৪৯ বছরে পা রাখল বিএনপি

জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চায় বিএনপি: প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৯

বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আপন পরিচয়ের গরিমায় নয়া মাইলফলক উদ্ভাসের দিন আজ। ১৯৭৮ সালের পয়লা সেপ্টেম্বরের এই দিনে ঘটনা পরম্পরার এক ঐতিহাসিক যুগ সন্ধিক্ষণে শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ আত্মপরিচয়ের ‘যূথবদ্ধ শক্তিমঞ্চ’ হিসেবে জনমানসের সম্মুখে স্থাপন করেছিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি। সেদিন পড়ন্ত বিকালে রাজধানীর রমনা বটমূলে একটি ছোট টেবিল, গোটা সাতেক চেয়ার আর কিছু সাংবাদিক নিয়ে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল-বিএনপি প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। ফেলে আসা ৪৮ বছরে সংঘাত-বিক্ষোভ, জনপ্রিয়তা আর চড়াই-উতরাইয়ের পথপরিক্রমায় বিএনপি আজ দেশের শীর্ষ রাজনৈতিক দল। প্রতিষ্ঠার পর সাড়ে চার দশকের মধ্যে গত দেড় যুগ সবচেয়ে কঠিন ভয়াবহ ক্রান্তিকাল পেরিয়ে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিজমের বরকন্যা শেখ হাসিনার পতনের পর এক অভাবনীয়-অসামান্য সুবর্ণ সময়ের পটভূমিতে তারেক রহমানের দৃঢ়-দীপ্র হাত ধরে নবজীবন নিয়ে ফিরে এসেছে গণমানুষের প্রিয় দলটি। এ বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি একটি উত্সবমুখর ভোট বিপ্লবে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠান ঘটেছে অসামান্য জনপ্রিয় নেতা গণমানুষের প্রাণভোমরা তারেক রহমানের। সুদূর লন্ডনে নির্বাসিত জীবনে দীর্ঘ সময় চরম প্রতিকূলতার পাটাতনে বসে দলের কান্ডারি তারেক রহমান তার বিচক্ষণতা, দূরদৃষ্টি, অসম সাংগঠনিক দক্ষতায় বিএনপিকে তৃণমূল শক্তিতে রূপান্তরিত করেছেন। নিজেকে সততা-দক্ষতা-জনপ্রিয়তার সর্ব শিখরে স্থাপন করেছেন। যার ফল এসেছে জাতীয় নির্বাচনে ভূমিধস বিজয়। মিথ্যা মামলায় ফরমায়েশি রায়ে সাড়ে ৬ বছর কারারুদ্ধ থাকার পর দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া ৫ আগস্টের পর  মুক্তি পান। আধো আলোর স্যাঁতসেঁতে কারা প্রকোষ্টে থেকে পর্যাপ্ত চিকিত্সাহীনতায় গুরুতর অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়া কিছুদিন দেশ-বিদেশে উন্নত চিকিত্সা পেলেও গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর ভোরে ইন্তেকাল করেন। তার জানাজায় সর্বকালের সবচেয়ে বেশি মানুষের উপস্থিতি অনন্তকাল ইতিহাসে স্মরণীয় হয়ে উত্কীর্ণ থাকবে। বেগম খালেদা জিয়া তার সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব ও নেতৃত্ব দিয়ে বিএনপিকে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে পৌঁছে দিয়েছিলেন। চার বার রাষ্ট্র পরিচালনায় দেশকে দিয়ে গেছেন শান্তি-সমৃদ্ধি আর উন্নয়নের অভূতপূর্ব ম্যাজিক। সেই ম্যাজিক এখন তার সুযোগ্য আত্মজ তারেক রহমানের হাতে।

হাসিনার ফাসিবাদ মুক্ত পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে তারেক রহমানের রাজসিক প্রত্যাবর্তনের পর বিএনপি এবং রাষ্ট্রে ঘটেছে নতুন সূর্যোদয়। আওয়ামী লীগ ১৭ বছরের দুঃশাসনকালে বিএনপির কোটি নেতাকর্মীর ফেরার জীবনের অবসান ঘটেছে। ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মিথ্যা মামলায় বেগম জিয়াকে কারাগারে নিক্ষেপের পর দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের দায়িত্ব দেওয়া হয় তারেক রহমানকে। তিনি দলকে গণতান্ত্রিক পন্থায় পুনর্গঠিত করে সর্বস্তরে শক্তিশালী ও আন্দোলনমুখী করার উদ্যোগ নেন। রাজপথে অব্যাহত আন্দোলন জুলাই বিপ্লবের পথ রচনা করে দেয়। তারেক রহমান বিরামহীনভাবে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোর নেতাদের সঙ্গে স্কাইপেসহ ভার্চুয়াল মাধ্যমে বৈঠক-সভাসমাবেশ করে এসেছেন। দিকনির্দেশনা-আদেশ-নির্দেশ দিয়েছেন। গত সাড়ে ৬ বছরে তারেক রহমানের হিরন্ময় নেতৃত্বে গনতন্ত্র, ভোটাধিকার, মানবাধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠাসহ শেখ হাসিনার পতনের লক্ষ্যে দুর্বার আন্দোলন হয়েছে। তারেক রহমানের আহ্বানে ২০২৪ সালের ৭ জানুয়ারির ডামি নির্বাচন বর্জন করেন সারা দেশের সর্বস্তরের মানুষ। সর্বশেষ ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনার পালিয়ে যাওয়ার আন্দোলনের চেতনা, পটভূমি, জনমত, নেতৃত্ব তৈরিতে সিপাহসালার তারেক রহমান। বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলোর বহু নেতাকর্মী প্রাণ দিয়েছে ছাত্র-জনতার এই অভূতপূর্ব গণআন্দোলনে। এক্ষণে তারেক রহমানের হিরন্ময় নেতৃত্বে প্রতিনিয়ত বিএনপির সর্বস্তরে আমূল বির্বতন ঘটছে। দেশের সর্বস্তরের মানুষের নজর এই দলটির প্রতি। রাষ্ট্রক্ষমতা তার স্কন্ধে অর্পিত হওয়ার পর তারেক রহমান তার নির্বাচনি অঙ্গীকারসমূহ বাস্তবায়নে অস্টপ্রহর কাজ করছেন। স্বৈরাচার-ফ্যাসিবাদমুক্ত দেশে রাষ্ট্র ও সমাজে গণতন্ত্রের বিকাশের পথ উন্মোচন করেছেন। স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বের সুরক্ষা, গণতন্ত্র এবং মানুষের অধিকার রক্ষার প্রত্যয় সামনে রেখে একটি জনকল্যাণমূলক, গণতান্ত্রিক ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়ার সংগ্রামের নেতৃত্ব দিচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। প্রতিষ্ঠার পর যে কোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে তারেক রহমানের হিরন্ময় নেতৃত্বে সর্বব্যাপী জনপ্রিয়তম রাজনৈতিক দল এখন বিএনপি। জনপ্রত্যশায় বড় দায়ভার কাঁধে নিয়ে আজ বিএনপি পা রাখল ৪৯ বছরে।

