নগরজীবনের ব্যস্ততা আর যান্ত্রিকতা থেকে একটু স্বস্তি পেতে চাইলে দূরে কোথাও যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ছুটির দিনে রাজধানীর বুকেই লুকিয়ে থাকা মুঘল, নবাবি ও ব্রিটিশ আমলের ঐতিহাসিক নিদর্শনগুলো থেকে ঘুরে আসতে পারেন। পুরান ঢাকা ও এর আশপাশের অলিগলিতে ছড়িয়ে থাকা এসব দর্শনীয় স্থান আপনার এক দিনের ছুটিকে করে তুলতে পারে দারুণ উপভোগ্য।
এক দিনে ঢাকার সমস্ত ঐতিহাসিক স্থান ঘোরা কঠিন হলেও কাছাকাছি কয়েকটি স্থান মিলিয়ে চমৎকার একটি ভ্রমণ পরিকল্পনা করতে পারেন। নিচে ঢাকার সেরা ২০টি ঐতিহাসিক স্থাপনার সংক্ষিপ্ত বিবরণ, প্রবেশমূল্য এবং সময়সূচি দেওয়া হলো।
লালবাগ কেল্লা
মুঘল আমলের অন্যতম বিখ্যাত অসংপূর্ণ দুর্গ এটি। ১৭ শতকে নির্মিত এই কেল্লায় রয়েছে পরীবিবির মাজার, মসজিদ ও চমৎকার সব ইমারত।
প্রবেশমূল্য: বাংলাদেশি দর্শনার্থী ২০ টাকা (৫ বছরের কম শিশুরা বিনামূল্যে)। সময়সূচি: মঙ্গলবার থেকে শনিবার সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৫টা (সোমবার দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা এবং শুক্রবার দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত জুমার বিরতি)।
আহসান মঞ্জিল
বুড়িগঙ্গার তীরে কুমারটুলিতে অবস্থিত গোলাপি রঙের এই প্রাসাদটি একসময়ে ঢাকার নবাব পরিবারের বাসস্থান ও রাজনৈতিক কেন্দ্র ছিল। বর্তমানে এটি একটি জনপ্রিয় জাদুঘর।
প্রবেশমূল্য: প্রাপ্তবয়স্ক ৪০ টাকা, শিশু ২০ টাকা। সময়সূচি: সকাল সাড়ে ১০টা থেকে বিকেল সাড়ে ৫টা (শুক্রবার বিকেল ৩টা থেকে রাত ৮টা)। সাপ্তাহিক বন্ধ: বৃহস্পতিবার।
বড় কাটরা ও ছোট কাটরা
চকবাজারের কাছে অবস্থিত এই দুটি মুঘল আমলের স্থাপত্য মূলত সরাইখানা ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পুরান ঢাকার বাণিজ্য ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করছে এই ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো।
প্রবেশমূল্য ও সময়সূচি: নির্দিষ্ট কোনো টিকিট বা নির্দিষ্ট দর্শনার্থী সময়সূচি নেই।
খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ ও তারা মসজিদ
লালবাগ এলাকায় অবস্থিত খান মোহাম্মদ মৃধা মসজিদ এবং আরমানিটোলার নীল-সাদা নকশা ও তারার অলংকরণে ঘেরা তারা মসজিদ পুরান ঢাকার মুঘল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন।
প্রবেশমূল্য ও সময়সূচি: নির্দিষ্ট টিকিট নেই; নামাজ ও ধর্মীয় কার্যক্রমের সময় অনুযায়ী খোলা থাকে।
নর্থব্রুক হল (লালকুঠি) ও রূপলাল হাউস
ফরাশগঞ্জে বুড়িগঙ্গার তীরে অবস্থিত নর্থব্রুক হল (লালকুঠি) এবং ঐতিহাসিক রূপলাল হাউস ব্রিটিশ ও ঊনবিংশ শতকের ইউরোপীয় ও দেশীয় স্থাপত্যের চমৎকার মিশ্রণের সাক্ষী।
প্রবেশমূল্য ও সময়সূচি: নির্ধারিত কোনো পর্যটন টিকিট বা নিয়মিত সময়সূচি নেই।
বিউটি বোর্ডিং ও আর্মেনিয়ান চার্চ
