উচ্চশিক্ষায় ২ হাজার কোটি টাকার অডিট আপত্তি

আপডেট : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০০

দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যে উচ্চ মাপের দুর্নীতি হচ্ছে, তা স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে। সম্প্রতি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে ২০২৪-২৫ অর্থবছরের হিসাব পর্যালোচনা করে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) ও ২৪টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৩২টি খাতে মোট ২ হাজার ৩৯৬ কোটি ৯৩ লাখ ৭১ হাজার ৮৯৮ টাকার অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে ৪০টি খাতকে গুরুতর আর্থিক অনিয়ম বা এসএফআই হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

এসব খাতে আপত্তির পরিমাণ ৩৬৫ কোটি ১ লাখ ২১ হাজার ৮৬৮ টাকা। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিয়োগ, অর্গানোগ্রামের বাইরে পদোন্নতি এবং প্রাপ্যতার অতিরিক্ত ভাতা দেওয়ার প্রমাণ পেয়েছে শিক্ষা অডিট অধিদপ্তর। এদিকে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা ও জবাবদিহির ঘাটতির বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিল (এফআরসি)। সংস্থাটির পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, দেশের কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হিসাবমান অনুসরণ করে পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী প্রস্তুত করছে না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের এক জন অধ্যাপক গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ দিচ্ছে সরকার। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালনা ও উন্নয়ন কার্যক্রমের বড় অংশই নির্বাহ হচ্ছে অর্থে। অথচ সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আর্থিক হিসাবের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সুশাসনের ক্ষেত্রে রয়েছে বড় ধরনের কাঠামোগত ঘাটতি। 

আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত হিসাবমান অনুসরণ করে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই তাদের পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী বা ‘স্থিতিপত্র’ (ব্যালান্স শিট) প্রস্তুত করছে না। ফলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মোট সম্পদ, দীর্ঘমেয়াদি দায়, মূলধন এবং আর্থিক পরিসম্পদের প্রকৃত চিত্র আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।

এদিকে অডিটের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, জনবল ব্যবস্থাপনা ও বেতন-ভাতা সংক্রান্ত বিভিন্ন সিদ্ধান্তেই বড় অঙ্কের আপত্তি তৈরি হয়েছে। অর্গানোগ্রামের বাইরে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত বেতন-ভাতা পরিশোধের ঘটনায় ৪৭ কোটি ৩৭ লাখ ৬৪ হাজার ৫৩৮ টাকার রাজস্ব ক্ষতি হয়েছে। আবার বিধিবহির্ভূতভাবে উচ্চতর গ্রেডে পদোন্নতি ও আপগ্রেডেশন দেওয়ায় অতিরিক্ত ব্যয় হয়েছে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৫৪ হাজার ৮১৯ টাকা। নিয়োগের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের তথ্য রয়েছে। বিজ্ঞপ্তিতে চাওয়া যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও নিয়োগ দিয়ে বেতন-ভাতা পরিশোধ করায় ৩ কোটি ৪৩ লাখ ৫৬ হাজার ৮৬৪ টাকার আর্থিক ক্ষতির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অর্গানোগ্রামের বাইরে বা অতিরিক্ত পদে নিয়োগের মাধ্যমে আরো ৪৬ লাখ ৫০ হাজার ৪৪৭ টাকা ব্যয়ের আপত্তি রয়েছে। বিভিন্ন ধরনের ভাতার ক্ষেত্রেও বড় অঙ্কের অর্থ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের বিভিন্ন ভাতা দেওয়ায় ৩২ কোটি ৭৪ লাখ ৬ হাজার ৩৪৮ টাকার আপত্তি এসেছে। এর মধ্যে শিক্ষকদের অতিরিক্ত দায়িত্ব ভাতা বাবদ দেওয়া ১০ কোটি ২৮ লাখ ৭৩ হাজার ৮৫৪ টাকা এবং বই ভাতা বাবদ ১ কোটি ৯৭ লাখ ৪০ হাজার ৫৭৭ টাকা রয়েছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধিককাল ভাতা দেওয়ার বিষয়টিও নিরীক্ষায় উঠে এসেছে। প্রাপ্যতা না থাকা সত্ত্বেও এ ধরনের ভাতা দেওয়ায় আপত্তির পরিমাণ ৩৩ কোটি ৭৮ লাখ ৩ হাজার ৫৩৪ টাকা। একইভাবে প্রাপ্যতার অতিরিক্ত বা প্রাপ্যতা ছাড়াই সম্মানী দেওয়ার ঘটনায় ৬৪ লাখ ৩ হাজার ৫৫৫ টাকার আপত্তি রয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে বসবাস করেও বাড়ি ভাড়া নিয়েছে : গবেষণা ও প্রশাসনিক দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত আর্থিক সুবিধা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে অডিট অধিদপ্তর। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা ও ডিন ভাতা হিসেবে ৫ কোটি ৫৩ লাখ ৮৯ হাজার ১৮৭ টাকা দেওয়ার তথ্য মিলেছে। অডিটের মতে, সংশ্লিষ্ট বিধিতে স্বশাসিত ও রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের গবেষণা ভাতা পাওয়ার বিধান নেই। শিক্ষা ছুটিতে থাকা শিক্ষকদের ইনক্রিমেন্ট দেওয়ার ঘটনাও নিরীক্ষায় ধরা পড়েছে। মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে এভাবে অতিরিক্ত বেতন দেওয়ায় ১ কোটি ৯০ লাখ ১১ হাজার ৩৮৬ টাকা আর্থিক ক্ষতির কথা বলা হয়েছে। বেতন-ভাতার বাইরেও বাড়ি ভাড়া ও অবসর সুবিধা নিয়ে উল্লেখযোগ্য অঙ্কের আপত্তি রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোয়ার্টারে বসবাস করেও নির্ধারিত হারের চেয়ে কম বাড়ি ভাড়া কর্তন করায় ২০ কোটি ৪২ লাখ ১৭ হাজার ২৯১ টাকা এবং প্রাপ্যের চেয়ে বেশি বাড়ি ভাড়া দেওয়ায় ১৪ কোটি ৬২ লাখ ৮৫ হাজার ৫৫৬ টাকার আর্থিক ক্ষতির হিসাব করা হয়েছে।

