ব্রিকস সম্মেলনের বড় নৈশভোজের মেনু নিয়ে কংগ্রেস নেতারা তীব্র মন্তব্য করেছেন। তাদের অভিযোগ, বিশ্বের ওপর নিরামিষভোজ চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে বিজেপি। গতকালের আয়োজনে সম্মেলনে অংশ নেওয়া বিশ্বনেতাদের জন্য পুরোপুরি নিরামিষ খাবার পরিবেশন করা হয়।
মেনুতে ১০টির বেশি পদ ছিল। শুরুতে ছিল খুম্ব গালাউটি, আর মিষ্টির তালিকায় ছিল শাহদূত ফিরনি ও জিলাপির সঙ্গে ফ্রুট ক্রিম। তবে মূল খাবারের সব পদই ছিল নিরামিষ—পনির, মাশরুম, মিলেট পোলাও ও বিটরুট রায়তা। এসব খাবারে নতুন ও বৈচিত্র্যময় উপকরণও ব্যবহার করা হয়েছিল।
এতে ক্ষুব্ধ হয় কংগ্রেস। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে রাহুল গান্ধী বলেন, ‘রেকর্ডের জন্য বলছি, ৮০ শতাংশ ভারতীয় আমিষভোজী। ভারতীয় আমিষ খাবার সুস্বাদু। আমার বোনের ছোলে ভাটুরের মতোই।’
কংগ্রেস নেতা পবন খেরা এক্সে লিখেছেন, ‘সহদেশীয়দের ওপর নিজেদের পছন্দের খাবার চাপিয়ে দেয়ার বিজেপির অভ্যাস এমনিতেই গভীরভাবে সমস্যাজনক। এখন তারা আরও এক ধাপ এগিয়ে গিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অতিথিদের ওপরও নিজেদের পছন্দ চাপিয়ে দিয়েছে।’
ওয়ারিস পাঠান বলেন, ‘আমরা ভারতের বৈচিত্র্য নিয়ে অনেক কথা বলি। কিন্তু এই মেনু সেই বৈচিত্র্যকেই যেন মুছে দিয়েছে!’ তিনি আরও বলেন, ‘আপনি নিরামিষভোজ প্রচার করতে চান, করুন— অবশ্যই করুন। কিন্তু ভারতের খাদ্যসংস্কৃতিকে শুধু নিরামিষ মেনুর মধ্যে সীমাবদ্ধ করবেন না। ভারতে কোটি কোটি মানুষ আমিষ খাবার খান। মাটন, চিকেন ও মাছও আমাদের খাবারের বৈচিত্র্যের সমান গুরুত্বপূর্ণ অংশ।’
তার পোস্টে তিনি লিখেছেন, ‘বিশ্বের সবচেয়ে বড় নেতারা ভারতে এসেছেন। আমাদের উচিত ছিল তাদের সামনে ভারতের খাবারের পূর্ণ বৈচিত্র্য তুলে ধরা—মাটন মসালা ফ্রাই, হায়দরাবাদি বিরিয়ানি, তন্দুরি চিকেন, বাটার চিকেন, গোয়ান ফিশ কারি এবং এ ধরনের আরও বিখ্যাত ভারতীয় খাবার। বিশ্বকে বলা উচিত, ভারতের বৈচিত্র্য শুধু ভাষা ও সংস্কৃতিতে নয়—আমাদের থালিতেও রয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এ কারণেই আমি বলেছিলাম— মাটন-চিকেন নেই... মামা-ফুফা ক্ষেপে যাবেন!’ এ মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি বিরোধীদের নিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির করা ‘নারাজ ফুফা’ কটাক্ষের প্রসঙ্গ টানেন।
বিজেপিও পাল্টা জবাব দিয়েছে। দলটির অভিযোগ, নীতিগত ফলাফল নিয়ে আলোচনা না করে খাবার নিয়ে কথা বলে কংগ্রেস একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক ঘটনাকে তুচ্ছ করে দেখছে। বিজেপি বলেছে, বিরোধীরা সম্মেলনের সিদ্ধান্ত, বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা কিংবা ব্রিকস সদস্যদের মধ্যে ঐকমত্য তৈরিতে ভারতের সাফল্য নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারেনি।
বিজেপির আরও অভিযোগ, বৈশ্বিক বিষয়ে ভারতের প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর হিসেবে উঠে আসায় কংগ্রেস ‘অসন্তুষ্ট’ এবং সমালোচনা করার মতো কোনো বাস্তব বিষয় না পেয়ে নৈশভোজের মেনু নিয়ে কথা বলছে।
বিজেপির জাতীয় মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি এক্সে লিখেছেন, ‘সম্মেলনের সমালোচনা করার মতো বিরোধীদের কাছে যদি খাবারের মেনু ছাড়া আর কিছু না থাকে, তাহলে বুঝতে হবে ব্রিকস কতটা সফল হয়েছে। ভারতকে বৈশ্বিক ঐকমত্য তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে উঠে আসতে দেখে কংগ্রেস অসন্তুষ্ট।’
বিজেপির আরেক জাতীয় মুখপাত্র তুহিন সিনহা অভিযোগ করেন, গান্ধীর ‘তুচ্ছ ও হাস্যকর’ মন্তব্য তার পাশাপাশি কংগ্রেসের মানসিকতাও প্রকাশ করে। তার মতে, এসব মন্তব্যই দেখায় কেন কংগ্রেস এখন ‘প্রান্তিক’ অবস্থায় রয়েছে এবং কেন দলটি ‘প্রান্তিক একটি গোষ্ঠীতে’ পরিণত হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘দেশে যদি কোনো দায়িত্বশীল বা বিচক্ষণ বিরোধীদলীয় নেতা থাকতেন, তাহলে আজ তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও ভারতকে অভিনন্দন জানাতেন। নয়াদিল্লি ঘোষণার মাধ্যমে ভারত যা অর্জন করেছে, তা ঐতিহাসিক। প্রথমবারের মতো সব ব্রিকস দেশকে গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ইস্যুতে এক কণ্ঠে ঐক্যবদ্ধ অবস্থান নিতে দেখা গেছে। এর আগে এমনটি হয়নি।” সংবাদ সংস্থা পিটিআই তার বক্তব্যের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানিয়েছে।’
দুর্গাপূজার সময় আমিষ খাবার খাওয়া নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে ব্যাপক বিতর্কের মধ্যেই এই বিতর্ক শুরু হয়েছে। বিশ্ব হিন্দু পরিষদের কয়েকজন নেতার কথিত মন্তব্য নিয়ে সেখানে ডানপন্থীদের ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়তে হয়েছে।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার জমকালো নৈশভোজে ছিল বিশাল আয়োজনের সম্পূর্ণ নিরামিষ মেনু। শুরুতে পরিবেশন করা হয় ‘খান্ডভি মিলেট’, যা বেসন দিয়ে তৈরি ভাপে সেদ্ধ রোল, এবং ‘খুম্ব গালাউটি’, যা প্যানে গ্রিল করা মাশরুমের কাবাব, সঙ্গে ছিল পুদিনার মুক্তার মতো বল।
মূল খাবারের মধ্যে ছিল ‘পনির লাবাবদার’, ‘গুচ্ছি মারমিক’—হিমালয়ের মোরেল মাশরুম ও কচি অ্যাসপারাগাস—এবং ‘ক্যারট বিন পোরিয়াল’।
মেনুতে আরও ছিল ‘থাক্কালি বেলে সারু’—হালকা ডালের ঝোল, মিলেট পোলাও, বিটরুট রায়তা এবং বিভিন্ন ধরনের ভারতীয় রুটি।
মিষ্টির তালিকায় ছিল ‘ওল্ড দিল্লি ফ্রুট ক্রিম উইথ জিলাপি’ এবং ‘শাহদুত ফিরনি’।

