বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭২ সালে একটি প্রেসিডেন্সিয়াল আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশন (বিএসসি) নামক সংস্থাটি গড়ে তোলেন এবং ১৯৭৪ সালে ‘বাংলার দূত’ নামে একটি বিদেশগামী জাহাজ দিয়ে সংস্থাটির যাত্রা শুরু হয়। এসময় পিএনএসসি (পাকিস্তান ন্যাশনাল শিপিং করপোরেশন) ফেরত কিছু বাঙালি কর্মকর্তা-কর্মচারী, মাস্টার মেরিনার ও চিফ ইঞ্জিনিয়ারকে সঙ্গে নিয়ে ক্যাপ্টেন মো. শফি, ক্যাপ্টেন কিউ বি এম রহমান প্রমুখ ডিজি শিপিং, পিওএমএমডি, আইডব্লিউটিএ এবং বিএসসির মতো প্রতিষ্ঠানগুলোর হাল ধরেন। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রমে স্বল্প সময়ে বিএসসি বহরে ২০-২৫টি জাহাজ সংযোজিত হয় এবং অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোও আস্তে আস্তে সামনের দিকে এগোতে থাকে।
বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের শুরুটা ভালোই ছিল। কিন্তু পরবর্তীকালে মাথা ভারি প্রশাসন, ট্রেড ইউনিয়নের আধিপত্য, দুর্নীতি এবং বিশেষত কমার্শিয়াল কার্যক্রমে অদক্ষতার কারণে সংস্থাটি আস্তে আস্তে আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হতে থাকে এবং নব্বই দশকের দিকে সংস্থাটির জাহাজ সংখ্যা তলানিতে নেমে আসে। তবে আশার কথা, বছর দুই-তিন আগে বর্তমান সরকার নতুন জাহাজ ক্রয়ের কাজে মনোনিবেশ করার পর পূর্ববর্তী পুরোনো দুটি জাহাজের সঙ্গে এ পর্যন্ত বিএসসি বহরে আরো ছয়টি নতুন জাহাজ সংযোজিত হয়েছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে, একটি জাহাজ কোম্পানির সাফল্য ব্যর্থতা প্রধানত ‘কোম্পানির পরিচালন দক্ষতার’ ওপর নির্ভর করে। জাহাজে কর্মরত অফিসার-ক্রুদের এ বিষয়ে তেমন কিছু করার নেই। জাহাজে কর্মরত এসব প্রশিক্ষিত জনবল আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে জাহাজ চালান। তাদের কোনো ভুলত্রুটি হলে জাহাজের ‘বীমা কভারেজ’ থাকে। কিন্তু জাহাজ ক্রয়ের সময় ভুলত্রুটি, জাহাজের জন্য মালামাল জোগাড় করার মতো বড়ো কাজগুলো আফিসে বসে করতে হয়। এসব কাজে লুটপাট-ভুলত্রুটি হলে কোম্পানি লোকসানে যাবে এমনটাই স্বাভাবিক !
আপাতদৃষ্টে বিএসসিকে একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলোর দিকে নজর দেয়া জরুরি— ১. বিএসসি অফিসে একটি অভিজ্ঞতা সম্পন্ন, সত্ ও কার্যকর প্রশাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এ কাজে আমলা অথবা ‘মিলিটারি ব্রাসদের’ ওপর নির্ভরতা কমিয়ে এনে, অভিজ্ঞ মাস্টার মেরিনার/চিফ ইঞ্জিনিয়ার এবং প্রয়োজনে, কমার্শিয়াল কাজ দেখভালের জন্য বিদেশি ‘এক্সপার্ট’ এনে হলেও উপযুক্ত একটি ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। বর্তমানে যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোয় বাংলাদেশি মেরিনারদের অনেকেই সরকারি অফিস এবং বেসরকারি শিপিং অফিসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করছেন। প্রয়োজনে উপযুক্ত প্রণোদনা এবং উত্সাহ প্রদানের মাধ্যমে এসব মেরিনারকে দেশে ফিরিয়ে এনে কাজে লাগানো যেতে পারে।
