চারদিকে পাথর ও বালুর অনুর্বর ভূদৃশ্যের ছোট্ট ইয়েমেনি দ্বীপ ‘পেরিম’ এখন মধ্যপ্রাচ্যের বিস্তৃত সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে।
সিএনএনের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, লোহিতসাগর ও ভারত মহাসাগরের সংযোগস্থল বাব আল-মান্দেব প্রণালির মাঝখানে অবস্থিত এই দ্বীপটির ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এর গুরুত্ব অপরিসীম। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের আমলে এটি ভারতে যাতায়াতকারী জাহাজের কয়লা সরবরাহ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হলেও বর্তমানে বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে এর গুরুত্ব বহুগুণ বেড়ে গেছে।
ইরান সমর্থিত ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা যদি এই দ্বীপটির নিয়ন্ত্রণ নিতে সক্ষম হয়, তবে তারা বাব আল-মান্দেব দিয়ে চলাচলকারী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর চরম নিয়ন্ত্রণ ও চাপ সৃষ্টি করার ক্ষমতা অর্জন করবে। হরমুজ প্রণালির বিকল্প হিসেবে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য এই জলপথটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইতিমধ্যে পেরিমের প্রায় ৫০ মাইল উত্তরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ বন্দর নগরী মোখা দখল করে নেওয়ায় দ্বীপটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও তীব্র হয়েছে। ইয়েমেন সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা তারিক সালেহ সতর্ক করে বলেছেন, হুতিরা পেরিম দখল করলে তাদের হটাতে বড় ধরনের আন্তর্জাতিক সামরিক ও নৌবাহিনী মোতায়েনের প্রয়োজন হবে।
২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে গৃহযুদ্ধের সূচনা করার পর থেকে দেশটিতে সংঘাত চলছে। গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হুতিরা লোহিতসাগরে চলাচলকারী জাহাজে হামলা শুরু করলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। আগে বাব আল-মান্দেব প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ১০ শতাংশ সামুদ্রিক তেল-বাণিজ্য পরিচালিত হলেও বর্তমানে নিরাপত্তা সংকটের কারণে এর পরিমাণ অর্ধেকে নেমে এসেছে। এছাড়া মোখা বন্দরে হুতিদের রকেট হামলায় ১৬ জন নিহত, ২২ জন আহত এবং ছয়টি বাণিজ্যিক জাহাজ ডুবে যাওয়ার ঘটনা স্থানীয় অর্থনীতিকেও বিপর্যস্ত করে তুলেছে।
ইয়েমেন সরকারের অভিযোগ, ইরান হুতিদের দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার ব্যবস্থা ও ড্রোন প্রযুক্তির মতো আধুনিক অস্ত্র সরবরাহ করে আসছে। সরকারের আশঙ্কা, পেরিমের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে গেলে তারা এই প্রণালিতে মাইন পেতে পুরোপুরি জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার মতো বিপজ্জনক পরিস্থিতিও তৈরি করতে পারে। সব মিলিয়ে, ইয়েমেনের এই সংঘাত এখন আর কেবল একটি সাধারণ গৃহযুদ্ধ নয়; বরং বাব আল-মান্দেবকে কেন্দ্র করে এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান ভূরাজনীতির এক অন্যতম সংবেদনশীল ফ্রন্টলাইনে রূপ নিয়েছে।

