি মাত্র ৪ হাজার টাকার হিসাব জমা দিয়েছেন।
জাতীয় দল-সংক্রান্ত দায়িত্ব পাওয়া এক্সিকিউটিভ মোস্তাকিমের কাছেও জুলাই পর্যন্ত অসমন্বিত ব্যয়ের পরিমাণ ৪ লাখ টাকার বেশি ছিল। অবশ্য এরই মধ্যে তিনি পাওনার কিছু অংশ সমন্বয় করেছেন।
প্রশাসনিক এক্সিকিউটিভদের পাশাপাশি বেতন ‘ক্লোজড’ তালিকায় রয়েছেন কোচ মাহবুবুর রহমান পলো। জুলাই পর্যন্ত তার কাছে বাফুফের পাওনা প্রায় ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা। কোচিং-সংক্রান্ত বিভিন্ন কর্মসূচি, বাফুফে টার্ফে ট্রায়াল ও প্রীতি ম্যাচসহ নানা কার্যক্রম তার তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয়।
তবে অগ্রিম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমের উদাহরণও রয়েছে। বাফুফের গ্রাউন্ডসম্যান চান্দু মাঠ প্রস্তুতের বিভিন্ন খরচ বহন করেন। প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা খরচ করে তিনি নির্ধারিত সময়েই ৩ লাখ ৬২ হাজার টাকার বিল জমা দিয়েছেন। জাতীয় দলের টিম অ্যাটেনডেন্ট মহসিনও প্রায় ২৩ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে ২৩ হাজার টাকার বিল এবং ৬০০ টাকা নগদে জমা দিয়েছেন।
নির্ধারিত সময়ে অগ্রিমের হিসাব ও বিল বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব বাফুফের অ্যাকাউন্টস বিভাগের। এ কার্যক্রমের সামগ্রিক তদারকির দায়িত্ব সাধারণ সম্পাদকের। সংশ্লিষ্টদের একাধিকবার তাগাদা দেওয়ার পরও এক বছরের বেশি সময় ধরে অনেক এক্সিকিউটিভ হিসাব সমন্বয় করেননি। ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) ও সাধারণ সম্পাদককে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতে হবে বলে জানা গেছে।
বাফুফের স্টাফদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও কমপ্লায়েন্স নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফিফা ও এএফসির অনুদান থেকে বেতন-ভাতা পেলেও অগ্রিম অর্থের হিসাব যথাসময়ে সমন্বয় না হওয়ায় ফেডারেশনের আর্থিক শৃঙ্খলা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। অতীতেও কমপ্লায়েন্স-সংক্রান্ত কারণে বাফুফের সাবেক সাধারণ সম্পাদক, প্রধান অর্থ কর্মকর্তা ও কয়েকজন এক্সিকিউটিভ ফিফার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়েছিলেন।
অগ্রিম সমন্বয়ে বর্তমান প্রশাসনের ধীরগতিতে নির্বাহী কমিটির একাধিক সদস্যও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, অন্যান্য অনেক করপোরেট প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বাফুফের স্টাফদের বেতন বেশি হলেও কাজের মান ও দায়িত্বশীলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। এমনকি জাতীয় দলের ম্যানেজার পদেও স্টাফদের দায়িত্ব দেওয়ার বিষয়টি নিয়েও তারা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন।

