সরাসরি জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ প্রবণতা: টিআইবি

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৬, ১৭:১৫

দ্বৈত নাগরিকত্বের প্রশ্নে সাংবাদিকদের সরাসরি জবাব না দিয়ে পাল্টাপ্রশ্ন করায় পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সমালোচনা করেছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। সংস্থাটির মতে, এ ধরনের প্রতিক্রিয়া পতিত কর্তৃত্ববাদী আমলের ‘শুট দ্য মেসেঞ্জার’ প্রবণতার প্রতিফলন এবং তা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও জনগণের তথ্য জানার অধিকারের জন্য উদ্বেগজনক।

মঙ্গলবার (২৫ আগস্ট) দেওয়া এক বিবৃতিতে টিআইবি বলেছে, টেকনোক্র্যাট কোটায় দ্বৈত নাগরিকত্বধারী কোনো ব্যক্তিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ সাংবিধানিকভাবে বৈধ কি না, সে বিষয়ে সরকারের পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরও স্বচ্ছভাবে অবস্থান ব্যাখ্যা করা প্রয়োজন।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংবিধানের ৫৬(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সংসদ সদস্য নন, এমন কাউকে মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দিতে হলে তাকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার যোগ্য হতে হবে। অন্যদিকে, ৬৬(২)(গ) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি রাষ্ট্রের নাগরিকত্ব অর্জনকারী বা ওই রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য স্বীকারকারী ব্যক্তি সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অযোগ্য। দ্বৈত নাগরিকত্বের ক্ষেত্রে বিদেশি নাগরিকত্ব ত্যাগের বিষয়টিও সংবিধানের ৬৬(২ক) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে।

এ কারণে বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল থাকা অবস্থায় টেকনোক্র্যাট কোটায় প্রতিমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগের বিষয়টি সাংবিধানিক প্রশ্ন তৈরি করে বলে মনে করছে টিআইবি। সংস্থাটির দাবি, এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা না দিয়ে দায়িত্ব গ্রহণ করায় নিয়োগটি নিজেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

টিআইবির ভাষ্য অনুযায়ী, সাংবাদিকরা বিষয়টি নিয়ে সুনির্দিষ্ট প্রশ্ন করলে প্রতিমন্ত্রী সরাসরি উত্তর না দিয়ে ‘কে নিউজ করছে’ এবং ‘কার এত জ্বালা’ এ ধরনের পাল্টাপ্রশ্ন করেন।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সংবাদটি কে করেছে বা কে প্রশ্ন তুলেছে, সেটি মূল বিষয় নয়। মূল প্রশ্ন হলো, প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার সময় তার বিদেশি নাগরিকত্ব বহাল ছিল কি না। জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট এমন সাংবিধানিক প্রশ্নের সরাসরি উত্তর দেওয়া তার দায়িত্ব।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক আরও বলেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জনগণের তথ্য জানার অধিকার এবং জনস্বার্থের বিষয়ে প্রশ্ন করার সুযোগ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। দায়িত্বশীল রাষ্ট্রীয় পদে থাকা ব্যক্তিদের কাছ থেকে এ ধরনের প্রশ্নের জবাবে তথ্যভিত্তিক ও সরাসরি বক্তব্য প্রত্যাশিত।

প্রতিমন্ত্রী প্রয়োজনীয় প্রমাণ প্রকাশ করে নিজের নাগরিকত্বের অবস্থান পরিষ্কার করলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারতেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি। কিন্তু এর পরিবর্তে দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রতিবেদনকারী গণমাধ্যম ও প্রশ্ন উত্থাপনকারী সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষোভপূর্ণ পাল্টাপ্রশ্ন করা একজন প্রতিমন্ত্রীর জন্য অনুচিত বলে মনে করে টিআইবি।

সংস্থাটির মতে, এ ধরনের আচরণ সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ওপর অযাচিত চাপ তৈরি করার পাশাপাশি স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও ‘চিলিং ইফেক্ট’ সৃষ্টি করতে পারে। এতে ক্ষমতাসীন বা রাষ্ট্রীয় দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের অস্বস্তিকর বিষয়ে প্রশ্ন করাকে সাংবাদিকদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে এবং আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মসেন্সরশিপ বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় পদকে ঘিরে দ্বৈত নাগরিকত্বের বিতর্কের আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় ভাবমূর্তির ওপর প্রভাব পড়তে পারে বলেও মনে করছে টিআইবি।

এ কারণে প্রতিমন্ত্রীর প্রকৃত নাগরিকত্বের অবস্থা সম্পর্কে সঠিক ও প্রামাণ্য তথ্য দ্রুত প্রকাশের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে সংস্থাটি। একই সঙ্গে তার নিয়োগের সাংবিধানিক বৈধতার বিষয়ে যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়ার দাবি জানিয়েছে তারা।

এ ছাড়া সরকারের অন্য কোনো মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী বা সমমর্যাদার দায়িত্বশীল ব্যক্তির দ্বৈত নাগরিকত্ব নিয়ে প্রশ্ন থাকলে, স্বচ্ছতা ও সাংবিধানিক জবাবদিহির স্বার্থে তাদের নাগরিকত্বের অবস্থান ও সংশ্লিষ্ট প্রামাণ্য তথ্যও জনসমক্ষে প্রকাশের আহ্বান জানিয়েছে টিআইবি।

 

ইত্তেফাক/এসএ