রাফালকে ‘ভূপাতিত’ করা ২০টি জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কিনবে বাংলাদেশ

আপডেট : ২৬ আগস্ট ২০২৬, ১৬:৩৫

বিমানবাহিনীর আধুনিকায়ন ও আকাশ প্রতিরক্ষা সক্ষমতা জোরদারে চীন থেকে ২০টি সর্বাধুনিক ‘জে-১০সিই মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট’ সংগ্রহের চূড়ান্ত প্রক্রিয়ায় রয়েছে বাংলাদেশ। সম্পূরক নানা ব্যয়সহ এই যুদ্ধবিমান ক্রয়ে সরকারের মোট ব্যয় হবে প্রায় ২ দশমিক ৩০২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা দেশীয় মুদ্রায় আনুমানিক ২৮ হাজার ৩১৪ কোটি টাকা। এ লক্ষ্যে গঠিত আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি ইতিমধ্যে একটি খসড়া চুক্তিপত্র প্রস্তুত করেছে।

মঙ্গলবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের এ পদক্ষেপের কথা জানান প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২৩ টাকা ধরে ২০টি যুদ্ধবিমান ক্রয়ে এই সমন্বিত ব্যয় ধরা হয়েছে। প্রতিটি যুদ্ধবিমানের মূল দাম ৬২ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার হলেও প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, লজিস্টিকস, অবকাঠামো নির্মাণ, বিমা ও কর যুক্ত হওয়ায় প্রতিটি বিমানের পেছনে কার্যকর ব্যয় দাঁড়াবে প্রায় ১১৫ মিলিয়ন ডলার।

প্রস্তাবিত এই ক্রয়ের মধ্যে ১০টি যুদ্ধবিমান সরাসরি বিমানবাহিনীর ‘টেবিল অব অর্গানাইজেশন অ্যান্ড ইকুইপমেন্ট’ (টিওঅ্যান্ডই)-এ অন্তর্ভুক্ত হবে এবং বাকি ১০টি থাকবে এর বাইরে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকার-থেকে-সরকার (জিটুজি) পদ্ধতিতে চীনের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান চায়না ন্যাশনাল অ্যারো-টেকনোলজি ইমপোর্ট অ্যান্ড এক্সপোর্ট করপোরেশনের (সিএটিআইসি) সঙ্গে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে এই চুক্তি সইয়ের পরিকল্পনা রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আগামী ২০৩৫-৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরের বিশেষ থোক বরাদ্দের মাধ্যমে এই ব্যয় মেটানো হবে।

নথির তথ্যানুযায়ী, মূল বিমানের দামের বাইরে বৈমানিক ও প্রকৌশলীদের দেশি-বিদেশি প্রশিক্ষণ, অপারেশনাল সামগ্রী, কারিগরি ও লজিস্টিক সহায়তা এবং ফ্রেইট বাবদ ৮৮৮ মিলিয়ন ডলার ব্যয় ধরা হয়েছে। এ ছাড়া ভ্যাট, বিমা ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামোগত পূর্তকাজে ব্যয় হবে আরও ১৫৮ মিলিয়ন ডলার এবং অতিরিক্ত জ্বালানি ট্যাংকের জন্য প্রয়োজন হবে ২ দশমিক ২৮ মিলিয়ন ডলার।

সংবাদ সম্মেলনে তথ্য উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান জানান, যুদ্ধবিমান সংগ্রহের বিষয়ে দর-কষাকষি শেষে খসড়া চুক্তিপত্রটি প্রস্তুত করে অনুমোদনের জন্য সশস্ত্র বাহিনী বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। বিমানটি নির্বাচনের কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘রাফালকে ৪.৫ প্রজন্মের অত্যন্ত আধুনিক যুদ্ধবিমানগুলোর একটি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতিতে এই রাফালের বিরুদ্ধে চীনের জে-১০সি যুদ্ধবিমান অত্যন্ত সফল পারফরম্যান্স দেখিয়েছে। এ ছাড়া সমমানের ইউরোপীয় যুদ্ধবিমানগুলোর তুলনায় চাইনিজ ফাইটারের দামও অনেক কম। আশা করি, আমাদের সরকার জনগণের প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য সব ধরনের পদক্ষেপ নেবে।’ তিনি আরও জানান, যুদ্ধবিমান ছাড়াও বিমানবাহিনীর আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে অ্যাটাক হেলিকপ্টার, ভিআইপি হেলিকপ্টার এবং ইউএভি ড্রোন সিস্টেম সংগ্রহের কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।

এই ক্রয়প্রক্রিয়ার প্রেক্ষাপট পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২৫ সালের মার্চে অন্তর্বর্তী সরকারের তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের বেইজিং সফরকালে চীনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠকে বহুমাত্রিক যুদ্ধবিমান কেনার বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে। পরবর্তীতে বিমানবাহিনী প্রধানকে প্রধান করে ১১ সদস্যের আন্তমন্ত্রণালয় কমিটি গঠিত হলে কার্যক্রম গতি পায়। চলতি বছরের জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের প্রাক্কালে চীনা একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসে এ বিষয়ে চূড়ান্ত আলোচনা চালায়।

চীনের তৈরি একক ইঞ্জিন ও একক আসনের ‘জে-১০সি’ ফাইটার বিমানের রপ্তানি সংস্করণ হলো ‘জে-১০সিই’। সুপারসনিক গতির এই যুদ্ধবিমান আকাশযুদ্ধ, ভূমি ও সমুদ্রের লক্ষ্যবস্তুতে নিখুঁত হামলা, নজরদারি এবং শত্রুর রাডার ব্যবস্থায় আঘাত হানতে সক্ষম। প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতাসম্পন্ন এই যুদ্ধবিমান ড্রোনের সঙ্গে সমন্বিত হয়েও অভিযান চালাতে পারে।

প্রতিরক্ষা বিশ্লেষকদের মতে, এই সংযোজন বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে বহুগুণ শক্তিশালী করবে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব পিস অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (বিআইপিএসএস) সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) আ ন ম মুনীরুজ্জামান জানান, চীনের জে-১০সি প্রযুক্তিগত সক্ষমতার প্রমাণ দিয়েছে এবং দামেও সাশ্রয়ী। তবে এ ধরনের বড় সামরিক ক্রয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ভূরাজনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের পারস্পরিক বাণিজ্যচুক্তির মতো বিষয়গুলোর সঙ্গে কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি।

ইত্তেফাক/এনএন