পরিবারে সুদিন ফেরাতে এবং ঋণ শোধ করতে দেড় বছর আগে অনেক বড় আশা নিয়ে রাশিয়া পাড়ি জমিয়েছিলেন কিশোরগঞ্জের ভৈরব উপজেলার জাকির হোসেন। সম্প্রতি কোম্পানিতে সুপারভাইজার হিসেবে পদোন্নতিও পেয়েছেন তিনি। কিন্তু সুদিন ফিরতেই এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় নিভে গেল তার জীবন প্রদীপ।
জাকির হোসেন ভৈরবের কালিকাপ্রসাদ ইউনিয়নের আতকাপাড়া গ্রামের বড় বাড়ির প্রয়াত রতন মিয়ার বড় ছেলে।
তার বাড়িতে এখন চলছে মা ও স্ত্রীর বুকফাটা আর্তনাদ আর স্বজনদের আহাজারি।
শুক্রবার (২৮ আগস্ট) কান্নাজড়িত কণ্ঠে দ্রুত লাশ ফিরে পেতে আকুতি জানিয়ে আহাজারি করেন রাশিয়ায় নিহত জাকির হোসেনের মা রোকেয়া বেগম।
তিনি আহাজারি করে বলেন, ‘ছেলেকে পাঠিয়েছিলাম অভাব দূর করতে। ঋণের টাকা পরিশোধ করা তো দূরের কথা, এখন চার বছরের নাতনিকে কী বলে সান্ত্বনা দেব? আমি শুধু আমার ছেলের লাশটা দ্রুত বুকে জড়িয়ে ধরতে চাই।’
শুক্রবার দুপুরে তার বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, চার বছরের কন্যাসন্তান তায়েবাকে কোলে নিয়ে বাকরুদ্ধ স্ত্রী রিপা বেগম আর সন্তানহারা মা রোকেয়া বেগমের আহাজারি থামছেই না।
ছোট ভাই শরীফ মিয়া জানান, পরিবারে সচ্ছলতা ফেরাতে দেড় বছর আগে তার বাবা ধারদেনা ও ঋণ করে জাকিরকে রাশিয়ায় পাঠান। গত ৯ মাস আগে বাবা অসুস্থ হয়ে মারা গেলে পরিবারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়ে জাকিরের কাঁধে। চার ভাইয়ের মধ্যে এক ভাই কিছুদিন আগে গ্রিসে গেলেও পরিবারের ওপর এখনও ঋণের বড় চাপ রয়ে গেছে।
শরীফ আরও জানান, গত ২৫ আগস্ট তারা জানতে পারেন জাকির হাসপাতালে ভর্তি। রাশিয়ায় অবস্থানরত তার চাচাতো ভাইও শুরুতে সেটাই জানতেন। ২৭ আগস্ট তারা নিশ্চিত হন, দুর্ঘটনার দিনই কোম্পানির একটি কক্ষে জাকিরের মৃত্যু হয় এবং লাশ সেখানেই পড়ে ছিল।
ঘটনার দিনের স্মৃতি মনে করে জাকিরের স্ত্রী রিপা বেগম অঝোরে কেঁদে বলেন, ‘সকাল ৭টায় তার সঙ্গে ফোনে কথা হয়। সে বলেছিল–আমাদের সুদিন ফিরবে, সবাই যেন দোয়া করে। আমি কল্পনাও করতে পারিনি সে এভাবে চলে যাবে। চার বছরের মেয়েকে নিয়ে এখন কোথায় যাব? কীভাবে তাকে মানুষ করব?’
গত ২৫ আগস্ট রাশিয়ার আমুর অঞ্চলের ‘গ্যাস কেমিক্যাল কমপ্লেক্সে’ ভয়াবহ বিস্ফোরণের ঘটনায় ১৫ জন নিহত হন। মস্কোতে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সেই দুর্ঘটনায় একজন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করে, যিনি ভৈরবের এই জাকির হোসেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কে এম মামুনুর রশীদ বলেন, ‘প্রশাসনিকভাবে বিষয়টি খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। নিহতের পরিবার যেন অতি দ্রুত জাকিরের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে পারে, সে বিষয়ে প্রশাসনিক সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রবাসীদের জন্য বরাদ্দকৃত আর্থিক সহযোগিতার সুযোগও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’

