মুরগির খাদ্য ও পালন-পদ্ধতির ওপর নির্ভর করে ডিমের পুষ্টি, রং দেখে নয়

আপডেট : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:০৩

সুপারশপ কিংবা বাজারে ডিম কিনতে গিয়ে অনেকেরই মনে প্রশ্ন জাগে-বাদামি ডিম বেশি পুষ্টিকর, নাকি সাদা ডিম? প্রচলিত ধারণায় অনেকেই বাদামি ডিমকে বেশি পুষ্টিকর, প্রাকৃতিক ও সুস্বাদু মনে করেন। আবার কেউ কেউ সাদা ডিমকে বেশি পরিচ্ছন্ন ও স্বাদে ভালো বলে মনে করেন।

তবে পুষ্টিবিদ ও বিজ্ঞানীদের মতে, ডিমের খোসার রং দিয়ে এর পুষ্টিগুণ বিচার করা ঠিক নয়। মূলত মুরগির জাত ও বংশগত বৈশিষ্ট্যের কারণেই ডিমের খোসার রং আলাদা হয়। সাদা কিংবা বাদামি-শুধু রঙের কারণে কোনো ডিমকে বেশি পুষ্টিকর বলা যায় না।

ডিমের খোসার রং কেন আলাদা হয়?

ডিমের খোসার রং প্রধানত নির্ভর করে মুরগির জাত ও জেনেটিক বৈশিষ্ট্যের ওপর। হোয়াইট লেগহর্ন, হোয়াইট রক ও কর্নিশ জাতের মুরগি সাধারণত সাদা ডিম পাড়ে। অন্যদিকে প্লাইমাউথ রক, নিউ হ্যাম্পশায়ার ও রোড আইল্যান্ড রেড জাতের মুরগি সাধারণত বাদামি ডিম দেয়।

এ ছাড়া দক্ষিণ আমেরিকার অ্যারোকানা, আমেরিকানা, ডংক্সিয়াং ও লুসি জাতের মুরগি নীল বা নীলচে-সবুজ রঙের ডিমও পাড়তে পারে।

মুরগির শরীরে তৈরি বিভিন্ন প্রাকৃতিক রঞ্জক পদার্থের কারণে ডিমের খোসায় এই রঙের পার্থক্য দেখা যায়। বাদামি ডিমের ক্ষেত্রে প্রধান রঞ্জক হলো প্রোটোপোরফাইরিন নাইন, যা রক্তের হিম থেকে তৈরি হয়। আর নীল ডিমে প্রধান রঞ্জক বিলিভার্ডিন।

একই জাতের মুরগির ডিমের রংও বয়স, অসুস্থতা, পরিবেশ কিংবা ভয় ও চাপের কারণে কিছুটা হালকা বা গাঢ় হতে পারে।

ডিমের খোসার রং কি পুষ্টিগুণ বদলে দেয়?

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ডিমের খোসা সাদা, বাদামি কিংবা অন্য কোনো রঙের হলেও এর মৌলিক পুষ্টিগুণে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য নেই। বিভিন্ন গবেষণাতেও খোসার রংকে ডিমের গুণগত মানের নির্ভরযোগ্য সূচক হিসেবে পাওয়া যায়নি।

তবে ডিমের আকারের সঙ্গে ক্যালরি ও প্রোটিনের পরিমাণে পার্থক্য হতে পারে। একটি মাঝারি আকারের ডিমে প্রায় ৬০ ক্যালরি ও ৬ গ্রাম প্রোটিন থাকে। অন্যদিকে জাম্বো আকারের ডিমে প্রায় ৯০ ক্যালরি ও ৮ গ্রাম প্রোটিন থাকতে পারে। নীল ডিমে কোলেস্টেরল তুলনামূলক কম-এমন দাবিও প্রচলিত আছে। তবে এ দাবির পক্ষে পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।

ডিমের স্বাদের ক্ষেত্রেও খোসার রং বড় কোনো ভূমিকা রাখে না। ডিম কতটা সতেজ, মুরগিকে কী ধরনের খাবার দেওয়া হয়েছে এবং ডিম কীভাবে রান্না করা হচ্ছে-এসব বিষয় স্বাদের ওপর বেশি প্রভাব ফেলে।

তাহলে ডিমের পুষ্টিগুণ নির্ভর করে কিসের ওপর?

