সফলতা নিয়ে সংশয়

আপডেট : ১৮ আগস্ট ২০১৯, ২১:০৯

ধীরে ধীরে ছন্দে ফিরছে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীর (জম্মু-কাশ্মীর)। কারফিউ উঠে স্কুল-কলেজ খোলার পর বেশকিছু জায়গায় মোবাইলে ইন্টারনেট সেবাও চালু হয়েছে। ১০০টি টেলিফোন এক্সচেঞ্জের মধ্যে ১৭টি চালু করা হয়। চালু হয় প্রায় ৫০ হাজার ল্যান্ডলাইন। কিন্তু সহিংসতার আশঙ্কায় আবার বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ভারতীয় সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ ও ৩৫-এ ধারা রদের মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীরকে দুইটি কেন্দ্র শাসিত অঞ্চলে ভাগ করা হয়। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার মধ্যে অস্বাভাবিক হওয়ার আশঙ্কাটাও ক্রমেই বাড়ছে। যদিও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পরিস্থিতি শান্ত করার সব রকম প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু কাশ্মীরিরা এই অঙ্গীকার কতটা মানবেন তা নিয়ে সংশয় বাড়ছে।

৩৭০ অনুচ্ছেদ বিলোপে ক্ষুব্ধ কাশ্মীরিরা: বাসিন্দারা মনে করছেন, এই অনুচ্ছেদ বিলোপে কাশ্মীর আর বাকি ভারতের মধ্যে বিশ্বাস বা ভরসার নড়বড়ে সেতুটাও ভেঙে গেছে। রাজপুরার ব্যবসায়ী ইরফান জাভিদ বিবিসিকে বলেন, ভারতই যেহেতু সেই সেতুটা ভেঙে দিয়েছে তাই এখন কাশ্মীরের রাজনৈতিক নেতৃত্বের, তা সে বিচ্ছিন্নতাবাদীরাই হোন বা মূলধারার ভারতপন্থি রাজনীতিবিদরা তাদের এখন খুব ভেবে-চিন্তে স্থির করতে হবে কাশ্মীরের ভবিষ্যত্ কাদের সঙ্গে হবে। কাশ্মীর ইউনিভার্সিটির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মুদাসসর নাজির মনে করিয়ে দেন, দেশভাগের আগে কাশ্মীর কিন্তু স্বতন্ত্র একটি দেশ ছিল, স্বাধীন মুলুক ছিল। সাতচল্লিশের পর সেই দেশকেই ভারত আর পাকিস্তান আধাআধি ভাগ করে নিল। ইরফান জাভিদ আরো জানান, ৩৭০ যে শুধু কাশ্মীরের জন্য ছিল তা কিন্তু নয়, জম্মুর হিন্দুরা বা লাদাখের বৌদ্ধরাও এই স্বীকৃতি বা অধিকার ভোগ করে আসছেন গত ৭০ বছর ধরে। তার মতে, বিশেষ মর্যাদা ভারতের অন্য রাজ্যেও আছে। কিন্তু এটা কেবল মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশ বলেই এই অধিকার কেড়ে নেওয়া হলো। তাই স্মরণ রাখতে হবে, কাশ্মীরিরা নিজের রুটি ভাগ করে নিতে পারে, কিন্তু নিজের জমি বা মাকে অন্যের সঙ্গে ভাগ করতে চাইবে না।

কাশ্মীর গভীর সংকটের দিকে?: কাশ্মীরের বেশিরভাগ মানুষ এই সিদ্ধান্তে যে প্রবল ক্ষুব্ধ তা আর গোপন নেই এবং এর ফলে উপত্যকায় সশস্ত্র বিক্ষোভ নতুন করে প্রসার পাবে কি না সেই প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে। আবদুল্লাহ বা মুফতি পরিবারের মতো কাশ্মীরের ভারতপন্থি রাজনীতিকদের কিংবা হুরিয়ত কনফারেন্সের বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাদের প্রাসঙ্গিকতা কতটা বজায় থাকবে সেটাও বেশ অস্পষ্ট। তবে সবচেয়ে বড়ো কথা হলো— লাখ লাখ সেনা মোতায়েন করে কাশ্মীরকে বাকি ভারতের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে মিশিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ দিল্লি নিয়েছে তা আদৌ সফল হবে কি না মূলত সেটাই এখন দেখার বিষয়।

