দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সেতুবন্ধে উপ-আঞ্চলিক জোট

আপডেট : ১৯ আগস্ট ২০১৯, ২০:৫৭

দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিভিন্ন আঞ্চলিক ও রাজনৈতিক সমস্যা থাকা সত্ত্বেও এ অঞ্চলের দেশগুলো বর্তমানে উপ-আঞ্চলিক জোটের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ, চীন (ইউনান প্রদেশ), ইন্ডিয়া এবং মিয়ানমারকে নিয়ে বি সি আই এম উপ-আঞ্চলিক জোট দেরিতে হলেও আশার আলো দেখছে। ১৯৯৯ সালে কুনমিং পরিকল্পনা নিয়ে চীন সর্বপ্রথম যে সাহায্য-সহযোগিতার কথা বলেছিল পরবর্তীকালে ২০১৩ সালে চার দেশের সম্মতিতে সেটিই বিসিআইএম-এ রূপ লাভ করে। বিসিআইএম উপ-আঞ্চলিক জোট এ অঞ্চলের অর্থনৈতিক, সামাজিক, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জ্বালানি সমস্যা সমাধান ও দারিদ্র্য বিমোচনসহ বিভিন্ন বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। প্রাথমিকভাবে সড়ক পথে ভারতের কলকাতা থেকে বনগাঁ বাংলাদেশের যশোর, ঢাকা ও সিলেট হয়ে আবার ভারতের আসাম ও পরে মিয়ানমার দিয়ে চীনের ইউনান প্রদেশের কুনমিং পর্যন্ত পণ্য আমদানি-রপ্তানি করা যাবে। প্রতিবছর বিসিআইএম ভুক্ত এরিয়ায় প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য হবে এবং দেশ চারটি ফ্রি ট্রেড অ্যাগ্রিমেন্ট চুক্তিতে প্রাথমিক ভাবে সম্মত হওয়ায় বাণিজ্যের পরিমাণ আরো বৃদ্ধি হবে। বাংলাদেশ এ থেকে প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার বাণিজ্য সুবিধা নিতে পারবে এবং আমদানি খরচ কম হওয়ায় অনেক পণ্যের দাম হ্রাস পাবে পাশাপাশি অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কর্মসংস্থানের নতুন নতুন ক্ষেত্র তৈরি হবে। বাংলাদেশও নতুন নতুন কৃষিজ ও শিল্পপণ্য নিয়ে এসব দেশে অনায়াসে হাজির হতে পারবে। শুধু সড়ক পথ নয় পরিকল্পনায় রয়েছে সমুদ্র পথের মাধ্যমে বাণিজ্য। এক্ষেত্রে চার দেশের অর্থনীতিতে যে অনেকটা পরিবর্তন পরিলক্ষিত হবে একথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

মিয়ানমার ছাড়া বাংলাদেশ, চীন, ভারত—সবারই রয়েছে প্রচণ্ড জ্বালানি ক্ষুধা, এ ক্ষুধা মেটাতেও বিসিআইএম সহযোগিতা করবে। মিয়ানমারের রয়েছে গ্যাস, কয়লার মতো সুবিশাল জ্বালানি সম্পদ এবং তাদের অর্থনীতির ভিত্তি গড়ে দিচ্ছে এই প্রাকৃতিক জ্বালানি রপ্তানি। মিয়ানমার একদিকে জ্বালানি রপ্তানি করে লাভবান হবে অন্যদিকে জোটভুক্ত বাকি তিন দেশ আমদানি করে। এছাড়াও শিল্পে অপেক্ষাকৃত দুর্বল দেশ পাহাড়ি মিয়ানমারও শিল্পকারখানা তৈরিতে উপ-আঞ্চলিক জোটের সহযোগিতা পাবে। মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের গড়পড়তার কূটনৈতিক সম্পর্ক; কিন্তু বিসিআইএম পুরোপুরি কার্যকর হলে মিয়ানমার থেকে খুব অল্প খরচে পাইপলাইনের মাধ্যমে বাংলাদেশ প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানি করতে পারবে ফলে গ্যাস নির্ভর শিল্প থেকে আরো লাভবান হওয়া সম্ভব হবে। এছাড়া বাংলাদেশের বিদ্যুতের ঘাটতি মেটাতেও ভূমিকা রাখবে মিয়ানমারের সুবিশাল জলবিদ্যুত্। পার্শ্ববর্তী দেশ হলেও সম্ভাবনাময় মিয়ানমার সম্পর্কে আমরা খুবই কম অবগত এবং রোহিঙ্গা ইস্যুসহ বিভিন্ন কারণে তাদের সঙ্গে মধুর কূটনৈতিক সম্পর্কও স্থাপন করা সম্ভব হয়নি; কিন্তু বিসিআইএম উপ-আঞ্চলিক জোটের মাধ্যমে আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে মিয়ানমারের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব হবে।

১৬ লাখ বর্গকিলোমিটারের বিসিআইএম ভুক্ত এরিয়ায় প্রায় ৪৫ কোটি মানুষের বসবাস এবং রয়েছে প্রচুর পরিমাণে প্রাকৃতিক সম্পদ ও শিল্প-বাণিজ্যের সম্ভাবনা। সেই প্রাকৃতিক সম্পদ ও শিল্প-বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে আছে মানবসম্পদ, ফলে সহজেই অনুমেয় যে বিসিআইএম অর্থনৈতিক করিডর উন্মুক্ত হলে এ অঞ্চলের বাণিজ্যের জাহাজের পালে নতুন করে উন্নয়নের ছোঁয়া লাগবে এবং সার্কভুক্ত দক্ষিণ এশিয়ার ভারত ও বাংলাদেশ আসিয়ানভুক্ত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ চীন ও মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত হবে ফলে প্রতিটি দেশই উপকৃত হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়