ব্রেকআপের পর প্রথম সপ্তাহে কী করবেন? মনোবিজ্ঞানীর ৫ পরামর্শ

আপডেট : ০৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২১:৪০

বিচ্ছেদ জীবনের অন্যতম কষ্টকর অভিজ্ঞতা। হঠাৎ কোনো সম্পর্কের সমাপ্তি মানুষকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে। প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে বুকের ভেতর জমে থাকা শোক, একাকিত্ব ও অস্থিরতা অনেক সময় দৈনন্দিন জীবনেও। হঠাৎ করে বদলে যেতে পারে ঘুম ও খাওয়ার অভ্যাস, কমে যেতে পারে কাজে মনোযোগ, বাড়তে পারে একাকীত্ব ও উদ্বেগ। বিশেষ করে ব্রেকআপের পর প্রথম কয়েকটি দিন অনেকের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময় হয়ে ওঠে। আবেগের তীব্রতায় কেউ কেউ এমন সিদ্ধান্তও নিয়ে ফেলেন, যা পরে অনুশোচনার কারণ হতে পারে।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ সময় নিজেকে সামলে নেওয়ার কিছু উপায় তুলে ধরা হয়েছে। ভারতের মানসিক স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘মার্গ মাইন্ডকেয়ার’-এর মনোবিজ্ঞানী শিরীন দারগানের পরামর্শ অনুযায়ী, ব্রেকআপের পর প্রথম সপ্তাহে লক্ষ্য হওয়া উচিত দ্রুত প্রাক্তন সঙ্গীকে ভুলে যাওয়া নয়; বরং নিজের মানসিক স্থিরতা ফিরিয়ে আনা।

মনোবিজ্ঞানীর মতে, ব্রেকআপের পর ‘সামনে এগিয়ে যাওয়া’ মানেই কোনো ‘রিভেঞ্জ গ্লো-আপ’ (প্রতিশোধমূলকভাবে নিজেকে আকর্ষণীয় প্রমাণ করার চেষ্টা) পরিকল্পনা করা নয়, কিংবা প্রাক্তন সঙ্গী সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কী করছেন, নতুন কারও সাথে যুক্ত হচ্ছেন কি না তা বারবার পরীক্ষা করাও নয়। এমনকি প্রাক্তন সঙ্গী আদৌ আপনাকে ভালোবাসতেন কি না তা জানার জন্য পুনরায় হুট করে যোগাযোগের চেষ্টা করা এবং ক্ষণস্থায়ী সান্ত্বনা খুঁজতে ধ্বংসাত্মক কোনো উপায় (যেমন: নতুন তড়িঘড়ি সম্পর্কে জড়ানো বা ক্ষতিকর দ্রব্যের অপব্যবহার) বেছে নেওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখাই হলো আসল অগ্রগতি। প্রথম সপ্তাহের লক্ষ্য এই নয় যে তাৎক্ষণিকভাবে প্রাক্তনকে মন থেকে মুছে ফেলতে হবে; বরং এই সময়টির মূল লক্ষ্য হলো নিজেকে মানসিকভাবে স্থিতিশীল করা, নিজের অনুভূতিগুলো বুঝতে পারা এবং ধীরে ধীরে স্বাভাবিক রুটিনে ফিরে এসে নিজের পায়ের নিচের মাটি পুনরায় খুঁজে পাওয়া।

প্রথম সপ্তাহে নিজেকে সামলাতে পাঁচটি পরামর্শ হলো—

১. নিজের মৌলিক প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিন
মানসিক চাপের সময় ঘুম, খাওয়া ও শরীরের যত্ন নেওয়ার মতো সাধারণ বিষয়গুলোও অবহেলিত হতে পারে। অথচ এগুলো ঠিক না থাকলে মন খারাপ ও উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।

তাই পর্যাপ্ত ঘুম, সময়মতো খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত পানি পান এবং হালকা শারীরিক নড়াচড়া বজায় রাখার চেষ্টা করা উচিত। খুব বেশি কিছু করার শক্তি না থাকলেও কিছুক্ষণ হাঁটা, গোসল করা কিংবা স্বাস্থ্যকর কিছু খাওয়ার মতো ছোট কাজ দিয়ে শুরু করা যেতে পারে।

