দেশের চলমান হামের সংক্রমণ এবং এডিস মশার সংক্রমণে সৃষ্টি ডেঙ্গু জ্বর নিয়ে ছোট্ট শিশুর অভিভাবকরা দিন কাটাচ্ছেন উত্কণ্ঠা আর আতঙ্কে। চলতি বছর ফেব্রুয়ারি-মার্চ থেকে শুরু হওয়া অতি সংক্রমণ রোগ হাম ছড়িয়ে পড়ে দেশের প্রতিটি জেলা-উপজেলায়। এতে আক্রান্ত ও মৃত্যু যেন পাল্লা দিয়ে বাড়তে থাকে। হামের রোগীর ঠাঁই দিতে রীতিমত হিমশিম খেতে হয় হাসপাতালের চিকিত্সকদের। অভিভাবকদের প্রত্যাশা ছিল, হামের টিকা পেলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেবেন তারা। কিন্তু সে আশা একরকম গুড়েবালিতে পরিণত হয়। হাম ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণের সময় ছয় মাস অতিবাহিত হলেও এখনো হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্তের সংখ্যা হাজারের ওপরে এবং মৃত্যু হচ্ছে প্রতিদিন একাধিক।
দীর্ঘ ছয় মাস ধরে চলতে থাকা হামের সংক্রমণের মধ্যেই শুরু হয়েছে এডিস মশার সংক্রমণে সৃষ্টি ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত ও মৃত্যু। শিশুরা সব সময় নাজুক অবস্থানে থাকে, ফলে শিশু থাকা পরিবারগুলোতে আতঙ্ক যেন পিছু ছাড়ছে না। সে নিম্নবিত্ত পরিবারেই হোক বা উচ্চবিত্তের হোক। কখন পরিবারের ছোট্ট আদরের শিশুটি আক্রান্ত হবে হাম-ডেঙ্গুর মতো ভয়ংকর ব্যাধিতে।
কথা হয় সুরাইয়া ইসলামের সঙ্গে। তিনি একজন চাকরিজীবী মা। বলেন, ঘরে আমার ছোট্ট দুই বাচ্চা, এক জনার বয়স চার বছর দুই মাস, অন্যজনের ১৯ মাস। দুই বাচ্চাকে কতদিন যে বাইরের বাচ্চাদের সঙ্গে মিশতে দেই না, খেলতে দেই না। আমার আত্মীয়ের বাচ্চারা বাসায় এলেও আমার ভয় লাগে। কারণ কোথায় থেকে হামের ভাইরাস আসবে, আর কখন এডিস মশা কামড়াবে, তা কে জানে! এই মা আরো জানান, যদি শুনি আশপাশে কোনো বাচ্চার জ্বর হয়েছে, তখনেই বুকটা ধরফর করতে শুরু করে। কি আর বলব, আমার চার বছরের পিয়াসকে সারাক্ষণ ফুল স্লিভের গেঞ্জি-প্যান্ট পরিয়ে রাখি। বাচ্চা ঘেমে যায়, তার পরেও খুলতে দেই না। যদি এডিস মশা কামড় দেয়। অন্য একজন অভিভাবক আয়শা বেগম। তিনি বাসাবাড়িতে ছুটা বুয়ার কাজ করেন। বলেন, ‘বস্তিতে দুই বাচ্চাকে রেখে আসি, কার সাথে খেলে, কার সাথে খায় কিছুই কইতে পারি না। হাম-ডেঙ্গু নিয়া ডর লাগে, কিন্তু কি করুম, কামে তো আইতেই হইব, না হলে প্যাটে ভাত জুটব ক্যামনে। আমাদের বস্তিতে অনেক বাচ্চার জ্বর হইছে, আমার বাচ্চারও জ্বর হইছে। আমার বাচ্চা হামের টিকা পায় নাই। এবার টিকা দিলে দিয়া নিব।’
এডিস মশাবাহিত ডেঙ্গু জ্বরে আক্রান্ত হয়ে গত ২৪ ঘণ্টায় আরো পাঁচ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ১১০ জন। বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হেলথ ইমার্জেন্সি অপারেশন সেন্টার ও কন্ট্রোল রুম থেকে প্রকাশিত ডেঙ্গুবিষয়ক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছরে বুধবার পর্যন্ত ডেঙ্গুতে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০৭ জনে। একই সময়ে মোট আক্রান্তের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ২৮০ জনে। এ যাবত্ ডেঙ্গুর চিকিত্সা নিয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন ৩৫ হাজার ৪৩৩ জন। বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি আছেন ২ হাজার ৭৪০ জন।
এদিকে হামের সংক্রমণে গত ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে আরো ৪ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে আরো ১ হাজার ৯৭ জন। গতকাল বুধবার স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদন বলছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত সারা দেশে হাম ও উপসর্গে মোট ৯৮৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে নিশ্চিত হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৯ জনের এবং হামের উপসর্গে ৮৮৪ জনের। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া চার জনের মধ্যে তিন জনই ঢাকা বিভাগের বাসিন্দা। অন্যজন ময়মনসিংহ বিভাগের।
অন্যদিকে গত ২৪ ঘণ্টায় আক্রান্তদের মধ্যে নিশ্চিত হাম রোগী ৬৩ জন এবং হামের উপসর্গ দেখা গেছে ১ হাজার ৩৪ জনের শরীরে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর জানিয়েছে, ১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট সন্দেহজনক হাম রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ১৮৪ জন এবং নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৪৪৭। এই সময়ের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ১ লাখ ৪০ হাজার ৪৭২ জন এবং সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছে ১ লাখ ৩৫ হাজার ৪১৭ জন। এর আগে মঙ্গলবার ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গে ছয় জন শিশুর মৃত্যু হয়। আর আক্রান্ত হয় ১ হাজার ২৩১ জন।

