পশ্চিম এশিয়ার কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ জলরাশি পারস্য উপসাগর। ওমান উপসাগরের বর্ধিত অংশ পারস্য উপসাগর ও তত্সংলগ্ন এলাকা অত্যন্ত ব্যস্ততম সমুদ্রপথ। এই উপসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে ওমান উপসাগর ও পারস্য উপসাগরের মধ্যকার সংযোগ স্থাপনকারী হরমুজ প্রণালি। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক পরিচিত ইরান-নিয়ন্ত্রিত হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে তেহরানের সঙ্গে তার প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তিসমূহের উত্তেজনাপূর্ণ বিরোধ বহু পুরোনো। অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে আমেরিকা ইরান দ্বিপক্ষীয় বিরোধের বর্ধিত মাত্রা এই জলরাশিতে ব্যাপক সামরিক উত্তেজনা দেখা দেয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে গত জুনে ব্রিটিশ ওভারসিজ টেরিটরি জিব্রাল্টার প্রণালিতে একটি ইরানি তেল ট্যাংকার আটক করে রয়াল নেভি। এর প্রতিক্রিয়ায় পারস্য উপসাগরীয় সামগ্রিক পরিস্থিতি একেবারে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়। এ সময় আমেরিকা ইরান দ্বিপক্ষীয় উত্তেজনা হঠাত্ই দৃষ্টিসীমার আড়ালে চলে যায়। ফলে ইঙ্গ-ইরান বিরোধ ক্রমশ উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। এই উত্তাপ আরো বাড়িয়ে দেয় হরমুজ প্রণালি অতিক্রমকালে ইরান নৌবাহিনী কর্তৃক একটি ব্রিটিশ তেল ট্যাংকার আটক হলে। এদিকে ইরান ও ব্রিটেন উভয়েই নিজেদের তেল ট্যাংকার আটকের ঘটনাটিকে জলদস্যুতা হিসেবে অভিহিত করে। এ পর্যায়ে পারস্য উপসাগর ঘিরে শুরু সামরিক উত্তেজনা যুদ্ধের দিকে মোড় নিতে থাকে। মূলত ইরান নেভির হাতে নিজ তেল ট্যাংকার স্টেনা ইম্পেরো আটকের প্রতিক্রিয়ায় ব্রিটেন খুব দ্রুত বেশ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ পারস্য উপসাগরে পাঠায়। এই পরিপ্রেক্ষিতে এ অঞ্চল ঘিরে আরেকবার যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়। যদিও মাত্র দুই দিন আগে আটককৃত ইরানি তেল ট্যাংকার গ্রেস ওয়ানকে ছেড়ে দেওয়ার অনুমতি দিয়েছে জিব্রাল্টার কর্তৃপক্ষ। অন্যদিকে জিব্রাল্টার কর্তৃপক্ষের এমন সিদ্ধান্ত ইঙ্গ-ইরান সাম্প্রতিক উত্তেজনা কিছুটা হলেও প্রশমিত হবে। যদিও সম্পূর্ণ মুক্তির অপেক্ষায় থাকা ইরানি ট্যাংকার গ্রেস-ওয়ানকে নতুন করে আটকের ঘোষণা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি স্থানীয় আদালত ( সর্বশেষ খবরে জানা গেছে, ট্যাংকারটি গ্রিসের দিকে যাত্রা করেছে।)। এতত্সত্ত্বেও জিব্রাল্টার কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্তটি ইরানের অবস্থানকেই সংহত করবে। যে কারণে এখন সবার দৃষ্টি ‘স্টেনা ইম্পেরো’র ক্ষেত্রে ইরান কী সিদ্ধান্ত নেয়?
আমরা যদি লক্ষ করি তাহলে দেখব যে, দীর্ঘ সময় থেকে পারস্য উপসাগর ঘিরে একধরনের সামরিক উত্তেজনা বিরাজমান। ক্রমাগত ঘটনা দুর্ঘটনার মধ্য দিয়ে এই জলরাশির সামরিক উত্তাপ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে আঞ্চলিক দেশগুলোর মধ্যে একধরনের যুদ্ধভীতি দেখা দিয়েছে। এক্ষেত্রে ইরানের সঙ্গে আমেরিকার বিরোধই উপসাগরীয় উত্তেজনার মূল উত্স হিসেবে কাজ করছে। তাই বর্তমান পরিস্থিতিতে এই উত্তেজনার শেষ কোথায় সেটিই সবার প্রশ্ন।
গত জুলাই মাসে স্টেনা আটকের পর থেকেই ব্রিটেন এই অঞ্চলে তার সমরসজ্জা বাড়িয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক নৌচলাচল নির্বিঘ্ন রাখতে নানা ধরনের পদক্ষেপের মাধ্যমে ইরানকে সতর্ক করছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে পারস্য উপসাগর ও তত্সংলগ্ন এলাকার সমুদ্রপথের ব্যবহার ঝুঁকিমুক্ত রাখতে ইউরোপীয় টাস্কফোর্স মোতায়েনের পরিকল্পনা ঘিরে আঞ্চলিক সমীকরণ অস্থির হয়ে উঠছে। ব্রিটেনের এই প্রস্তাব ইউরোপীয় দেশগুলো ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। অন্যদিকে ইরান এ ধরনের প্রস্তাবকে অগ্রহণযোগ্য আখ্যায়িত করেছে। এদিকে অদূর ভবিষ্যতে পারস্য উপাসাগরে ইউরোপীয় ফোর্স মোতায়েন করা গেলে হরমুজ প্রণালি তথা এই অঞ্চলে ইরানের সামরিক সক্ষমতা টেনে ধরা সম্ভব হবে। এই ইস্যুতে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এখনো গঠনমূলক