ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলেই থামবে ইরান যুদ্ধ!

আপডেট : ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০০:৫৫

সম্ভবত স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির পর থেকে এখন সবচেয়ে বিপজ্জনক সময়ে। বর্তমানে দুটি বড় ২৯ চলছে-একটি ইউরোপের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে, অন্যটি বিশ্ব জুড়ে জ্বালানি সরবরাহকে। পূর্ব এশিয়ায় চীন ক্রমাগত তাইওয়ানকে হুমকি দিয়ে যাচ্ছে। রাশিয়ার সহায়তায় উত্তর কোরিয়া তাদের সামরিক প্রযুক্তির আধুনিকায়ন করছে। সহজ কথায়, আগ্রাসী শক্তিগুলো এখন সক্রিয় হয়ে উঠেছে। তারা নিজেদের শাসনব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা, ক্ষতিকর অভ্যন্তরীণ এজেন্ডা বাস্তবায়ন এবং যতটা সম্ভব আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের লক্ষ্যে লড়াই করছে।

ইউক্রেন ও ইরান কেন্দ্রিক যুদ্ধ দুটি এখন পর্যন্ত আলাদাভাবেই চলছে। তবু সম্প্রতি এদের মধ্যে কিন্তু সংযোগ বা পারস্পরিক প্রভাব লক্ষ করা গেছে। সেসঙ্গে একটি গভীর আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে, এই সংঘাতগুলো হয়তো শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক যুদ্ধে রূপ নিতে পারে। যদিও সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্ভাবন' এখনো ক্ষীণ, তবু প্রকৃত বিপদ বিদাম'ন; কারণ এই দুটি যুদ্ধে লিপ্ত পক্ষগুলোর মধ্যে পারস্পরিক যোগসত্র রয়েছে। তবে আশার কথাও শোনা যাচ্ছে। জানা যাচ্ছে, রাশিয়াও ইউক্রেন যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। আবার যুক্তরাষ্ট্র ইরান যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে। তবে কেউই তার নিজস্ব শর্তে ছাড় দিচ্ছে না। তাই বিশ্লেষকদের মতে, ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ হলে ইরান যুদ্ধের সমাপ্তিতে ভূমিকা রাখতে পারে।

ইউক্রেন ও ইরান যুদ্ধের সংযোগ

ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেন্থণর প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনন্সি এবং ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বৈঠকের মধ্য দিয়ে সেই সংযোগটি আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ইউক্রেনের ড্রোন বিশেষজ্ঞরা পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে গিয়ে তাদের অর্জিত অভিজ্ঞতা ও কৌশল বিনিময় করেছেন-যা এই সম্পর্কেরই অরেকটি প্রমাণ। এছাড়া কাস্পিয়ান সাগরে রাশিয়া ও ইরানের মধ্যকর একটি সমরিক চালান ধ্বংস করার ঘটনাটিও এই সংগ্রহণকে সামনে নিয়ে এসেছে। ইরান হয়তো পালটা আঘাত করতে চেয়েছিল। কিন্তু তাদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে কারণ ইউক্রেনে হামলা চালাতে হলে সম্ভবত তুরস্কের আকাশসীমা অতিক্রম করতে হবে; আর তুরস্ক এর কঠোর জবাব দেবে মৃত্যু ও ধ্বংসযজ্ঞের বাইরেও ইরান কেন্দ্রিক সংঘাতের তীব্রতা আরো একটি বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। হরমুজ প্রণালি দীর্ঘ সময় ধরে বন্ধ থাকলে তা বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মম্পর ঝুঁকি তৈরি করবে ক্রমবর্ধমান এসব সংকটের মধ্যে একমাত্র ভালো খবর হলো, উল্লান ও ইউক্রেনের যুদ্ধ দুটি একে অন্যের সঙ্গে মিশে যায়নি এবং আমেরিকর মনোযে অন্যদিকে নিবন্ধ থাকার সুযোগ নিয়ে চীন তাইওয়ানে অক্রমণ চালায়নি। চলমান এসব উত্তপ্ত যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে অবশ্য এটুকু স্বস্তি খুব একটা বড়
কিছু নয়।

যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চায় সবাই

সাড়ে চার বছরের বেশি সময় ধরে চলছে ইউক্রেন যুদ্ধ। যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিবেদনের তথা অনুযায়ী, ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ পর্যন্ত রাশিয়ার প্রায় ৫ লক্ষ সেনা নিহত এবং মোট হতাহতের সংখ্যা ১৫ লাখের কাছাকাছি। যদিও মস্কো এই তথ্য স্বীকার করছে না। তেল শোধনাগার ও জ্বালানি অবকাঠামোতে ইউক্রেনীয় ড্রোন হামলায় রাশিয়ার জ্বালানি খাত ও অর্থনীতিতে বড় ধরনের চাপ তৈরি হয়েছে। এর ফলে মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি মন্থর হয়ে পড়েছে। তাছাড়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে দেশটির বাণিজ্য ও বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার টাংক ও বর্মযুক্ত সামরিক যান ধ্বংসে রাশিয়ার সামরিক আধুনিকায়ন দীর্ঘ পেছনের দিকে চলে গেছে। ইউক্রেনের অন্তত ৫ লাখ ২৫ হাজার থেকে ৬ লাখ ২৫ হাজার সেনা হতাহত বা নিখোঁজ হয়েছেন। এর মধ্যে নিহতের সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ২৫ হাজার থেকে দেড় লাখের মতো রুশ হামলায় হয়রেনের শহরগুলো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র, চিকিৎসাকেন্দ্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লাখ লাখ ইউক্রেনীয় নাগরিক দেশত্যাগী হয়ে শরণার্থী জীবন কাটাচ্ছে, যা দেশটির জনমিতি ও সামগ্রিক সক্ষমতার ওপর অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে এনেছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে ইরানের চলমান সংঘাতে চারটি পক্ষ সামরিক, অর্থনৈতিক মানবিকভাবে তীব্র ক্ষতির মুখে পড়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে সংঘাতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে থাকা অন্তত ১৭টি মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মার্কিন সেনাসদস্যরা নিহত ও আহত হয়েছেন। হরমুজ প্রণালিতে তেল ট্যাংকার হামলা ও আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতার করণে বৈশ্বিক কাণিজ্যে ও স্বর্কিন প্রভাবের ওপর বড় ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বিমান হামলায় ইরানের শীর্ষ নেতৃত্ব, বিপ্লবী গার্ডের কমান্ডার এবং পরমাণু ও সামরিক স্থাপনাগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দেশটিতে হাজারো মানুষ নিহত, আহত ও কস্তুচ্যুত আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা ও তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ায় অর্থনীতি চরম বিপর্যয়ের মধ্যে। ইরানের ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্তের আঘাতে ইসরাইলের একাধিক সামরিক ও গোয়েন্দা স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। লেবানন, ইরাক, পারস্য উপসাগরীয় দেশ এবং জর্ডান পর্যন্ত এই যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ায় পুরো মধ্যপ্রাচ্যে প্রাণহানি ও অবকাঠামোখাত ধ্বংস হয়েছে হরমুজ প্রণালি ও তেলবাহী জাজে হামলার কারণে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে গেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনীতি অস্থিতিশীল হয়ে উঠেছে।

ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধের প্রভাব ইরানে!

রাশিয়া ও ইউক্রেন উভয় দেশই যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে চায়। মস্কো হয়তো মনে করেছিল, অল্প দিনের মধ্যেই কিয়োত পরা ক্ষয় স্বীকার করবে। প্রেসিডেন্ট পুতিন এখনো তার দেশে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বঙ্গয় রেখেছেন এবং আশঙ্কা করছেন, সমঝোতা বা আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটলে তিনি হয়তো ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারবেন না। ইউক্রেন যেহেতু তাদের কোনো ভূখণ্ডই (যা এখনো রাশিয়ার দখলে যায়নি) ছেড়ে দিতে রাজি নয়, তাই সম্ভাব্য সমঝোতা হলে পুতিনের হাতে দেখানোর মতো তেমন কোনো অর্জনই থাকবে না আবার ইউক্রেনের প্রেসিটে জেলেনস্কিও জানেন, রাশিয়াকে ভূখণ্ড ছেড়ে দিয়ে সমঝোতা হলে তার ক্ষমতাও টিকে থাকবে না। কারণ তিনি দিন দিন দেশে অজনপ্রিয় হয়ে উঠছেন। কেবল ইউক্রেন নয়, রাশিয়ার সঙ্গে এ ধরনের সমঝোতা হলে তা ইউরোপের জন্য পর জয় স্বীকার করা হবে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্র আটকে গেছে ইরান যুদ্ধে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের প্রশাসন হয়তো মনে করেছিল যে, প্রথম হামলাতেই ইরানে সরকার পরিবর্তন হবে। কিন্তু সেটা হয়নি, বরং মার্কিন ও ইসরাইলি হামলায় বেসামরিক নাগরিক নিহত হওয়ায় সাধারণ জনগণ এখন সরকারের পাশে দাঁড়িয়েছে। আবার তেহরানের হামলায় ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হচ্ছে বিশ্বের পর শক্তি যুক্তরাষ্ট্রের। তাই প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চান দ্রুত যুদ্ধ থেকে বেরিয়ে আসতে এই সুযোগই নিয়েছেন রুশ প্রেসিডেন্ট পুতিন তার পরামর্শ, যুক্তরাষ্ট্র যদি তার মিত্র এবং তার ওপর নির্ভরশীল ইউক্রেনকে বাগে এনে যুদ্ধ থামাতে পারে, তাহলে তিনিও ইরানকে চাপ দিয়ে যুদ্ধ থামাতে জোর প্রচেষ্টা চালাবেন।

ইরানও রাশিয়ার অন্যতম মিত্র এবং সামরিক সহায়তার মুখাপেক্ষী। যুদ্ধ থামাতে প্রথম বার ব্যর্থ যুক্তরাষ্ট্র এবার দ্বিতীয় বারের মতো চেষ্টা চালাচ্ছে। মার্কিন প্রতিনিধিদল রাশিয়া ও ইউক্রেন সফর করেছে এবং দুই দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তবে এখনো আশার বাণী তারা শেনতে পারেননি। তবে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানিয়েছেন, দ্রুত যুদ্ধ শেষ হবে। আবার ইউক্রেনেও রুশ হামলার মাত্রা বাড়ছে। প্রেসিডেন্ট জেলেনন্সি এখন প্রেসিডেন্ট পুতিনের সঙ্গে বৈঠকেরও প্রস্তাব দিয়েছেন তাই পুতিনের আহ্বান শেষ ট্রাম্প কস্তবায়ন করতে পারবেন কিনা তার ওপরই নির্ভর করছে বিশ্বের আরেকটি ভয়াবহ যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা

ইত্তেফাক/এএম