ডিমের পুষ্টিমান অনেকটাই নির্ভর করে মুরগির খাদ্য, পালন-পদ্ধতি ও পরিবেশের ওপর। গবেষণায় দেখা গেছে, উন্মুক্ত পরিবেশে সূর্যালোক ও খোলা বাতাসে চলাফেরা করা মুরগির ডিমে খাঁচায় পালন করা মুরগির ডিমের তুলনায় বেশি ভিটামিন ডি থাকতে পারে।

আবার মুরগির খাবারে তিসিবীজের মতো ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ উপাদান যোগ করলে ডিমে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডের পরিমাণ বাড়তে পারে। একইভাবে ভিটামিনসমৃদ্ধ খাবার দিলে ডিমে নির্দিষ্ট কিছু ভিটামিনের মাত্রাও বাড়ানো সম্ভব। অর্থাৎ ডিমের খোসার রঙের চেয়ে মুরগির খাদ্য ও পালন-পদ্ধতি ডিমের পুষ্টিমান নির্ধারণে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

বাদামি ডিমের দাম বেশি কেন?

বাদামি ডিমের তুলনামূলক বেশি দামের পেছনে ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। অতীতে বাদামি ডিম পাড়া মুরগি সাধারণত আকারে বড় ছিল। ফলে তারা বেশি খাবার খেত এবং অনেক ক্ষেত্রে তুলনামূলক কম ডিম দিত। এতে ডিম উৎপাদনের খরচও বেশি পড়ত।

বর্তমানে উৎপাদনব্যবস্থায় অনেক পরিবর্তন এসেছে। তারপরও বাদামি ডিমকে বেশি পুষ্টিকর মনে করার প্রচলিত ধারণা এবং অরগানিক বা ফ্রি-রেঞ্জ ডিমের বড় একটি অংশ বাদামি হওয়ায় বাজারে এসব ডিমের দাম তুলনামূলক বেশি দেখা যায়।

ডিম কেনার সময় কী দেখবেন?

ডিমের খোসার রং মূলত একটি বাহ্যিক বৈশিষ্ট্য। তাই শুধু বাদামি না সাদা-এই বিবেচনায় ডিম কেনার প্রয়োজন নেই। বরং ডিম কেনার সময় কয়েকটি বিষয় গুরুত্ব দেওয়া উচিত। সতেজতা ও সংরক্ষণ: পরিষ্কার ও অক্ষত খোসার ডিম বেছে নিন। সঠিক তাপমাত্রায় সংরক্ষিত কি না, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

মুরগির খাদ্য: ডিমের পুষ্টিমান সম্পর্কে ধারণা পেতে মুরগিকে কী ধরনের খাবার দেওয়া হয়েছে, তা দেখুন।

অরগানিক বা ফ্রি-রেঞ্জ: এসব ডিম কিনতে চাইলে প্যাকেটের তথ্য ও উৎপাদনকারীর দাবিগুলো যাচাই করুন।

মেয়াদ ও মান: প্যাকেটজাত ডিমের ক্ষেত্রে মেয়াদ, সংরক্ষণবিধি এবং মান নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত তথ্য দেখে কিনুন।

বাদামি ডিম মানেই বেশি পুষ্টিকর আর সাদা ডিম মানেই কম পুষ্টিকর-এ ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। ডিমের পুষ্টিমান নির্ধারণে খোসার রঙের চেয়ে মুরগির খাদ্য, পালন-পদ্ধতি, ডিমের সতেজতা ও সংরক্ষণব্যবস্থা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

 
ইত্তেফাক/এমএএম