যেসব বিশ্ববিদ্যালয় অডিট আপত্তির মুখে : শিক্ষা অডিট অধিদপ্তরের আপত্তির আওতায় আসা ২৪ পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো হলো বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ টেক্সটাইল বিশ্ববিদ্যালয়, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিমেল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, জাতীয় কবি নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, ইসলামি আরবি বিশ্ববিদ্যালয় ও খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। এছাড়া ইউজিসিও অডিট আপত্তির মুখে পড়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জমা দেওয়া নথিগুলো অসম্পূর্ণ : এদিকে ফাইন্যান্সিয়াল রিপোর্টিং কাউন্সিলের (এফআরসি) পর্যালোচনায় দেখা গেছে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বাধীন বহিঃনিরীক্ষকের মাধ্যমে নিরীক্ষিত পূর্ণাঙ্গ আর্থিক বিবরণী জমা দিলেও পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জমা দেওয়া নথিগুলো ছিল মূলত আংশিক, অনিরীক্ষিত ও অসম্পূর্ণ। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সেগুলো কেবল অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য তৈরি আয়-ব্যয়ের বিবরণী। অথচ আন্তর্জাতিক হিসাবমান অনুযায়ী, একটি পূর্ণাঙ্গ আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যালান্স শিট, আয় বিবরণী, নগদ প্রবাহ বিবরণী এবং নোটস টু অ্যাকাউন্টস থাকা বাধ্যতামূলক। এসব অনুপস্থিত থাকায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জমি, ভবন, গবেষণা অবকাঠামো, স্থায়ী সম্পদ, দায়-দেনা কিংবা ভবিষ্যত্ আর্থিক ঝুঁকির নির্ভরযোগ্য চিত্র পাওয়া যাচ্ছে না।

আন্তর্জাতিক গাইডলাইন মেনে স্থিতিপত্র তৈরি প্রয়োজন : অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়ে থাকে। তাই আর্থিক শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ইউজিসি ও এফআরসির যৌথ উদ্যোগে অবিলম্বে আন্তর্জাতিক গাইডলাইন মেনে স্থিতিপত্র তৈরি এবং পেশাদার চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের মাধ্যমে ‘এক্সটারনাল অডিট’ নিশ্চিত করা জরুরি। অন্যথায় দেশের উচ্চশিক্ষা খাতে সুশাসন ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে না।

 

ইত্তেফাক/এএম