সিদ্ধান্ত নেয়নি। এদিকে আমেরিকাও এই অঞ্চলে ইরানবিরোধী একটি সামুদ্রিক জোট গঠনের প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে। ইতোমধ্যে ওয়াশিংটনের অনেক বৈশ্বিক মিত্র মার্কিন এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। যদিও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ঘনিষ্ঠ মিত্র জাপান ও গুরুত্বপূর্ণ ইউরোপীয় অংশীদার জার্মানি, স্পেনসহ অনেক দেশ মার্কিন প্রস্তাবে অসম্মতি জানিয়েছেন। এই বাস্তবতা পারস্য উপসাগর ঘিরে এই ধরনের সামরিক পরিকল্পনা বৃহত্ যুদ্ধের শঙ্কাই বাড়িয়ে দেবে। এক্ষেত্রে বসে নেই ইরানও। ইঙ্গ-মার্কিন-ইউরোপীয় পরিকল্পনার বিপরীতে দেশটি নিজেদের সক্ষমতা বাড়িয়ে নিয়ে পালটা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিচ্ছে। আমরা যদি লক্ষ করি তাহলে দেখব যে, ইরান শুধু হরমুজ প্রণালি কিংবা পারস্য উপসাগর নয়, এর আশপাশেও শক্তি সমাবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে। সম্প্রতি দেশটির নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে এডেন উপসাগর ও লোহিতসাগরের মধ্যকার বাব আল মান্দাব প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার ইঙ্গিত দেন। ইয়েমেন যুদ্ধের প্রতিক্রিয়ায় ঐ অঞ্চলে সৃষ্ট শক্তির ভারসাম্যহীনতা ইরানের জন্য এই সুযোগ সৃষ্টি করেছে। আর বাব আল মান্দাব প্রণালিতে ইরানের নৌ-টহল জোরদার হলে প্রতিপক্ষের জন্য সেটি ক্ষতির কারণ হবে। বিশেষ করে, আকাবা উপসাগর, লোহিতসাগর ও এডেন উপসাগরভিত্তিক সমুদ্রবন্দরগুলোর জন্য বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন জরুরি হয়ে পড়বে। এক্ষেত্রে ইসরায়েলের হাইফা, সৌদি আরবের জেদ্দা বন্দরসহ অন্য দেশগুলোর বেশ কয়েকটি বন্দরের কার্যক্রমে স্থবিরতা দেখা দিতে পারে। ইরানের এ ধরনের চিন্তা আঁচ করতে পেরেই সম্প্রতি ইসরায়েলের পক্ষ থেকে ইরানকে সরাসরি হুঁশিয়ার করা হয়েছে। এই হুঁশিয়ারির ভাষাতেও আছে ভিন্নতা। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী সম্প্রতি একটি মিলিটারি প্যারেডে সেনাদের উদ্দেশে বলেন, বাব আল মান্দাব প্রণালিতে ইরানের সব ধরনের প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে আঞ্চলিক দেশগুলোর অবস্থান অভিন্ন হবে। ইরানকে এই দেশগুলোর বিরুদ্ধে লড়তে হবে এবং ইসরায়েলের প্রতিটি সেনা বিভাগ এই লড়াইয়ে যুক্ত থাকবে। সুতরাং খুব স্পষ্টভাবেই বোঝা যাচ্ছে যে একটি বৃহত্ পরিকল্পনার অংশ হিসেবে পারস্য উপসাগরকে কেন্দ্র করে বেড়ে ওঠা সামরিক তত্পরতার শেষ লক্ষ্য যুদ্ধ। আর এই যুদ্ধের প্রধান পক্ষ ইরান। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন হচ্ছে—এতগুলো বিশ্বশক্তির এমন আগ্রাসি অবস্থানের বিপরীতে ইরানের সক্ষমতা কোথায়?
গত জুলাইয়ের শেষ দিনটি ছিল ইরানের ঘনিষ্ঠ মিত্র রাশিয়ার নেভি ডে। এই উপলক্ষ্যে রাশিয়ায় উপস্থিত ছিলেন অনেক দেশের নৌবাহিনীর উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি। ইরানের নৌবাহিনীর প্রধানও একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদলসহ রাশিয়া সফর করেন। ঐ সফরের শেষ দিকে ইরানের নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা আসে। তার মধ্যে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ইরানের জন্য অত্যন্ত প্রেরণাদায়ক হচ্ছে পারস্য উপসাগরে ইরান রাশিয়া নৌমহড়ার সিদ্ধান্ত। এ বছরের কোনো এক সময় দেশ দুটি পারস্য উপসাগরে বড়ো আকারের মহড়া দেবে বলে ইরানের পক্ষ থেকে জানানো হয়। এমনটি হলে পারস্য উপসাগরের ইরানবিরোধী শক্তি সমাবেশের সুপ্ত অভিপ্রায় দুর্বল হবে। একই সঙ্গে ভূমধ্যসাগর, কাস্পিয়ান সাগরে থাকা রুশ নৌবহরগুলো পারস্য উপসাগরের সঙ্গে নিয়মিত সমন্বয়ের সুযোগ পাবে। এই অজুহাতে ইরানের অন্য মিত্ররাও নির্ভয়ে এই অঞ্চলে নেভি কার্যক্রমে অংশ নিতে পারবে, যা ইরানের সামগ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে অত্যন্ত ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। এমন প্রেক্ষাপটে পারস্য উপসাগরের অবনতিশীল পরিস্থিতি বৈশ্বিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে উঠতে পারে।
n লেখক : বিশ্লেষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা
