চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার: ৮ মাসে আক্রান্ত ২১৮৬, আগস্টেই ১২০২

আপডেট : ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:২৫

চট্টগ্রামে ডেঙ্গু পরিস্থিতি ক্রমান্বয়ে আশঙ্কাজনক রূপ নিচ্ছে। বর্ষা মৌসুমের শেষ ভাগে এসে অঞ্চলটিতে প্রতিদিন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা। চলতি বছরের শুরুর দিকে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও জুন মাস থেকে পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। এরপর জুলাইয়ে আক্রান্তের গ্রাফ ঊর্ধ্বমুখী হয় এবং সবশেষ আগস্টে এসে আক্রান্তের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়ে যায়। সেপ্টেম্বরের শুরুতেও ডেঙ্গু সংক্রমণের এই ধারাবাহিক বৃদ্ধি অব্যাহত রয়েছে।

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের সর্বশেষ ডেঙ্গু প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে নতুন করে ৭৮ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। একই সময়ে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে খালেদা বেগম (৪৭) নামে এক নারীর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর চট্টগ্রামে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ছয়জনে। মৃতদের মধ্যে তিনজন নারী ও তিনজন পুরুষ।

সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর চট্টগ্রামে মোট ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ২ হাজার ১৮৬ জন। এর মধ্যে নগরের ৯৩৬ জন, জেলার বিভিন্ন এলাকার ৯৫৫ জন এবং চট্টগ্রামের বাইরে থেকে এসে চিকিৎসা নেওয়া রোগী রয়েছেন ২৯৫ জন। আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষ ১ হাজার ১৫১ জন, নারী ৬০২ জন এবং শিশু ৪৩৩ জন।

এখনও হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ১৮৭ জন। চলতি বছরে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে সরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৪৭ জন এবং বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৩৩৯ জন।

সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে আগস্টে। ওই মাসেই চট্টগ্রামে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন ১ হাজার ২০২ জন। অর্থাৎ চলতি বছরের মোট আক্রান্তের অর্ধেকেরও বেশি রোগী শনাক্ত হয়েছেন শুধু এক মাসে। আগস্টে আক্রান্তের এই ঊর্ধ্বগতি সেপ্টেম্বরেও অব্যাহত থাকায় পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

এর আগে ১ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে গত ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭২ জন ডেঙ্গু রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্য জানিয়েছিল জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়। তখন আট মাসে আক্রান্তের সংখ্যা দাঁড়িয়েছিল ২ হাজার ১০৮ জন। পরের ২৪ ঘণ্টায় আরও ৭৮ জন আক্রান্ত হওয়ায় মোট সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ২ হাজার ১৮৬ জন।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুতে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম ছিল। জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত পাঁচ মাসে ১৭৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। কিন্তু জুনে এক মাসেই আক্রান্ত হন ১২২ জন। জুলাইয়ে সংক্রমণ আরও বাড়ে। জুলাইয়ের মাঝামাঝি পর্যন্ত আক্রান্তের সংখ্যা ৪৭২ জনে পৌঁছেছিল এবং তখনই স্বাস্থ্য বিভাগ পরিস্থিতি নিয়ে সতর্ক করেছিল।

এরপর আগস্টে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটে। এক মাসে ১ হাজার ২০২ জন আক্রান্ত হওয়ার ফলে বর্ষার সঙ্গে সঙ্গে চট্টগ্রামে ডেঙ্গুর সংক্রমণ যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে, তার স্পষ্ট চিত্র পাওয়া যায়।

স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, মোট আক্রান্তদের বড় অংশ চিকিৎসা শেষে হাসপাতাল থেকে ছাড়পত্র পেয়েছেন। তবে বর্তমানে ১৮৭ জন রোগী চিকিৎসাধীন থাকায় হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু রোগীর চাপ অব্যাহত রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সিটি করপোরেশনের মশক নিধন কার্যক্রম জোরদার করলেই ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে নগরবাসীকেও নিজ নিজ বাড়ি, ছাদ, বারান্দা, নির্মাণাধীন স্থাপনা ও আশপাশে পানি জমতে না দেওয়ার বিষয়ে সচেতন হতে হবে।

ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়লেও নগরের বিভিন্ন এলাকায় মশার উপদ্রব কমেনি। নিয়মিত মশক নিধন কার্যক্রম চালানোর দাবি থাকলেও অনেক এলাকায় এডিস মশার প্রজননস্থল ধ্বংসে কার্যকর অভিযান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে নির্মাণাধীন ভবন, পরিত্যক্ত ভবন ও বিভিন্ন খোলা জায়গায় জমে থাকা পানি অপসারণে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।

স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ‘ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশার প্রজননস্থল ধ্বংসের পাশাপাশি রোগীদের দ্রুত শনাক্ত করে চিকিৎসার আওতায় আনতে হবে। জ্বর হলে অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।’

চট্টগ্রাম জেলা সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ সাজেদুর রহমান বলেন, ‘ডেঙ্গু মোকাবিলায় সচেতন হওয়া সবচেয়ে জরুরি। নিজেদের ঘরবাড়ি ও আঙিনায় কোথাও যেন পানি জমে মশার বংশবৃদ্ধি না ঘটে, সেদিকে সবাইকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে এবং সময়মতো চিকিৎসা শুরু করলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুঝুঁকি অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব।’

তিনি আরও বলেন, ‘হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ডেঙ্গু রোগীদের অবশ্যই মশারির ভেতরে রাখতে হবে। তা না হলে রোগীর শরীর থেকে মশার মাধ্যমে আশপাশের মানুষ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।’

ইত্তেফাক/এসএইচ