বাংলাবাজারের ঐতিহাসিক বিউটি বোর্ডিং এককালে সাহিত্যিক ও শিল্পীদের আড্ডার প্রাণকেন্দ্র ছিল। অন্যদিকে আরমানিটোলার আর্মেনিয়ান চার্চ আঠারো শতকের আর্মেনীয় সম্প্রদায়ের দীর্ঘ ইতিহাসের নীরব সাক্ষী।
প্রবেশমূল্য ও সময়সূচি: বিউটি বোর্ডিংয়ে খাবার বা থাকার জন্য মূল্য প্রযোজ্য (সকাল ৭টা–রাত ১১টা)। আর্মেনিয়ান চার্চ কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে উন্মুক্ত থাকে।
হোসেনি দালান ও ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির
পুরান ঢাকার মুঘল আমলের হোসেনি দালান শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের প্রতীক। আর ঢাকেশ্বরী মন্দির ঢাকার অন্যতম প্রাচীন ও প্রধান হিন্দু ধর্মীয় তীর্থকেন্দ্র।
প্রবেশমূল্য ও সময়সূচি: নির্দিষ্ট টিকিট নেই; ধর্মীয় নিয়ম অনুযায়ী খোলা থাকে।
কার্জন হল, জগন্নাথ হল ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও এর আশপাশের কার্জন হল এবং জগন্নাথ হলের ভবনগুলো ব্রিটিশ আমলের ঔপনিবেশিক স্থাপত্য, ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মারক বহন করে।
প্রবেশমূল্য ও সময়সূচি: কোনো টিকিট নেই; প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম ও নিরাপত্তা নীতির ওপর এর প্রবেশাধিকার নির্ভরশীল।
বাহাদুর শাহ পার্ক ও সদরঘাট
সিপাহী বিদ্রোহের স্মৃতিবিজড়িত বাহাদুর শাহ পার্ক পুরান ঢাকার একটি ঐতিহাসিক উন্মুক্ত স্থান। অন্যদিকে, বুড়িগঙ্গার তীরবর্তী সদরঘাট হলো ঢাকার শতবর্ষী পুরোনো নদীবন্দর ও বাণিজ্যকেন্দ্র।
প্রবেশমূল্য ও সময়সূচি: বাহাদুর শাহ পার্ক ও সদরঘাট সবার জন্য উন্মুক্ত।
রোজ গার্ডেন প্যালেস ও বলধা গার্ডেন
টিকাটুলির ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন প্যালেস (যেখানে আওয়ামী লীগের জন্ম হয়েছিল) এবং ওয়ারীর বলধা গার্ডেন উদ্ভিদ উদ্যান ইতিহাস ও প্রকৃতিপ্রেমীদের জন্য এক আদর্শ গন্তব্য।
রোজ গার্ডেনের প্রবেশমূল্য: সাধারণ ৩০ টাকা, শিক্ষার্থী ১০ টাকা (রবিবার বন্ধ)। বলধা গার্ডেনের সময়: সকাল ৯টা থেকে বিকেল সাড়ে ৪টা (রবিবার ও সরকারি ছুটির দিন বন্ধ)।
গ্রিক স্মৃতিস্তম্ভ
পুরান ঢাকায় একসময়ে বসবাসকারী গ্রিক সম্প্রদায়ের স্মৃতি ও সমাধিফলক নিয়ে এই ঐতিহাসিক সমাধিক্ষেত্রটি গড়ে উঠেছে।
প্রবেশমূল্য ও সময়সূচি: নির্দিষ্ট কোনো টিকিট বা নিয়মিত সময়সূচি নেই।
- সরকারি ছুটিতে স্থাপনার সময়সূচি পরিবর্তিত হতে পারে।
- টিকিটযুক্ত স্থানে যাওয়ার আগে সর্বশেষ প্রবেশমূল্য জেনে নিন।
- মসজিদ, মন্দির ও গির্জায় ধর্মীয় পরিবেশ ও পোশাকের নিয়ম মেনে চলুন।
- সংরক্ষিত স্থাপনার দেয়াল বা কোনো অংশে হাত দিয়ে ক্ষতি করবেন না।
- পুরান ঢাকার সরু রাস্তা ও যানজটের কথা মাথায় রেখে হাতে অতিরিক্ত সময় রাখুন।
- যেসব স্থাপনায় সাধারণ পর্যটকের প্রবেশ সীমিত, সেখানে অনুমতি ছাড়া ঢোকার চেষ্টা করবেন না।
- সকাল সকাল বের হলে এক দিনে বেশি জায়গা ঘুরে দেখা সম্ভব।