২. আমার মনে আছে, আশির দশকে আমি হংকংয়ের যে কোম্পানিটিতে কাজ করতাম, তাদের শ-খানেকের বেশি জাহাজ ছিল। এসব জাহাজের বেশিভাগই লক্ষাধিক টন মালামাল নিয়ে চীন আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে চলাচল করত। এই বিশাল জাহাজ বহরটি হংকংয়ের ‘কুনট রোডে’ অবস্থিত একটি বহুতল ভবনের ৯-১২ অর্থাত্ চারটি ফ্লোর বিশিষ্ট একটি অফিসের মাধ্যমে পরিচালিত হতো। উল্লেখ্য, বর্তমানে বিএসসি ব্যতীত বাংলাদেশে রেজিস্ট্রিকৃত ব্যক্তিমালিকানাধীন জাহাজের সংখ্যা কমবেশি ৪৮টি এবং বাংলাদেশি মালিকানাধীন বিদেশে রেজিস্ট্রিকৃত জাহাজের সংখ্যা ২০-৩০টি। এসব জাহাজ কোম্পানি স্বল্পসংখ্যক লোকবল ও স্বল্প পরিসরের অফিসে বসে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবসার কাজ পরিচালনা করে যাচ্ছেন। বিএসসিকেও তাদের বড়ো বড়ো দালানকোঠা, বিশাল ওয়ার্কশপ ও দামি গাড়ি-ঘোড়ার আধিক্য কমিয়ে এনে পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে।
৩. পর্যাপ্তসংখ্যক জাহাজ ব্যতীত এ সংস্থাটি কখনই লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে না। কাজেই বিএসসিকে তাদের জাহাজ সংখ্যা বাড়াতে হবে এবং জাহাজ কেনার আগে এগুলো কী কাজে ব্যবহার করা হবে (পারপাস বিল্ট) সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। ব্যক্তিমালিকাধীন কোম্পানিগুলো প্রধানত নিজেদের মালামাল বহন করার জন্য জাহাজ কিনেছে। অন্য মালামাল বহন করে যে মুনাফা হয় সেটি তাদের বাড়তি উপার্জন। বিএসসিকেও জাহাজ কেনার আগে ‘কমার্শিয়াল’ বিষয়টির কথা মাথায় রাখতে হবে।
আমার জানা মতে, পায়রা বন্দরে অচিরেই একটি ‘বৈদ্যুতিক হাব’ গড়ে উঠবে। মোংলা বন্দরের রামপালেও বড়ো একটি বিদ্যুেকন্দ্র গড়ে উঠছে। এসব বিদ্যুেকন্দ্রের জন্য প্রচুর কয়লা আমদানি করতে হবে। বিএসসি চাইলে ‘ফ্লাগ প্রটেকশনের’ বাড়তি সুবিধা নিয়ে এসব কয়লা তাদের নিজস্ব জাহাজে পরিবহন করতে পারবে। সেক্ষেত্রে বিএসসিকে জাহাজসংখ্যা বাড়াতে হবে। এসব নতুন জাহাজের প্রতিটিতে ১০-১২ জন ক্যাডেটের বাড়তি থাকার ব্যবস্থা করে নিলে মেরিন একাডেমি থেকে বের হওয়া ক্যাডেটদের ‘সি টাইম’ শেষ করার বাড়তি ব্যবস্থা হবে। এসব ক্যাডেট ভবিষ্যতে দেশীয় জাহাজের জন্য অফিসারের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে কাজ করে দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে পারবেন। এ কাজটি ব্যক্তিমালিকাধীন জাহাজ কোম্পানিগুলো বর্তমানে সাফল্যের সঙ্গে করে যাচ্ছে।
পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে, যে কোনো দেশের জন্য নিজস্ব ‘ফ্লাগ ক্যারিয়ার’ থাকা একটি গর্বের বিষয়। কাজেই এ সংস্থাটি ব্যবসাসফল হয়ে টিকে থাকুক এমনটাই কামনা। সেক্ষেত্রে সংস্থাটিকে মালের মালিককে ‘নিরবচ্ছিন্ন সেবা’ প্রদানের মনোভাব নিয়ে সামনে এগোতে হবে। কোনো জাহাজ বিদেশি বন্দরে আটক হয়ে থাকুক, খুচরা যন্ত্রাংশের অভাবে জাহাজ বন্ধ হয়ে মাঝ সমুদ্রে ভেসে থাকুক অথবা ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাতে না পারার মতো অবস্থাগুলো কোনোভাবেই কাম্য নয়। কারণ, মালের মালিক সময়মতো তার মালামাল না পেলে বিএসসির জাহাজের ওপর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে।
n লেখক : মেরিন ক্যাপ্টেন, শিপ সার্ভেয়ার এবং কনসালট্যান্ট
