আঞ্চলিক শান্তি প্রতিষ্ঠায় ভারতের সাহায্য চাইলেন ইরানের প্রেসিডেন্ট

আপডেট : ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৫২

শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় ভারতের আরও জোরালো কূটনৈতিক প্রচেষ্টার আহ্বান জানিয়েছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরান কখনও যুদ্ধকে স্বাগত জানায়নি এবং চলমান সংঘাত ইরান, এই অঞ্চল কিংবা মানবতার কারও স্বার্থেই কাজ করছে না।

কিরগিজস্তানে সাংহাই সহযোগিতা সংস্থা (এসসিও) এবং ‘সাংহাই প্লাস’ সম্মেলনের মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে বৈঠকে পেজেশকিয়ান এসব কথা বলেন।

সাম্প্রতিক মার্কিন-ইসরায়েলি আগ্রাসনের যুদ্ধে ইরানের প্রতি সমর্থন ও সহযোগিতার জন্য তিনি নয়াদিল্লিকে ধন্যবাদ জানান এবং শান্তি ও স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠায় কূটনৈতিক প্রচেষ্টা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

ইরানের প্রেসিডেন্ট জানান, তার প্রশাসনের শুরু থেকেই ইরানের নীতি ছিল শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এবং সংলাপ ও আলোচনার মাধ্যমে বিরোধের সমাধান করা। তবে তিনি বলেন, ‘কূটনৈতিক পদ্ধতির পরিবর্তে যুক্তরাষ্ট্র ‘যুদ্ধ, নিরাপত্তাহীনতা এবং শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দেয়ার পথ’ বেছে নিয়েছে।

পেজেশকিয়ান জোর দিয়ে বলেন, ‘ইরান ‘কখনও যুদ্ধকে স্বাগত জানায় না। ইরানি জনগণকে বিপদ ও নিরাপত্তাহীনতা থেকে রক্ষা করা এবং শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার পরিবেশ সৃষ্টি করা সরকারের দায়িত্ব।’

তিনি আরও বলেন, ‘অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সমাধানের জন্য সম্পাদিত চুক্তিগুলোর আওতায় ইরান তার প্রতিশ্রুতি পূরণ করেছে, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তার দায়বদ্ধতা পূরণ করতে ব্যর্থ হয়েছে। তা সত্ত্বেও তেহরান এখনো একটি চুক্তি ও পারস্পরিক সমঝোতায় পৌঁছানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।’

পেজেশকিয়ান বলেন, ‘আমরা বিশ্বাস করি, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া আমাদের স্বার্থে নয়, এই অঞ্চলের স্বার্থেও নয় এবং মানবতার স্বার্থের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।’

ইরানের প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘যুক্তি ও বাস্তববোধ নির্দেশ করে যে আমাদের যুদ্ধ ও যুদ্ধংদেহী মনোভাব এড়িয়ে চলা উচিত।’ তবে তিনি উল্লেখ করেন, যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে কিছু গোষ্ঠী সংঘাত অব্যাহত রাখার মধ্যেই নিজেদের স্বার্থ দেখতে পায়। তিনি শান্তির পক্ষে প্রচেষ্টা জোরদার এবং শান্তি, স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।

পেজেশকিয়ান ভারতের গুরুত্বপূর্ণ আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অবস্থান এবং ইরানের সঙ্গে দেশটির গভীর ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি মোদিকে বিভিন্ন পক্ষের সঙ্গে ভারতের যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তাদের ‘যুদ্ধ ও রক্তপাত’ থেকে সরে এসে সংলাপ ও সমঝোতার দিকে এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করার আহ্বান জানান।

তিনি বলেন, ‘অঞ্চল ও বিশ্বের বিভিন্ন দেশের যুক্তিবাদী শক্তিগুলোর আকাঙ্ক্ষা হলো শান্তি, নিরাপত্তা ও স্বস্তি এবং যুদ্ধ এড়িয়ে চলা। আমরা বিশ্বাস করি, বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধান হলো সংলাপ ও সহযোগিতা।’

পেজেশকিয়ান সব ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণে ইরানের প্রস্তুতির কথাও জানান। তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক, সাংস্কৃতিকসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দুই দেশের ব্যাপক সহযোগিতার সম্ভাবনা রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা আরও জোরদার করা এবং নিষেধাজ্ঞার প্রভাব মোকাবিলায় যৌথ প্রচেষ্টা তেহরান ও নয়াদিল্লির সম্পর্ককে আরও উচ্চ পর্যায়ে নিয়ে যেতে পারে।’ যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি শাসকগোষ্ঠী ইরানের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সহযোগিতা সীমিত করার চেষ্টা করলেও তেহরান বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক আরও সম্প্রসারণে প্রস্তুত রয়েছে বলে তিনি জোর দিয়ে জানান।

অন্যদিকে, মোদি পেজেশকিয়ানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে সন্তোষ প্রকাশ করেন এবং বলেন, ‘সাম্প্রতিক কঠিন সময়ে ভারত ইরানের সঙ্গে তার সহযোগিতা ও যোগাযোগ বজায় রাখার চেষ্টা করেছে।’

শান্তি ও নিরাপত্তার বিষয়ে পেজেশকিয়ানের দৃষ্টিভঙ্গি ও অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে মোদি তাকে একজন শান্তিপ্রিয় নেতা হিসেবে বর্ণনা করেন, যিনি শান্তি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন। তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, পেজেশকিয়ানের প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত ইতিবাচক ফল বয়ে আনবে।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী পেজেশকিয়ানের সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেন, ‘কিছু গোষ্ঠী যুদ্ধ অব্যাহত রাখার মধ্যেই নিজেদের স্বার্থ দেখতে পায়। তিনি শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা আরও জোরদার করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন এবং আশা প্রকাশ করেন যে, শেষ পর্যন্ত শান্তি ও নিরাপত্তাই প্রতিষ্ঠিত হবে।’

দুই নেতা পরিবহন ও সামুদ্রিক সহযোগিতা, হরমুজ প্রণালী-সংক্রান্ত সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং চাবাহার বন্দরে সহযোগিতাসহ দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার সর্বশেষ পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন।

তারা অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক সম্প্রসারণ এবং ইরান ও ভারতের মধ্যে কৌশলগত সহযোগিতা জোরদার করতে বিদ্যমান সক্ষমতাগুলো কাজে লাগানোর গুরুত্বের ওপর জোর দেন।

সূত্র: তাসনিম নিউজ এজেন্সি

 
ইত্তেফাক/এসএইচ