বিএনপি জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চায় :প্রধানমন্ত্রী

জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বিএনপি জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চায় বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। দলের ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে গতকাল এক বাণীতে জনগণের প্রতি সরকারের অবস্থান তুলে ধরতে গিয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন-শোষণের অবসানের পর একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের জনগণ আবারও বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। দেশের জনগণের কাছে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই বিএনপি জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে চায়। সেই লক্ষ্যেই বাংলাদেশকে একটি জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য বিএনপি সরকার নিরলসভাবে কাজ করে চলছে। জনগণের আস্থা ও বিশ্বাস অক্ষুণ্ন্ন রেখে বিএনপির প্রতিটি নেতাকর্মী, সমর্থক ও শুভার্থী দেশমাতৃকার সেবায় নিজেদের নিবেদন করে আগামী দিনগুলোতেও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখবে, ইনশাআল্লাহ।

প্রসঙ্গত, বিএনপি গঠন করার আগে জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক দল (জাগদল) নামে আরেকটি দল গঠন করা হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে বিএনপি প্রতিষ্ঠার পর উন্নয়ন-উত্পাদনের আধুনিক রাজনীতিকে মূল প্রতিপাদ্য করে ১৯ দফা কর্মসূচির আলোকে মোটে পাঁচ মাসের মাথায় ১৯৭৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ২০০টি আসন লাভ করে। বিএনপি অচিরে এ দেশের মানুষের ‘বাংলাদেশি’ রাজনৈতিক দর্শনের নিয়ামক শক্তিতে রূপান্তরিত হয়। এ দলের সমর্থকরা বিশ্বাস করেন, তার আত্মপরিচয় সে কেবল ‘বাঙালি নয়—বাংলাদেশি’। এ দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ১৯৮১ সালের ৩০ মে শহিদ হন। কালযাত্রায় বিএনপি দেশশাসন করেছে ১৮ বছর। তিন বার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার গৌরব অর্জন করেন দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। সর্বশেষ ২০০১ সালের ১ অক্টোবর জাতীয় নির্বাচনে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিজয়ী হয়ে ক্ষমতায় আসে। পাঁচ বছরের দায়িত্ব পালন শেষে ২০০৬ সালের অক্টোবরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা ছেড়ে দেন। ১/১১-এর পটবদলের পর বিএনপিকে  প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যে ফেলা হয়। কারাগারে নিক্ষিপ্ত করা হয় দলের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানকে। নৃশংসতম নির্যাতনের মাধ্যমে প্রায় পঙ্গু করে দেওয়া হয় তারেক রহমানকে। দীর্ঘ চিকিত্সার পর তিনি সুস্থ হন।

কর্মসূচি

বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে পাঁচ দিনব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে দলটি। গত বুধবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এ কর্মসূচি ঘোষণা করেন দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী। কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ ১ সেপ্টেম্বর সকাল ৬টায় বিএনপির নয়াপল্টনস্থ কেন্দ্রীয় কার্যালয়সহ দেশব্যাপী দলীয় কার্যালয়ে দলীয় পতাকা উত্তোলন করা হবে। সকাল ৯টায় বিএনপি চেয়ারম্যান ও  প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ ও সর্বস্তরের নেতাকর্মীরা মহান স্বাধীনতার ঘোষক, বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবক্তা ও আধুনিক বাংলাদেশের রূপকার, বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শহিদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী ‘গণতন্ত্রের মা’ মরহুমা বেগম খালেদা জিয়ার সমাধিস্থলে ফাতেহা পাঠ ও পুষ্পস্তবক অর্পণ করবেন। আগামী ৫ সেপ্টেম্বর বেলা ৩টায় কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন-বাংলাদেশ মিলনায়তনে বিএনপি প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ও তাত্পর্য শীর্ষক আলোচনাসভা হবে। এতে প্রধান অতিথি থাকবেন বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এছাড়া, বৃক্ষরোপণ ও মত্স্য অবমুক্তকরণ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

ইত্তেফাক/এনএন