সিলেট মহানগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার নিকুঞ্জ ভিলায় বৃদ্ধ দম্পতি ও তাদের গৃহকর্মীকে হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত আসামি বাবুল মিয়া আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিয়েছেন। গ্রেপ্তারের পরপরই পুলিশের কাছে গৃহপরিচারিকার সঙ্গে প্রেমের সম্পর্কের কথা বললেও আদালতে বলেছে ভিন্ন কথা।
বাসা ভাড়ার টাকা জোগাড়ে চুরি করতে গিয়ে দেখে ফেলায় প্রথমে গৃহপরিচারিকা, তারপর গৃহকর্ত্রী ও গৃহকর্তাকে সাথে নিয়ে যাওয়া ছুরি দিয়ে একাই খুন করার কথা স্বীকার করে আদালতে জবানবন্দি দেয় বাবুল মিয়া। জবানবন্দি শেষে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের এক কর্মকর্তা এসব তথ্য জানান।
চারদিনের রিমান্ড শেষে বাবুল মিয়াকে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সিলেটের অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ফারহানা সুলতানার আদালতে হাজির করা হয়। এসময় বাবুল মিয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দী দিতে সম্মত হন। এরপর সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত তার জবানবন্দী রেকর্ড করা হয়।
সিলেটের কোর্ট ইন্সপেক্টর সৈয়দ মাহবুবুর রহমান রাতে এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেন, আসামি আদালতে দোষ স্বীকার করেছে। তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।
তবে এসএমপি পুলিশের এক কর্মকর্তা জানান, জবানবন্দি দেওয়ার সময় বাবুল মিয়া শান্ত ছিল। এই পুলিশ কর্মকর্তার মতে, বাবুল মিয়া এই তিন খুনের সাথে নিজেকে জড়িয়ে তার জবানবন্দিতে বলে, আগের দিন রাতে তার বাসা ভাড়ার জন্য বাসার মালিক চাপ দেয় এবং বাসা ছেড়ে যেতে বলে।
ওই কর্মকর্তা আরও জানান, বাবুলের দাবি, হত্যাকাণ্ডের আগের রাতে তার বাসার মালিক ভাড়ার টাকা পরিশোধের জন্য চাপ দেন এবং বাসা ছেড়ে দেওয়ার কথা বলেন। এতে বাসাভাড়ার টাকা জোগাড়ের জন্য চুরির সিদ্ধান্ত নেন তিনি। তাঁর আগে থেকেই জানা ছিল, রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসা নিকুঞ্জ ভিলায় সব সময় টাকা-পয়সা থাকে। তাই ওই বাসাতেই চুরি করার পরিকল্পনা করেন।
জবানবন্দি অনুযায়ী, ১২ আগস্ট সকাল ৯টা ২৫ মিনিটের দিকে বাবুল নিকুঞ্জ ভিলায় যান। বাসার সিঁড়িতে সিসি ক্যামেরা রয়েছে, বিষয়টি তিনি আগে থেকেই জানতেন। তাই সিঁড়ি দিয়ে না উঠে বেলকনিতে যান। সেখানে একটি কক্ষের দরজা খোলা পেয়ে তিনি ভেতরে ঢুকে পড়েন। তার সঙ্গে একটি ছুরিও ছিল বলে আদালতে স্বীকার করেন তিনি।
কক্ষে ঢোকার পরই গৃহপরিচারিকা তাহমিনার মুখোমুখি হন বাবুল। তাকে দেখে তাহমিনা দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করলে পেছন থেকে ধরে ফেলেন তিনি। এরপর উপুড় করে ছুরি দিয়ে আঘাত করতে থাকেন। একপর্যায়ে তাহমিনা মেঝেতে পড়ে গেলে সেখানেও তাঁকে ছুরিকাঘাত করা হয়। তার চিৎকার শুনে গৃহকর্ত্রী সুরাইয়া বেগম সেই কক্ষে এসে তাহমিনাকে ছুরি দিয়ে আঘাত করতে দেখে বাবুলের পিঠে চড়াও হতে থাকেন সুরাইয়া বেগম।
বাবুল সে সময় পেছনে না তাকিয়েই ছুরি চালিয়ে দেয়, এতে সুরাইয়া বেগমের গলায় লেগে তিনিও পড়ে যান মেঝেতে। তাকে আরও কয়েকটি আঘাত করে বাবুল। একপর্যায়ে অন্য কক্ষ থেকে বের হয়ে আসেন গৃহকর্তা আব্দুস সাত্তার। খুনের ঘটনা দেখে ফেলায় তাকেও খুন করে বাবুল মিয়া। বাবুল মিয়া তার জবানবন্দিতে বলে, তিনজনকে খুনের পর সে তার শরীরে লেগে থাকা রক্ত পরিষ্কার করার জন্য বাথরুমে যায়। সেখান থেকে বেরিয়ে একটি কক্ষে টাকা-পয়সা খুঁজতে থাকে।
একপর্যায়ে কিছু ৫০০ টাকার নোট পায় যা পরে গুনে দেখে ১৫ হাজার টাকা। বাসার আরও কিছু নেওয়ার ইচ্ছা থাকলেও বাসার মোবাইল ফোন বেজে ওঠা ও মূল দরজার পাশে কেউ কথা বলার কারণে দ্রুত সেই বারান্দা দিয়েই নিচে নেমে যায় বলে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে বাবুল মিয়া উল্লেখ করেছে বলে এই পুলিশ কর্মকর্তা বর্ণনা করেন।
তিনি জানান, বাবুল মিয়া আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে জানায়, সেই বাসা থেকে বেরিয়ে সে মেলার মাঠে গিয়ে বসে থাকে। বিকেলে বাসায় ফিরলেই পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করে।
উল্লেখ্য, গত ১২ আগস্ট সকাল ৯টার দিকে নগরীর রায়নগর মিতালী আবাসিক এলাকার ১১১ নম্বর বাসায় তিনজনকে হত্যার ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন- ওই বাসার মালিক মো. আবদুস সাত্তার (৮২), তার স্ত্রী সুরাইয়া বেগম (৭৬) এবং গৃহপরিচারিকা তাহমিনা বেগম (১৫)।

