তীব্র রোদে পুড়ে যাচ্ছিলো তখন মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়াম।
চোখমুখ থেকে বেয়ে পড়া ঘাম মুছতে মুছতে ঐ রোদের মধ্যে সাদমান ইসলাম আর সৌম্য সরকারের সঙ্গে হেঁটে মাঠ পাড়ি দিচ্ছিলেন তিনি। দুই পাশে দুই তরুণ ওপেনারের মাঝে একটু যেন লাজুক ভঙ্গিতে এগোচ্ছিলেন সামনের দিকে। প্রশ্ন করতে বললেন, জীবনে প্রথম ক্যাম্প করার মতোই আনন্দ পাচ্ছি।
হ্যাঁ, সেই আনন্দ আবার ফিরে পাচ্ছেন জহুরুল ইসলাম অমি।
বিস্মৃতপ্রায় হয়ে পড়া অমি গুনে গুনে ছয় বছর পর আবার ফিরলেন জাতীয় দলের কাঠামোতে। ক্রিকেট থেকেই ছিটকে পড়তে গিয়েছিলেন। জীবন তাকে নিয়ে অনেক পরীক্ষা নিয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত হার মানেননি। একটাই কথা জপ করে গেছেন—পরিশ্রম করতে হবে। অবশেষে সেই পরিশ্রমের মূল্য পেয়েছেন। জাতীয় দলের ৩৫ জনের মধ্যে নাম এসেছে এক সময়ের এই জাতীয় দল তারকার।
অমি জানেন, এই ৩৫ জনের দলে থাকাটা শেষ কথা নয়। এখান থেকে চূড়ান্ত দলে জায়গা করে নেওয়াই আসল ব্যাপার। তারপরও দীর্ঘকাল পর জাতীয় দলের কাঠামোয় ফিরতে পারার আনন্দ তো কেড়ে নিতে পারছে না কেউ তার কাছ থেকে। স্বভাবসুলভ লাজুক হেসে বললেন,‘খুব ভালো লাগছে। আসলে আমরা যারা ক্রিকেট খেলি, সবার স্বপ্ন তো এই জাতীয় দল। এজন্যই পরিশ্রমটা করে গেছি। চূড়ান্ত দলে থাকতে পারলে আরো ভালো লাগবে। তবে এই যা পেয়েছি, এতেও আমি খুশি।’
২০১০ সালে জাতীয় দলে অভিষেক। বছর তিনেক নিয়মিত খেলেছেন। সর্বশেষ ২০১৩ সালে শ্রীলঙ্কা সফরে গিয়েছিলেন জাতীয় দলের সঙ্গে। খুব একটা ভালো কিছু করতে না পারলেও জাতীয় দলের সঙ্গে ছিলেন। কিন্তু পরপরই মেয়ের অসুস্থতা অমির জগেক নাড়িয়ে দিলো। মেয়েকে নিয়ে ছুটতে হয়েছে দেশ-বিদেশের অনেক ডাক্তারের কাছে। কী অসুস্থতা; তা কাউকে পরিষ্কার বলেননি অমি। এর মাঝে ঘনিষ্ঠ এক বন্ধুর অপারেশন নিয়ে উদ্বেল হয়ে উঠলেন। আবার নিজে খেলতে গিয়ে চোট পেলেন; তাতে পরপর দুবছরে দুটো অপারেশন লাগলো। এই তালগোল পাকানো অবস্থা চরমে থাকতে দুনিয়ায় এলো তার দ্বিতীয় সন্তান। কদিন পরই অমিকে দ্বিতীয়বার ইনজুরিতে পড়তে হলো এই সময়ে।
এসব পার করে ২০১৫ সালে আবার আলোয় এসেছিলেন। সেবার বিপিএলে ফিরে পাচ্ছিলেন নিজেকে। এমনকি জাতীয় দলেও ডাক পেয়েছিলেন। কিন্তু ক্যাম্পের প্রথম দিনেই ইনজুরিতে পড়ে আবার ছিটকে যেতে হয়েছিলো মাঠের বাইরে। অনেকে অমির শেষ দেখে ফেলেছিলেন ওখানে। কিন্তু অমি তো হাল ছাড়ার লোক নন। তিনি আবার ফিরে এসেছেন। এবার ঢাকা প্রিমিয়ার লিগে রানের বন্যা বইয়ে দিয়ে নিজেকে করে তুলেছেন আবার জাতীয় দলের দাবিদার।
এবার ঢাকা লিগে লম্বা সময় ধরে শীর্ষ রান সংগ্রাহক ছিলেন। শেষদিকে প্রতিযোগিতায় একটু পিছিয়ে পড়লেও ১৫ ম্যাচে ৭৩৫ রানের বিস্ময়কর সংখ্যা নিয়ে লিগ শেষ করেছেন। সেই পারফরম্যান্সের পুরস্কার হিসেবে এই ওপেনার এখন তরুণ সৌম্য, লিটন, সাদমানদের সঙ্গে লড়তে চলে এসেছেন। এই লড়াইয়ে মূল দলে ঢোকা হোক বা না হোক একটা জয় অমির হয়ে গেছে। আপাতত তার পরিশ্রমে সাফল্য এসেছে।
অমি হেসে বলেন, ‘আমার কথা একটাই—পরিশ্রম করে যেতে হবে। ক্রিকেট না হোক, জীবনের অন্য কোথাও এর ফল আসবে। ক্রিকেটই তো জীবনের শেষ কথা নয়।’