বাডগামের বাসিন্দা আশরাফ-মুদাসসরার অভিযোগ, নরেন্দ্র মোদি সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই কাশ্মীরের প্রতিটা জেলায় মুসলিমদের হেনস্থা করা হচ্ছে। গর্ভবতী মহিলারা পর্যন্ত হাসপাতালে যেতে পারছেন না। তল্লাশিচৌকি আর ফৌজি ব্যারিকেডে স্বাভাবিক জীবনযাপন বিপর্যস্ত হয়ে উঠেছে। কাশ্মীরের প্রবীণ শিক্ষাবিদ হামিদা নাঈম বানো বিবিসিকে বলেন, গত দুই-তিন বছরে ভারতের নিরাপত্তাবাহিনী কাশ্মীরে হাজারের ওপর কিশোর-যুবককে খতম করেছে। আর এখন তারা কী নতুন বার্তা দিল? এটা তো বুঝতে হবে যে দুর্বিষহ জীবনে হতাশ হয়েই কাশ্মীরিরা বন্দুক হাতে তুলে নিচ্ছে। না হলে কেন শিক্ষিত, প্রতিভাবান তরুণরা এমনি এমনি নিজেদের জীবন শেষ করে দিতে যাবে? প্রশ্ন অধ্যাপক বানোর।

বছরতিনেক আগে বিদ্রোহী নেতা বুরহান ওয়ানির মৃত্যু যেভাবে কাশ্মীরি তরুণদের দলে দলে সশস্ত্র পথে আসতে উদ্বুদ্ধ করেছিল, এখন রাতারাতি ৩৭০ অনুচ্ছেদ মুছে দেওয়ার সিদ্ধান্তও একই ধরনের ট্রিগারের কাজ করবে বলে অনেকেই মনে করছেন। এ বিষয়ে শ্রীনগরের রাজপুরায় গওহর বাট বিবিসিকে বলেন, তরুণদের যদি সরকার পাশে চায় তাহলে তাদের স্বপ্নটা কী,   তা তো বুঝতে হবে! তা না করে আপনি দুম করে কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা কেড়ে নিলেন,  এর লাভ-ক্ষতি  তরুণদের বোঝানোর কোনো চেষ্টাই করলেন না। এতে ওরা তো বিগড়ে যাবেই।

কাশ্মীরে দিল্লির সমর্থনপুষ্ট কোনো নতুন রাজনৈতিক দলের আবির্ভাব হলেই কি বাকি ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের আত্মিক যোগাযোগ সম্ভব? কাশ্মীরের নবীন রাজনীতিবিদ ও জেএনইউর সাবেক ছাত্রনেত্রী শেহলা রশিদ মনে করেন, এই তথাকথিত ইন্টিগ্রেশনের (অন্তর্ভুক্তি) তত্ত্বটা একেবারে অবাস্তব। তার প্রশ্ন, যেখানে অমরনাথ তীর্থযাত্রীদের এবং ভারতীয় পর্যটকদের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে কাশ্মীরে ৩৭০ ধারা বিলোপ করতে হয়, সেখানে কীভাবে ইন্টিগ্রেশন সম্ভব? কাশ্মীর গবেষক রাম পুনিয়ানও মনে করেন, একটা ভূখণ্ডকে নিজের দেশে যুক্ত করার দুটো রাস্তা আছে। একটা হলো সেই সমাজের গণতন্ত্রীকরণের মাধ্যমে, ভরসার সেতু গড়ে এবং তাদের মন জয় করে। দ্বিতীয় পথটা হলো সামরিক শক্তি প্রয়োগ করে। লাখ লাখ সেনা ও আধা সেনা পাঠিয়ে হয়তো কিছুদিন কাশ্মীরকে গ্যারিসন বানিয়ে রাখা সম্ভব, তবে দীর্ঘস্থায়ী শান্তির জন্য একটা কার্যকরী রোডম্যাপ অপরিহার্য।

মোদির প্রতিশ্রুতি: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দাবি করেছেন, বিশেষ মর্যাদা বাতিলের সিদ্ধান্ত কাশ্মীরের ‘অতীত গৌরব’ ফিরিয়ে আনবে। ভারতের উন্নয়নে কাশ্মীর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে— এই অঙ্গীকার করে মোদি বলেন, অনুচ্ছেদ ৩৭০ বিলোপ করার সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন তার সরকারের একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এই অনুচ্ছেদ কাশ্মীরে কেবল দুর্নীতিকেই অনুপ্রেরণা দিয়েছে জানিয়ে মোদি বলেন, দেশের অভ্যন্তরের নিন্দুকেরা ‘রাজনীতির খেলা’ খেলছেন।