২. আবেগকে চেপে রাখবেন না
ব্রেকআপের পর দুঃখ, রাগ, হতাশা কিংবা একাকীত্ব অনুভব করা স্বাভাবিক। এসব আবেগ থেকে পালানোর বদলে সেগুলোকে স্বীকার করা প্রয়োজন।

প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ মিনিট নিজের অনুভূতির জন্য আলাদা করে রাখা যেতে পারে। এ সময় ডায়েরিতে লেখা, কান্না করা কিংবা নিজের অনুভূতিগুলো নিয়ে নিরিবিলি ভাবার সুযোগ নেওয়া যেতে পারে। এতে আবেগকে বোঝা ও নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতে পারে।

তবে সারাদিন যেন এসব চিন্তাই দখল করে না নেয়, সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে।

৩. প্রাক্তনকে ঘিরে ডিজিটাল ট্রিগার এড়িয়ে চলুন
ব্রেকআপের পর প্রাক্তন সঙ্গীর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বারবার দেখা, পুরোনো ছবি বা মেসেজ ঘাঁটা কিংবা তিনি কখন অনলাইনে আসছেন তা খেয়াল করা মানসিক কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

তাই কিছুদিনের জন্য এসব যোগাযোগ সীমিত করা যেতে পারে। প্রয়োজনে আনফলো, মিউট বা অন্যান্য গোপনীয়তা সেটিং ব্যবহার করা যেতে পারে। এটি প্রতিহিংসার প্রকাশ নয়; বরং নিজের মানসিক সুস্থতার জন্য প্রয়োজনীয় দূরত্ব তৈরি করার একটি উপায়।

৪. কাছের মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখুন
ব্রেকআপের পর নিজেকে সবার কাছ থেকে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতা দেখা দিতে পারে। কিন্তু পুরোপুরি একা হয়ে যাওয়ার বদলে অন্তত এক বা দুজন বিশ্বস্ত মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা ভালো।

সবসময় নিজের সমস্যা নিয়ে আলোচনা বা সমাধান খোঁজার প্রয়োজন নেই। কাছের কারও সঙ্গে কিছুক্ষণ বসে থাকা, একসঙ্গে হাঁটতে যাওয়া কিংবা একবেলা খাবার খাওয়াও একাকীত্ব কমাতে সাহায্য করতে পারে। এতে একই চিন্তা বারবার মাথায় ঘুরতে থাকার প্রবণতাও কিছুটা কমতে পারে।

৫. আবেগের বশে বড় সিদ্ধান্ত নেবেন না
ব্রেকআপের পর মানসিক অস্থিরতার মধ্যে হঠাৎ চাকরি ছেড়ে দেওয়া, প্রাক্তনকে বারবার মেসেজ পাঠানো, অতিরিক্ত মাদক বা অন্য ক্ষতিকর উপায়ে আশ্রয় নেওয়া কিংবা দ্রুত নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার মতো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়।

এ সময় কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজেকে কিছুটা সময় দেওয়া জরুরি। কারণ তীব্র আবেগের মুহূর্তে নেওয়া সিদ্ধান্তের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব থাকতে পারে।

মনে রাখবেন, সেরে ওঠার পথ একরকম নয়
ব্রেকআপের পর মানসিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে ওঠা কোনো সরলরেখার মতো প্রক্রিয়া নয়। একদিন হয়তো বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ভালো লাগতে পারে, আবার পরদিনই মন খারাপ হয়ে কান্না আসতে পারে। এমন ওঠানামা স্বাভাবিক এবং এর অর্থ এই নয় যে আপনি আবার আগের অবস্থায় ফিরে গেছেন।

তবে দীর্ঘদিন ধরে তীব্র বিষণ্ণতা বা উদ্বেগ, ঘুম ও খাওয়ার সমস্যা চলতে থাকলে কিংবা নিজের ক্ষতি করার চিন্তা এলে দ্রুত মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বা প্রশিক্ষিত থেরাপিস্টের সহায়তা নেওয়া প্রয়োজন।

 
ইত্তেফাক/এসজেএস