উতমা ছড়া পাহাড়ে পাহাড়ে সবুজের ছড়াছড়ি

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ১৯:৪১

একটু আগেও খটখটে রোদ ছিল। এখন অঝরধারায় বৃষ্টি। সেই বৃষ্টির পরশ পেতে গাড়ির গ্লাসের বাইরে হাত বারিয়ে দিলাম। চারজন বেরিয়েছি। আজকের ভ্রমণের পথ নির্দেশক হলো ইমরান আহমদ হেলাল। ইমরানের বাড়ি সিলেটের কোম্পানীগঞ্জের নোয়া গাঁও। অনেকদিন ধরেই বলছিল উতমা ছড়ার কথা, যাব যাব করলেও ব্যাটে বলে মিলছিল না, অবশেষে আজ রওনা দিলাম। সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার উত্তর রনিখাই ইউনিয়নে উতমা ছড়ার অবস্থান। সিলেট শহর থেকে আম্বরখানা মালনী ছড়া চা বাগান ধরে আমরা এগিয়ে চলেছি। সবাই তাকিয়ে আছে দিগন্তরেখার দিকে। যেখানে রৌদ্র-ছায়া খেলা করছে পাহাড়ের গায়ে। অথচ এখানে বৃষ্টি ঝরছে। চা বাগানের প্রতিটি পাতা বৃষ্টির স্পর্শে এক নতুন রূপ ধারণ করেছে। ধূপাগুলের কাছাকাছি যেতেই রাস্তাটা হঠাত্ খাল-বিল-নদী-নালার রূপ পেল। আমাদের গাড়ি হঠাত্ কাদায় আটকে পড়ল। অগত্যা গাড়ি থেকে নেমে পড়তে হলো। হেঁটে হেঁটে কিছুটা পথ পার হলাম। সালুটিগড় হয়ে থানার বাজারের পথে প্রবেশ করলাম। এখান থেকেই বাকিটা পথ স্বপ্নের মতো! সরু রাস্তার দু পাশের সবুজ ধানক্ষেত দেখতে দেখতে হঠাত্ যখন চোখে সুদূরের পাহাড়গুলো দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, তখনই স্বপ্নের শুরু। আরে! আকাশটাও বদলে গেছে! উজ্জ্বল নীল আকাশ আর তার শরীরে সাদা সাদা মেঘ নানা ভঙ্গিমায় নৃত্যরত। পাহাড়ে এসে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়েছে মেঘ। দিগন্তরেখায় মেঘ আর পাহাড়ের পারস্পরিক ভালোবাসা দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। ইমরান আমাদের আশ্বস্ত করে, পাহাড়ের যত কাছে যাবেন, ততই ভালো লাগবে। আমাদের ভালো লাগতে শুরু করেছে। এরমধ্যে পৌঁছে গেলাম ধলাই সেতুতে। যার নিচ দিয়ে প্রবাহিত ধলাই নদী। সামনে মেঘালয় পর্বতমালা, যার কোল ছুঁয়ে বয়ে চলেছে ধলাই নদী। সে এক দৃশ্য বটে! এককথায় অসাধারণ। এমন দৃশ্যে চোখ-মন দুটিই ভরে ওঠে। নদীর বাম পাশে পানি আর ডান পাশে বিশাল বালিয়াড়ি। পুরো পরিবেশ অপরূপ। তবু বালুচরে ঘেরা এমন ম্রিয়মান ধলাই নদী দেখে দু  চোখ ঝাপসা হয়ে এল। আমরা দয়ার বাজারের পথ ধরে এগিয়ে চলেছি। তারপর ভাটরার গ্রামে এসে দেখা মিলল প্রায় শতবর্ষ পুরনো এক স্কুুলঘরের। ভাটরার গ্রাম পেছনে ফেলে প্রায় আধঘণ্টা পর চড়ার বাজারে পৌঁছালাম। চড়ার বাজারে আমাদের যাত্রাবিরতি টানতে হলো। কেননা প্রায় তিন ঘণ্টা আমরা পথ চলেছি, পেটে কিছু পড়েনি। এবার পেটে কিছু দেওয়ার পালা। এখানে তেমন ভালো মানের কোনো হোটেল নেই। রাস্তার পাশের দোকানে বসে গরম গরম ভাত আর মুরগির ঝাল ফ্রাই খাওয়া হলো। পেটে খুব ক্ষুধা ছিল, তাই খাবার অমৃতের মতো মনে হলো। আমরা আবার যাত্রা শুরু করলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে পৌঁছে গেলাম টলির ঘাটে। সেখান থেকেই উতমা ছড়ার শুরু। সারি সারি পাহাড়, পাহাড়ের বুকে গাঢ় সবুজের আস্তরণ। পাহাড়ের বুক চিড়ে চলেছে শীতল স্বচ্ছ জলরাশি। আছে পাথর ছড়ানো সর্বত্র। আমি একের পর ছবি তুলতে থাকলাম। আকাশে নিলিমার ছোঁয়া, আবার কখন কালো মেঘের মায়া—এই সবকিছুকে সঙ্গী করে আমরা উপভোগ করছি প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। উতমা ছড়া তার পরতে পরতে সাজিয়ে রেখেছে সম্মোহনী রূপ। যান্ত্রিক কোলাহলমুক্ত নির্জন অরণ্যের সাহচর্য পেতে উতমা ছড়ার বিকল্প নেই। আছে সবুজের সমারোহ, দিগন্ত বিস্তৃত সাদা মেঘের খেলা, পাথর ছড়ানো চারপাশ, দুধসাদা জলরাশি, পাখিদের কলতান। মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই! উতমাছড়ার সৌন্দর্য সবচেয়ে বেশি ধরা দেয় বর্ষাকালে। অন্যান্য মৌসুমে উতমা ছড়াকে মরুভূমির বুকে গজিয়ে ওঠা উদ্যানের মতো মনে হয়। দেখতে দেখতে আমাদের ফেরার সময় হয়ে এল। আমরা আবার ফিরে চললাম শহর পানে। স্মৃতি হয়ে রইল উতমাছড়ার সম্মোহনী সৌন্দর্য।

যা ও য়া র  প থ

 

ঢাকার থেকে বাস বা ট্রেনে সিলেটে যেতে হবে। ভাড়া পড়বে জনপ্রতি ৪৫০ থেকে ১২০০ টাকা। সিলেট মহানগরীর আম্বরখানা পয়েন্ট থেকে সরাসরি সিএনজি অটোরিকশাযোগে যেতে হবে ৩৫ কিলোমিটার দূরবর্তী দয়ারবাজারে। সড়কের অবস্থা তেমন ভালো না হওয়ায় এ পরিমাণ সড়ক পাড়ি দিতে গুণতে হবে জনপ্রতি ১৮০-২০০ টাকা। দয়ারবাজার থেকে আবার সিএনজি অটোরিকশাযোগে আট কিলোমিটার দূরবর্তী চড়ারবাজারে যেতে হয়। এজন্য জনপ্রতি ভাড়া ২৫-৩০ টাকা পড়বে। চড়ারবাজার থেকে ১৫ মিনিটের মতো হাঁটলেই পেয়ে যাবেন উতমা ছড়ার দেখা। অথবা  সরাসরি মাইক্রোবাস নিয়ে যেতে পারবেন, তবে বর্ষার সময় দ্বিগুণ ভাড়া গুনতে হবে, ৪০০০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা।