স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে সরগরম রাজনৈতিক অঙ্গন

সব স্থানে সাত জনের বেশি সমর্থনপ্রত্যাশী বিএনপির, প্রার্থী চূড়ান্ত জামায়াতের

আপডেট : ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৪০

আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে ঘিরে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গন নতুন করে সরগরম হয়ে উঠেছে। চলতি বছরের শেষ দিকে ছয় বা সাত ধাপে ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ভোটের মধ্য দিয়ে শুরু হচ্ছে নির্বাচন উৎসব। এরপর ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকারের বাকি চার প্রতিষ্ঠান পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, সিটি কর্পোরেশন ও জেলা পরিষদ নির্বাচন আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। বিএনপি ভেতরে ভেতরে তাদের প্রার্থী বাছাই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। বিষয়টি সরাসরি তদারকি করছেন দলের চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ইউনিয়ন পরিষদসহ সবখানে বিএনপির সমর্থনপ্রত্যাশী গড়ে প্রতিটিতে ৭ থেকে ১৭ জন। দল সমর্থিত একক প্রার্থী চূড়ান্ত করাই বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এদিকে বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামী আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে। অধিকাংশ জায়গায় প্রার্থী চূড়ান্ত করেছে দলটি। অনেক প্রার্থীকে মাঠেও নামিয়েছে। 

সংশোধিত আইন অনুযায়ী আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন বা দলীয় প্রতীক ব্যবহারের সুযোগ না থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলো মাঠপর্যায়ে নিজেদের চেইন অব কমান্ড ঠিক রাখতে স্থানীয়ভাবে একক প্রার্থীকে সমর্থন দেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এদিকে জাতীয় রাজনীতিতে ১১ দলীয় ঐক্যের অংশীদার হলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের শক্তি নিয়েই মাঠে নামার প্রস্তুতি নিচ্ছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। তারা জোটগতভাবে নির্বাচন করবে না বলে ইতিমধ্যে জানিয়ে দিয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনে (ডিএনসিসি) মেয়র পদে এনসিপির মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও দলের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে বিষয়টি চূড়ান্ত হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর মেয়র প্রার্থী হিসেবে দলটির মহানগর উত্তর শাখার আমির সেলিম উদ্দিন-এর নাম চূড়ান্ত করা হয়েছে।

এদিকে ঢাকা উত্তরে বিএনপির সমর্থন প্রত্যাশীদের তালিকায় রয়েছেন দলটির নির্বাহী কমিটির সদস্য তাবিথ আউয়াল, কেন্দ্রীয় ক্ষুদ্রঋণবিষয়ক সম্পাদক এম এ কাইয়ুম, যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি মো. শফিকুল ইসলাম খান মিল্টন প্রমুখ। এর মধ্যে তাবিথ আউয়াল বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে দলের হয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে আলোচনায় আসেন। তখন তরুণ প্রার্থী হিসেবে ভোটারদের মধ্যে সাড়া ফেলতে সক্ষম হন। তিনি বর্তমান বন ও পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর ছেলে। আর এম এ কাইয়ূম বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে একাধিকবার গ্রেফতার হন ও মামলা-হামলার শিকার হন। গত সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১১ আসনে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলামের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে যান। আরেক প্রার্থী শফিকুল আলম খান মিল্টন বর্তমানে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করছেন। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৫ আসন থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করে জামায়াতের আমির ডা. শফিকুর রহমানের কাছে হেরে যান। এবার তিনি মেয়র প্রার্থী হওয়ার জন্য তত্পরতা চালাচ্ছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে তিন দলের সম্ভাব্য মেয়র প্রার্থী: ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে মেয়র পদে দলের মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এনসিপি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) ভিপি মো. আবু সাদিককে (সাদিক কায়েম) মেয়র পদে প্রাথমিকভাবে মনোনীত করেছে জামায়াত। ঢাকা দক্ষিণে দল সমর্থিত মেয়র প্রার্থিতায় আলোচনায় আছেন বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব হাবিব উন নবী খান সোহেল, চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বর্তমান প্রশাসক আব্দুস সালাম ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির একজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, এই তিন নেতাই দলে সমান গুরুত্বপূর্ণ। এর মধ্যে হাবিব উন নবী খান সোহেল বিগত দিনে আন্দোলন সংগ্রামে নিবেদিতপ্রাণের ভূমিকা রাখেন। ছাত্রজীবন থেকেই বারবার কারা নির্যাতিত। বিগত নির্বাচনে তাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আবার তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের কোনো জায়গাই তাকে রাখা হয়নি। হয়তো দল তাকে আরও বড় পরিসরে কাজে লাগাতে চায়। এক্ষেত্রে মেয়র পদে তাকে দেখা যেতে পারে। আর বিএনপির চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা ও বর্তমান ঢাকা দক্ষিণ সিটির প্রশাসক আবদুস সালামও আলোচনায় আছেন বলে জানায় আরেকটি সূত্র। বিশেষ করে বিগত জাতীয় নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্বাচনি সমন্বয়ক হিসেবে তার সাফল্যের বিষয়টিও বিবেচনাধীন বলে জানা গেছে। এদিকে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন এগিয়ে আছেন তরুণ প্রার্থী হিসেবে। বিশেষ করে জামায়াতের সাদিক কায়েম ও এনসিপির নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর মতো তরুণ প্রার্থীকে মোকাবিলায় তার মতো তরুণ প্রার্থীকেও সামনে আনা হতে পারে বলে মনে করছেন কেউ কেউ। এছাড়া তার বাবা প্রয়াত ছাদেক হোসেন খোকার গ্রহণযোগ্যতাকেও তার জন্য বাড়তি সুবিধা হতে পারে বলে মনে করেন নেতারা। তপশিলের পর প্রার্থীরা পুরোদমে ভোটারদের কাছে ছুটবেন বলে জানা গেছে। ডাকসুর মেয়াদ শেষ না হওয়ায় সাদিক কায়েম এখনো প্রার্থী হিসেবে প্রকাশ্য ঘোষণা না দিলেও দীর্ঘদিন ধরে ব্যাপক কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন সেলিম উদ্দিন।

