এক হাতে স্বামীর ওষুধ, অন্য হাতে জনপ্রতিনিধির দায়িত্ব সামলাচ্ছেন। যে নারী একসময় নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন, আজ স্বামীকে বাঁচাতে তাকেই সাহায্য চাইতে হচ্ছে মানুষের দ্বারে দ্বারে।
স্বামীর চিকিৎসায় খরচ হয়ে গেছে প্রায় ৫০ লাখ টাকার বেশি, বিক্রি করেছেন নিজের থাকার বাড়ি, মাথায় উঠেছে ১৪ লাখ টাকার ঋণ। তবু থামেননি তিনি। খাটের এক কোণে অসুস্থ স্বামীকে রেখে কখনো ওষুধ খাওয়াচ্ছেন, কখনো খাবার তুলে দিচ্ছেন; আবার ছুটছেন ইউনিয়ন পরিষদে মানুষের সেবা করতে।
বলছি সিরাজগঞ্জের কামারখন্দ উপজেলার ঝাঐল ইউনিয়নের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত নারী ইউপি সদস্য নাসিমা পারভীনের (৩৮) কথা।
উপজেলার খামার বড়ধুল পূর্বপাড়া গ্রামের বাসিন্দা নাসিমার স্বামী আব্দুল মালেক(৫১) দীর্ঘদিন ধরে নানা জটিল রোগে ভুগছেন।
এই জনপ্রতিনিধির বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, ঘরের ভেতর একটি খাটের এক কোণে শুয়ে আছেন আব্দুল মালেক। পাশে বসে তার সেবা করছেন নাসিমা। কখনো খাবার তুলে দিচ্ছেন, কখনো ওষুধ খাওয়াচ্ছেন। স্বামীর যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি তাকেই আবার ছুটতে হয় ইউনিয়ন পরিষদে মানুষের নানা সমস্যা নিয়ে আসা আবেদনের কথা শুনতে।
নাসিমা পারভীন বলেন, বড়ধুল বাজারে তার স্বামীর একটি ছোট স্টুডিও ছিল। সেখানে ছবি তোলা ও প্রিন্ট করার পাশাপাশি লুঙ্গি ও জুতার ব্যবসাও করতেন। সেই আয়েই দুই সন্তান ও পরিবার নিয়ে তাদের সংসার ভালোই চলছিল।
তিনি বলেন, চার বছর আগে আস্তে আস্তে আমার স্বামীর নানা ধরনের রোগ শুরু হয়। আত্মীয়স্বজনের সহযোগিতা এবং আমাদের যা কিছু ছিল, সব দিয়ে চিকিৎসা করিয়েছি। এ পর্যন্ত ৫০ লাখ টাকার বেশি খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু এখনো স্বামীকে সুস্থ করতে পারিনি।
নাসিমার ভাষ্য, তার স্বামীর দুটি কিডনি ও দুটি চোখই নষ্ট হয়ে গেছে। প্রতি সপ্তাহে ওষুধ বাবদ ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা খরচ হয়। কিন্তু এখন সেই খরচ চালানোর সামর্থ্যও তার নেই।
কথা বলতে বলতে নাসিমা তুলে ধরেন তার অসহায়ত্বের কথা।
তিনি বলেন,স্বামীকে ভালো খাবার খাওয়াতে পারছি না। সন্তানদের নিয়ে তিন বেলা পেট ভরে খাব, সেই নিশ্চয়তাও নেই। অথচ একসময় আমিই কত মানুষকে সাহায্য করেছি। আজ নিজের স্বামীর চিকিৎসার জন্য আমাকে মানুষের কাছে হাত পাততে হচ্ছে।
স্বামীর চিকিৎসার জন্য নিজের একটি কিডনি দেওয়ার কথা জানিয়েছেন নাসিমা। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী, অস্ত্রোপচারসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে এতে প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা প্রয়োজন হতে পারে বলে জানান তিনি।
স্বামীর চিকিৎসার পাশাপাশি দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়েও দুশ্চিন্তায় নাসিমা। তার বড় ছেলে সিরাজগঞ্জ সরকারি কলেজ থেকে দর্শন বিভাগ থেকে অনার্স চতুর্থ বর্ষের পরীক্ষা শেষ করেছেন। ছোট মেয়ে পড়ছেন সিরাজগঞ্জ মহিলা কলেজের দর্শন বিভাগের তৃতীয় বর্ষে।
নাসিমা বলেন,আমি আর পারছি না। আমার স্বামীকে বাঁচাতে চাই। দেশের ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান, বিত্তবান মানুষ এবং সরকারের কাছে সহযোগিতা চাই। কেউ যদি পাশে দাঁড়ান, তাহলে হয়তো আমার স্বামীকে চিকিৎসা করাতে পারব। আমার বড় ছেলের জন্য একটি চাকরিরও ব্যবস্থা হলে সংসারটা অন্তত চালাতে পারতাম।
নাসিমার এই দুর্দিনের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত তার স্বজন ও প্রতিবেশীরাও।
নাসিমার দেবর শহিদুল ইসলাম বলেন, যে মানুষটা একসময় অন্যদের সাহায্য করত, আজ সেই মানুষটাকেই অন্যের সাহায্যের জন্য হাত বাড়াতে হচ্ছে। স্বামীর চিকিৎসা করাতে গিয়ে তাদের সব শেষ হয়ে গেছে। সরকার ও বিত্তবানরা এগিয়ে এলে পরিবারটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারবে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, নাসিমারা নিজেরাই মানুষের পাশে দাঁড়াত। এখন স্বামীর চিকিৎসার জন্য তাকেই মানুষের কাছে সাহায্য চাইতে হচ্ছে। এটা খুবই নির্মম বাস্তবতা। আমরা চাই সরকার ও দেশের বিত্তবানরা তার পাশে দাঁড়ান।
ঝাঐল ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল জলিল সরকার উজ্জ্বল বলেন, আমরা জনপ্রতিনিধি হিসেবে মানুষের সেবা করি। নাসিমাও মানুষের সেবা করে। অথচ স্বামীর অসুস্থতার কারণে তার সবকিছু শেষ হয়ে গেছে। আমরা আমাদের জায়গা থেকে সহযোগিতা করেছি। দেশের অন্য ইউপি সদস্য, চেয়ারম্যান ও বিত্তবানরা এগিয়ে এলে তার স্বামীর চিকিৎসা এবং সংসারটা চালানো সম্ভব হবে।
একই ইউনিয়নের প্রশাসনিক কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম বলেন, নাসিমা স্বামীর চিকিৎসার জন্য অনেক আর্থিক সংকটে আছেন। ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে যতটা সম্ভব সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হয়েছে এবং আমরা তার পাশে আছি। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় হলো, যিনি নিজেই মানুষের সেবা করেন, তাকেই আজ অন্যের সহযোগিতার জন্য ঘুরতে হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, নাসিমা তার দায়িত্ব যথেষ্ট আন্তরিকতার সঙ্গে পালন করেন। তার স্বামীর চিকিৎসার জন্য সিরাজগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধি ও বিত্তবানদের এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।

