খেলাপি ঋণ আদায় কার্যক্রম জোরদার এবং আর্থিক খাতে আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা কমাতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা ‘অলটারনেটিভ ডিসপিউট রেজ্যুলেশন’ (এডিআর) ব্যবস্থাকে আরো কার্যকর করার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এজন্য এডিআর কার্যক্রম পরিচালনায় আগ্রহী মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানকে তালিকাভুক্ত করার নতুন নীতিমালা জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ এ সংক্রান্ত সার্কুলার জারি করে। এতে ‘বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তির (এডিআর) জন্য মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তিকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলেছে, খেলাপি ঋণসংক্রান্ত বিরোধ ও আদালতে বিচারাধীন মামলা দ্রুত নিষ্পত্তিতে এডিআর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নতুন নীতিমালায় যোগ্যতা, সক্ষমতা ও উপযুক্ততা যাচাই করে মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছে।
এডিআর হচ্ছে প্রচলিত বিচারিক কার্যক্রমের বাইরে বিরোধ নিষ্পত্তির একটি পদ্ধতি। এতে বিরোধে জড়িত পক্ষগুলো নিজেরা অথবা নিরপেক্ষ তৃতীয় পক্ষের সহায়তায় বিরোধ মেটানোর চেষ্টা করে। এর মধ্যে মধ্যস্থতা বা মিডিয়েশন অন্যতম। এক বা একাধিক নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর সহায়তায় পক্ষগুলোর পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হয়।
এডিআর প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধিত হতে হবে। পাশাপাশি হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স ও টিআইএন নম্বর থাকতে হবে। প্রতিষ্ঠানটির কোনো পরিচালক বা প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খেলাপি ঋণগ্রহীতা হতে পারবেন না। প্রতারণা, দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাত্, মানি লন্ডারিং বা অন্য কোনো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত ব্যক্তিও প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট দায়িত্বে থাকতে পারবেন না। আবেদন করার আগে প্রতিষ্ঠানটির অন্তত তিন বছরের ব্যাবসায়িক বা পেশাগত অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
এডিআর প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট সাংগঠনিক কাঠামো রাখতে হবে। পরিচালনা পর্ষদ বা সমমানের প্রশাসনিক পর্ষদের অন্তত ৫০ শতাংশ সদস্যকে মধ্যস্থতাকারী হওয়ার যোগ্যতাসম্পন্ন হতে হবে। এছাড়া আলাদা প্রশাসনিক ইউনিট বা সেল, মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা কাঠামো থাকতে হবে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানের আবেদন করার আগের তিন বছরের নিরীক্ষিত আর্থিক বিবরণী থাকতে হবে। প্রতিটি এডিআর প্রতিষ্ঠানের এক বা একাধিক মধ্যস্থতাকারী প্যানেল থাকতে হবে। প্রতিটি প্যানেলে অন্তত পাঁচ জন মধ্যস্থতাকারী রাখতে হবে। এর মধ্যে অন্তত এক জন হিসাববিদ ও একজন আইন বিশেষজ্ঞ থাকতে হবে। মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করতে হলে ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, আইন পেশা, হিসাবরক্ষণ, নিরীক্ষা বা বিচারিক কাজে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা থাকতে হবে।
বিরোধের কোনো পক্ষের সঙ্গে তার সরাসরি বা পরোক্ষ স্বার্থের সংঘাত থাকা যাবে না। কোনো ফৌজদারি আদালতে দণ্ডিত, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শাস্তিপ্রাপ্ত কিংবা অর্থ আত্মসাত্, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও অনৈতিকতার কারণে চাকরি বা পেশা থেকে বরখাস্ত ব্যক্তি মধ্যস্থতাকারী হতে পারবেন না। কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের ঋণখেলাপি বা আদালত কর্তৃক দেউলিয়া ঘোষিত ব্যক্তিও এ দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। এডিআর প্রতিষ্ঠানকে নিজস্ব ওয়েবসাইট ও ইমেইল ঠিকানা রাখতে হবে। অনলাইন বা ভার্চুয়াল মধ্যস্থতা ও শুনানির জন্য ইন্টারনেট এবং অডিও-ভিডিও কনফারেন্সিং সুবিধা থাকতে হবে।
এছাড়া মামলা গ্রহণ, নথি ব্যবস্থাপনা, কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, সময়সূচি নির্ধারণ ও প্রতিবেদন তৈরির জন্য ডিজিটাল ক্যাশ ম্যানেজমেন্ট সিস্টেম রাখতে হবে। ব্যক্তিগত ও মামলাসংক্রান্ত তথ্যের নিরাপত্তার জন্য সাইবার নিরাপত্তা, রিকভারি ব্যবস্থাও থাকতে হবে।
এডিআর প্রতিষ্ঠানের কনফ্লিক্ট ইন্টাররেস্ট পলিসি থাকা বাধ্যতামূলক। কোনো সম্ভাব্য বা প্রকৃত স্বার্থের সংঘাত দেখা দিলে তা দ্রুত লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট পক্ষ ও প্রতিষ্ঠানকে জানাতে হবে। স্বার্থের সংঘাত থাকলে সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারীকে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়াতে হবে এবং প্রয়োজনে নতুন মধ্যস্থতাকারী নিয়োগ করতে হবে।
মধ্যস্থতা শেষ বা ব্যর্থ হওয়ার পরও ঐ কার্যক্রমের সময় পাওয়া তথ্য, নথি, যোগাযোগ ও কার্যবিবরণী গোপন রাখতে হবে। আইন, আদালতের আদেশ বা বৈধ কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া এসব তথ্য তৃতীয় পক্ষের কাছে প্রকাশ করা যাবে না। এডিআর প্রতিষ্ঠান তালিকাভুক্তির জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক ১০০ নম্বরের মূল্যায়ন ব্যবস্থা করেছে। আবেদনকারী প্রতিষ্ঠানকে অন্তত ৭০ নম্বর পেতে হবে। এর কম নম্বর পেলে আবেদন প্রত্যাখ্যাত হবে। বাংলাদেশ ব্যাংক আবেদন, নথি যাচাই ও পরিদর্শনের ফলাফলে সন্তুষ্ট হলে কোনো প্রতিষ্ঠানকে এডিআর প্রতিষ্ঠান হিসেবে তালিকাভুক্ত করতে পারবে। তালিকাভুক্তির মেয়াদ হবে তিন বছর। প্রয়োজন হলে বাংলাদেশ ব্যাংক তালিকাভুক্তির সময় বিভিন্ন শর্ত আরোপ করতে পারবে।

