বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ ও রায়হান আলমের নামে চট্টগ্রামের এক চিকিৎসকের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করেছে একটি চাঁদাবাজ চক্র। এ নিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে দফায় দফায় বার্তা পাঠিয়ে ওই চিকিৎসককে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
চাঁদাবাজদের পাঠানো একটি বার্তায় বলা হয়, ‘আপনি কোথায় জায়গা নিচ্ছেন না নিচ্ছেন, আপনি কত টাকার মালিক—সেটা আমরা জানি। আমরা গরিব মানুষের পেটে লাথি মারি না।’
প্রথমে চিকিৎসকের কাছে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হলেও তা না পেয়ে পরে দাবির পরিমাণ বাড়িয়ে ২০ লাখ টাকা করা হয়। একই সঙ্গে টাকা না দিলে গুলি করে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন ওই চিকিৎসক।
এ ঘটনায় হাটহাজারী ও নগরীর বায়েজিদ এলাকা থেকে সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।
গ্রেপ্তাররা হলেন- কামরুল হাসান ওরফে সাগর (২৫), মো. রিকু (২৫), মো. তরিকুল ইসলাম ওরফে রোহিত (২০), আহমদুল্লাহ ওরফে মাসুম মেম্বর (৪০), আহমদ রেজা শাকিল (২৫), মো. মানিক (৪০) ও নুরুল আলম (৪০)
তাদের মধ্যে আহমদ রেজা শাকিলের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও চাঁদাবাজির ঘটনায় দুটি করে, অপহরণ, ডাকাতির প্রস্তুতি ও সন্ত্রাসবিরোধী আইনে একটি করেসহ মোট আটটি মামলা আছে।
গ্রেপ্তারদের কাছ থেকে ‘চাঁদাবাজির কাজে ব্যবহৃত’ বিদেশি নম্বরসহ চারটি মোবাইল এবং বেশকিছু ধারালো অস্ত্র জব্দ করার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
হুমকি পাওয়া চিকিৎসকের নাম মুহাম্মদ ইউসুফ ফারুকী পারভেজ। তিনি আমান বাজার এলাকায় এসএ হেলথ কেয়ার ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়মিত রোগী দেখেন।
চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার মাসুদ আলম মঙ্গলবার নিজের কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে ঘটনার বিস্তারিত তুলে ধরেন।
তিনি বলেন, ‘এ চাঁদাবাজরা হুমকি দিয়েছিল, টাকা না দিলে ১০০ পুলিশ রাখলেও ওই চিকিৎসককে মেরে ফেলা হবে।’
যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে, তারা কারাগারে থাকা আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের ‘বেতনভুক্ত কর্মচারী’ বলে পুলিশ সুপারের ভাষ্য।
তিনি বলেন, ‘এরা ডেভিড ইমনের হয়ে বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজ করে। আবার তাদের (ইমনদের) অজান্তেও বিভিন্ন জায়গায় তারা চাঁদাবাজি করে। এভাবে একটি চক্র তারা তৈরি করে ফেলেছে।’
পুলিশ সুপার বলেন, ‘চাঁদাবাজি এখন চট্টগ্রামের অন্যতম আলোচিত বিষয়। বিত্তবান, ব্যবসায়ী ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বিভিন্ন তথ্য তারা সংগ্রহ করে। এমনকি তাদের পরিবারের সদস্যরা কে কখন কোথায় যাচ্ছে, সেসব তথ্য ব্যবহার করে ভীতির পরিবেশ তৈরি করে। এ কারণে অনেকেই নীরবে চাঁদা দিয়ে যায়।’
যে নম্বর ও মোবাইল ব্যবহার করে চিকিৎসকের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছে, সেগুলো জব্দ করার কথা জানান পুলিশ সুপার মাসুদ আলম।
পুলিশ জানায়, গত ২ সেপ্টেম্বর রাতে চিকিৎসক ইউসুফ ফারুকীর চেম্বারে ফোন করে বড় সাজ্জাদের পরিচয় দিয়ে ১০ লাখ টাকা চাঁদা দবি করা হয়। বিষয়টি তিনি এড়িয়ে গেলে দফায় দফায় হোয়াটস অ্যাপে মেসেজ পাঠিয়ে হুমকি দেওয়া শুরু হয়। এক পর্যায়ে তারা ২০ লাখ টাকা দাবি করে মেরে ফেলার হুমকি দেয়।
চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (হাটহাজারি সার্কেল) কাজী মো. তারেক আজিজ বলেন, গ্রেপ্তার কামরুল হাসান সাগর ও তরিকুল ইসলাম রোহিত ওই চিচিৎসককে ফোন করে চাঁদা দাবি করে। তারাই বিভিন্নভাবে হুমকি দিয়ে আসছিল।
বড় দিঘীর পাড় এলাকায় এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন বাড়িতে চাঁদার দাবিতে ভাংচুর এবং নগরীর মোজাফ্ফর নগর এলাকায় এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে চাঁদা দাবির ঘটনাতেও এ চক্র জড়িত বলে তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
গত ৩ সেপ্টেম্বর হাটহাজারি থানায় করা সাধারণ ডায়েরিতে চিকিৎসক ইউসুফ ফারুকী পারভেজ অভিযোগ করেন, গত ২ সেপ্টেম্বর রাত আনুমানিক ১১টার দিকে তার চেম্বারের সিরিয়াল নম্বর নেয়ার মোবাইলে কল করে তার সাথে কথা বলতে চান এক ব্যক্তি।
টেলিফোনের ওই প্রান্তে থাকা ব্যক্তি নিজেকে বড় সাজ্জাদ পরিচয় দিয়ে ১০ লাখ টাকা তৈরি রাখতে বলেন। টাকা দিতে ব্যর্থ হলে যে কোনো সময় চেম্বারে গিয়ে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেন।
জেলা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, ‘গ্রেপ্তাররা মূলত গত জুলাই মাসে যশোর থেকে গ্রেপ্তার হওয়া ডেভিড ইমনের সহযোগী। ইমন জেলে থাকায় তারা রায়হান ও বড় সাজ্জাদের নামে চাঁদাবাজি করে থাকে।’
ওই পুলিশ কর্মকর্তার ভাষ্য, ‘এসব চাঁদাবাজির অনেক কিছুই সাজ্জাদ, রায়হান বা ইমন কেউ জানেন না। তাদের নাম ভাঙিয়ে তারা চাঁদা তোলেন।’
নগরীর মোজাফ্ফর নগর এলাকার ব্যবসায়ী মাকসুদুর রহমানের কাছ থেকে সম্প্রতি পলাতক সন্ত্রাসী রায়হান আলমের নামে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করা হয়েছিল।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হলে রায়হান আলম ফেইসবুকে লেখেন- ‘এই রকম বৃত্তান্ত না ছড়িয়ে ভালো করে খোঁজ খবর নিয়ে আমাদের নামে যারা সাধারণ মানুষকে হুমকি দিয়ে আসছে তাদের বাহির করুন…।’

