অভিনেতা সুশান্ত সিং রাজপুতের সাবেক ব্যবস্থাপক দিশা সালিয়ানের মৃত্যুর ঘটনায় নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন বম্বে হাইকোর্ট। মামলাটি তদন্ত করবে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা (সিবিআই)। একই সঙ্গে তদন্তের দায়িত্ব একজন জ্যেষ্ঠ ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বুধবার (২ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি সারাং কোটওয়াল ও বিচারপতি রণজিৎ সিং ভোসলের সমন্বয়ে গঠিত ডিভিশন বেঞ্চ এ আদেশ দেন। দিশার বাবা সতীশ সালিয়ান গত বছর মেয়ের মৃত্যুর ঘটনা নিয়ে আদালতে আবেদন করেছিলেন। ওই আবেদনে শিবসেনা নেতা আদিত্য ঠাকরের নামও উল্লেখ করা হয়।
২০২০ সালের ৮ জুন মুম্বাইয়ের মালাড এলাকার একটি বহুতল ভবনের ১৪ তলা থেকে পড়ে মারা যান দিশা সালিয়ান। সে সময় মুম্বাই পুলিশ ঘটনাটিকে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু হিসেবে নথিভুক্ত করেছিল। তবে শুরু থেকেই মেয়ের মৃত্যুর ঘটনাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেননি সতীশ সালিয়ান।
দিশার বাবার অভিযোগ, তার মেয়েকে ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছিল। এ ঘটনায় প্রভাবশালী কয়েকজনকে রক্ষা করতে পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আড়াল করেছে বলেও তিনি দাবি করেন। এসব অভিযোগের ভিত্তিতেই পরে হাইকোর্টে আবেদন করেন তিনি।
আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী, সিবিআই এখন পুরো ঘটনাটি নতুন করে খতিয়ে দেখবে। তদন্তে গুরুতর কোনো অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল করতে হবে। আর অপরাধের যথেষ্ট প্রমাণ না মিললে সংশ্লিষ্ট আদালতে মামলা বন্ধের জন্য ক্লোজার রিপোর্ট জমা দিতে হবে।
আদিত্য ঠাকরের বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়েও আদালত গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন। বিচারপতিরা বলেন, তদন্তে পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত কাউকে অভিযুক্ত হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। দিশার বাবার অভিযোগ সত্যও হতে পারে, আবার ভুলও হতে পারে। তবে তার মেয়ের মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশ এফআইআর করে পূর্ণাঙ্গ তদন্ত করলে পরিবারকে একটি নির্দিষ্ট উত্তর দেওয়া সম্ভব হতো বলে আদালত মন্তব্য করেন।
আদালতে দিশার বাবার পক্ষে আইনজীবী নীলেশ ওঝা অভিযোগ করেন, মুম্বাই পুলিশ দিশার ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সম্পর্কে তার বাবাকে যথাসময়ে অবহিত করেনি। হাইকোর্টে আবেদন করার প্রায় পাঁচ বছর পর তাকে ওই প্রতিবেদন দেওয়া হয় বলেও জানান তিনি।
আইনজীবী আরও প্রশ্ন তোলেন, সতীশ সালিয়ান যেসব ব্যক্তিকে নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন, তাদের মধ্যে আদিত্য ঠাকরেসহ অন্যদের বিরুদ্ধে কেন এফআইআর করা হয়নি।
তবে মহারাষ্ট্র সরকারের পক্ষ থেকে এসব অভিযোগের বিরোধিতা করা হয়। সরকারি আইনজীবী শিশির হিরে আদালতকে জানান, দিশার মৃত্যুর ঘটনায় কাউকে অভিযুক্ত করার মতো প্রমাণ তদন্তে পাওয়া যায়নি। প্রাথমিক তদন্তে আত্মহত্যা অথবা দুর্ঘটনাবশত ভবন থেকে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনার কথা উঠে এসেছিল বলেও জানান তিনি।
সরকারের পক্ষ থেকে আরও বলা হয়, সতীশ সালিয়ান ও তার স্ত্রী পুলিশকে একাধিকবার বক্তব্য দিয়েছিলেন। এ কারণে দিশার বাবা আগে কেন কারও বিরুদ্ধে সন্দেহ প্রকাশ করেননি, সে প্রশ্নও তোলা হয়।
অন্যদিকে আদিত্য ঠাকরের পক্ষে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সুদীপ পাসবোলা আদালতে আবেদনটির বিরোধিতা করেন। তার দাবি, দিশার মৃত্যুর বিষয়টি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
সরকারি পক্ষ জানায়, ২০২০ সালের অক্টোবরেই দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যুর প্রতিবেদন বা এডিআর বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে রাজ্যে সরকার পরিবর্তনের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের প্রাথমিক তদন্ত নিয়ে নানা অভিযোগ ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি পুনরায় পর্যালোচনা করা হয়। তবে সেই পরবর্তী তদন্তেও হত্যার অভিযোগে কাউকে অভিযুক্ত করার মতো শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি বলে আদালতকে জানানো হয়।
এখন হাইকোর্টের নির্দেশে দিশা সালিয়ানের মৃত্যুর ঘটনা নতুন করে তদন্ত করবে সিবিআই। তবে তদন্তে নির্ভরযোগ্য ও পর্যাপ্ত প্রমাণ না পাওয়া পর্যন্ত আদিত্য ঠাকরে কিংবা অন্য কাউকে এ মামলায় অভিযুক্ত করা যাবে না—আদালতের পর্যবেক্ষণে বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে।

