মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের সংঘাত নতুন মাত্রা পাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলারের কাছাকাছি পৌঁছেছে।
ইরানের পাঁচটি তেলবাহী জাহাজ যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় ধ্বংস এবং এর জবাবে ইরানের পাল্টা হামলার পাশাপাশি সৌদি আরবের জ্বালানি স্থাপনায় হুথিদের হামলায় বিশ্ববাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় এবং জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
বুধবার (৯ সেপ্টেম্বর) এশিয়ার প্রারম্ভিক বাণিজ্যে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ১ ডলারের বেশি বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯৯ দশমিক ৪৬ ডলারে উঠেছে। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েটের (ডব্লিউটিআই) দামও বেড়ে হয়েছে ৯৪ দশমিক ৩৯ ডলার। ফলে দীর্ঘদিন পর আবারও আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলারের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তেল উৎপাদন ও রপ্তানি অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য। এই অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে শুধু উৎপাদন নয়, তেল পরিবহনও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে কোনো ধরনের অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তেলের সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ উপসাগরীয় দেশগুলোর বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও গ্যাস এই নৌপথ দিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে যায়।
বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের জ্বালানি চাহিদার বড় অংশই আমদানিনির্ভর। আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম বাড়লে সরাসরি পরিশোধিত ডিজেল, ফার্নেস অয়েল ও অন্যান্য জ্বালানি আমদানির ব্যয় বাড়তে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ব্যয় এবং শিল্পের উৎপাদন খরচও বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তেলের বাজারে অস্থিরতা এলএনজির ক্ষেত্রেও পরোক্ষ চাপ তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তেল ও গ্যাসের দামের মধ্যে পারস্পরিক প্রভাব রয়েছে। ফলে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে স্পট এলএনজির দামও বাড়তে পারে। এতে বাংলাদেশের গ্যাস সংকট মোকাবিলায় আমদানিনির্ভর এলএনজির ব্যয় আরও বেড়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শুধু তেলের দাম ১০০ ডলারে ওঠা নয়; বরং এই দাম কত দিন ওই পর্যায়ে থাকে এবং একই সঙ্গে জ্বালানি পরিবহনের ব্যয় ও বীমা খরচ কতটা বাড়ে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। কয়েক সপ্তাহের জন্য দাম বাড়লে এক ধরনের চাপ তৈরি হবে, কিন্তু সংঘাত দীর্ঘায়িত হয়ে সরবরাহব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটলে পরিস্থিতি অনেক বেশি জটিল হতে পারে।
তেলের দাম বাড়লে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আমদানি ব্যয় বাড়বে। আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে দেশের জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয়ের ধরন অনুযায়ী এর প্রভাব ভোক্তা পর্যায়েও পড়তে পারে। আবার দাম সমন্বয় না করা হলে সরকারের ওপর ভর্তুকি বা লোকসানের চাপ বাড়তে পারে।
এর পাশাপাশি ডলারের বিপরীতে টাকার বিনিময় হারও গুরুত্বপূর্ণ। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে যদি ডলারের দামও বাড়ে, তাহলে একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানিতে বাংলাদেশকে আরও বেশি টাকা ব্যয় করতে হবে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়তে পারে।
এ অবস্থায় মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত বাংলাদেশের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার জন্য নতুন সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেলে সরকারকে জ্বালানি আমদানির ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান, মজুত ব্যবস্থাপনা এবং এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা নতুন করে পর্যালোচনা করতে হতে পারে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত যদি তেল উৎপাদন ও পরিবহন অবকাঠামোতে সরাসরি আঘাত হানে, তাহলে শুধু দাম বাড়বে না-বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহের সংকটও দেখা দিতে পারে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশে তখন উচ্চমূল্যের পাশাপাশি জ্বালানি পাওয়ার নিশ্চয়তাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