স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেবে জামায়াত-এনসিপি: সূত্র জানায়, শুধু ঢাকার দুই সিটি নয়, স্থানীয় সরকারের সব স্তরের নির্বাচনে আলাদাভাবে অংশ নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে ১১-দলীয় ঐক্য। দলীয় প্রতীকে ভোট না হওয়া এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রার্থী বাছাইয়ের বাস্তবতা বিবেচনায় এ সিদ্ধান্ত হয়েছে। তবে কোনো এলাকায় শরিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করে একক প্রার্থী দিলে কেন্দ্র থেকে বাধা দেওয়া হবে না। গত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ১১ দলীয় ঐক্যের অধীনে ২২৪টি আসনে দলীয় প্রার্থী দেয় জামায়াত। এতে ৬৮ আসনে বিজয়ী হয় দলটি। জাতীয় নির্বাচনের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে আগামী স্থানীয় সরকারের ক্ষেত্রে আরো বেশি বিজয়ী হতে জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। এছাড়া স্থানীয় নির্বাচন ঘিরে নানা শঙ্কা, অভিযোগ ও দাবির বিষয়গুলো নির্বাচন কমিশনের কাছে তুলে ধরছেন জামায়াত নেতারা। সবশেষ গত ১ সেপ্টেম্বর দলটি ইসিতে গিয়ে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়ার দাবি জানায়। এছাড়া নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের পদধারী এবং বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নিয়োজিত প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার দাবি জানান তারা। প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও নির্বাচন কমিশনারদের (ইসি) সঙ্গে বৈঠক শেষে ৯ দফা দাবি পেশ করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার।

৭৫ শতাংশ প্রার্থীর নাম ঘোষণা তৃণমূল জামায়াতের: জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় তিন জন নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, স্থানীয় পর্যায়ে দলের জেলা ও উপজেলার দায়িত্বশীল নেতারা দল সমর্থিত প্রার্থীদের নাম ঘোষণা করছেন। ইতিমধ্যে ৭৫ শতাংশ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়েছে। সব সিটি করপোরেশনের প্রার্থীও প্রায় চূড়ান্ত, তবে আনুষ্ঠানিকভাবে নাম ঘোষণা করা হয়নি। সিটি কর্পোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের সব স্তরের প্রার্থীর নাম একসঙ্গে কেন্দ্র থেকে ঘোষণা করতে চায় দলটি। এনসিপির কেন্দ্রীয় একজন নেতা গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, এনসিপি এককভাবে নির্বাচন করার সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে।

ইত্তেফাক/এমএস