আজ ফুলবাডী দিবস, ফুলবাড়ী কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনের ২০ বছর

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১০:৪৬

আজ ২৬ আগস্ট, ফুলবাড়ী ট্রাজেডি দিবস। ২০০৬ সালের এই দিনে উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনির বিরুদ্ধে দিনাজপুরের ফুলবাড়ীতে বহুজাতিক কোম্পানি এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচি ঘিরে রক্তাক্ত হয় ফুলবাড়ীর এই জনপদ।

তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাকে দেশের সম্পদ রক্ষার এই আন্দোলনে সেদিন বিশাল সমাবেশে তৎকালীন বিডিআরের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন তিন তরুণ তরিকুল, আমিন ও সালেকিন। আহত হন দুই শতাধিক আন্দোলনকারী নারী-পুরুষ। এতে বেশ কয়েজন চিরতরে পঙ্গুত্ববরণ করেন। এদের মধ্যে বিরামপুরের সাহাজপুর গ্রামের প্রদীপ সরকার ইতোমধ্যেই পরলোকে চলে গেছেন। এখন দুর্বিসহ জীবন যাপন করছেন ফুলবাড়ী পৌরএলাকার সুজাপুর গ্রামের বাবলু রায় এবং খানপুর গ্রামের শ্রীমান বাস্কে। 

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত ৫টি কয়লাখনির সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো হলো দিনাজপুরের পার্বতীপুরের বড়পুকুরিয়া, ফুলবাড়ী কয়লাখনি, বিরাপুরের দীঘিপাড়া, জয়পুরহাটের জামালগঞ্জ ও রংপুরের পীরগঞ্জের খালাশপীর কয়লাখনি। খনিগুলোর মধ্যে জামালগঞ্জের খনিতে সবচেয়ে বেশি প্রায় ১ বিলিয়ন টন কয়লা রয়েছে। অন্যদিকে, ফুলবাড়ী কয়লা খনিতে রয়েছে প্রায় ৫৭০ মিলিয়ন টন কয়লা।

১৯৯৪ সালে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য অস্ট্রেলিয়ার সংস্থা বিএইচপি’র সঙ্গে চুক্তি হয় সরকারের। পরে এশিয়া এনার্জির সঙ্গে সরকার ৩০ বছর মেয়াদী একটি অসম চুক্তি করে। প্রস্তাবিত ওই চুক্তি অনুযায়ী, উত্তোলিত কয়লার মাত্র ৬ শতাংশ পাবে বাংলাদেশ, ৯৪ শতাংশ পাবে এশিয়া এনার্জি, যার ৮০ শতাংশ এশিয়া এনার্জি বিদেশে রপ্তানি করবে।

প্রস্তাবিত কয়লাখনি বাস্তবায়িত হলে পুরো ফুলবাড়ী শহর, পার্বতীপুর, বিরামপুর ও নবাবগঞ্জের বিশাল অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। পানির স্তর নিচে নেমে গেলে কৃষিতে এর বিরুপ প্রভাব পড়বে, হুমকির মুখে পড়বে গোটা পরিবেশ। ফলে বিশাল একটি জনবসতি স্থানান্তরিত হবে। উত্তরাঞ্চল মরুভ‚মিতে রূপ নেবে পরিবেশবাদীদের এমন হুঁশিয়ারিতে গঠিত হয় ‘ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটি’। শুরু হয় আন্দোলন।

দাবি ছিল, ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির সব কার্যক্রম বন্ধ করতে হবে এবং সরকারকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে যে ফুলবাড়ীতে কোনো উন্মুক্ত পদ্ধতির কয়লাখনি হবে না। এক সময় ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির আন্দোলন স্থিতিমিত হয়ে পড়লে তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি জোড়ালো আন্দোলন করে। এতে যোগ দেন বিভিন্ন পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার নারী-পুরুষ, ছাত্র-যুবক-যুবতি।

২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ডাকে এশিয়া এনার্জির স্থানীয় কার্যালয় ঘেরাও কর্মসূচিতে যোগ দেন সংগঠনের কেন্দ্রীয় আহবায়ক প্রকৌশলী মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ (বর্তমানে প্রয়াত) ও সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ সহ কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ। সেদিন লক্ষাধিক মানুষ লাঠিসোটা নিয়ে কর্মসূচিতে যোগ দেন। ঢাকা মোড় থেকে মিছিল নিয়ে এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ঘেরাও করতে যাওয়ার সময় ছোট যমুনা নদীর পূর্ব প্রান্তে পুলিশ ও বিডিআরের বাধার মুখে পড়েন আন্দোলনকারীরা। পরে সংগঠনের সদস্য সচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ নিমতলা মোড়ে আয়োজিত সমাবেশে বক্তব্য দিয়ে ঘেরাও কর্মসূচি সমাপ্তি ঘোষণা করেন।

এরই এক পর্যায়ে পুলিশ ও বিডিআর আন্দোলনকারীদের ওপর ব্যাপক লাঠিচার্জ এবং বিডিআর গুলি চালায়। এতে তরিকুল, আমিন ও সালেকিন নামের তিন তরুণ নিহত এবং দুই শতাধিক আন্দোলনকারী আহত হন। এরপর প্রতিবাদে উত্তাল হয়ে ওঠে ফুলবাড়ীসহ পুরো খনি এলাকা। ৩০ আগস্ট তৎকালীন বিএনপি-জামায়ত জোট সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসেন আন্দোলনের নেতারা। আলোচনায় আন্দোলনকারীদের ৬ দফা প্রস্তাব মেনে নেওয়া হয়। প্রস্তাবগুলোর মধ্যে অন্যতম ছিল এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার করতে হবে এবং দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লাখনি বাস্তবায়ন করা যাবে না।

ফুলবাড়ী কয়লাখনি বিরোধী আন্দোলনের অন্যতম নেতা সম্মিলিত পেশাজীবী সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক সাবেক পৌর মেয়র মুরতুজা সরকার মানিক বলেন, সরকারের সঙ্গে সম্পাদিত ছয় দফা চুক্তিতে ছিল আন্দোলকারীদের নামে কোনো মামলা করা যাবে না। কিন্তু এশিয়া এনার্জি একাধিক মামলা দিয়ে আন্দোলকারী নেতাকর্মীদের হয়রানী করছে। ফুলবাড়ী কয়লাখনি নিয়ে সরকার কোনো সিদ্ধান্ত নিলে পূর্বের চেয়েও আরো কঠোর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।

তেল গ্যাস খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহবায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল ও সদস্য সচিব জয় প্রকাশ গুপ্ত বলেন, ‘দাবি বাস্তবায়ন না হলে এশিয়া এনার্জিকে বিতাড়িত করতে ফুলবাড়ীবাসী আবার ঐক্যবদ্ধ হবে। তিন ফসলি জমি আমাদের স্থায়ী সম্পদ। অস্থায়ী সম্পদের জন্য এটি নষ্ট করা যাবে না।’

ইত্তেফাক/এএইচপি