সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পরও বিদেশি নাগরিকদের মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। এতে প্রিয়জনকে ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী সমাহিত করার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে পরিবারগুলো। মানবাধিকারকর্মীরা বলছেন, মরদেহ ফেরত না দেওয়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবারের ওপরও এক ধরনের শাস্তি চাপিয়ে দেওয়ার মতো।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ২৩ জুন দক্ষিণ সৌদি আরবের আসির প্রদেশের খামিস মুশাইত কারাগারে মাদক পাচারের দায়ে পাঁচ ইথিওপীয় নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাদের মধ্যে ২৫ বছর বয়সী কিব্রম কিনফে আরেগাউইও ছিলেন।
কিব্রমের বাবা কিনফে আরেগাউই বলেন, ছেলের মৃত্যুর পর পরিবারের পক্ষ থেকে প্রতীকীভাবে শেষকৃত্যের আনুষ্ঠানিকতা পালন করা হলেও তার মরদেহ দেশে ফেরত না আসায় তিনি প্রকৃত অর্থে সান্ত্বনা পাচ্ছেন না।
‘পরিবার হিসেবে সান্ত্বনা পেতে আমরা এই সমস্ত আনুষ্ঠানিকতা করেছি। কিন্তু আমি আমার সান্ত্বনা পাবো না। এটি আমার জন্য সারাজীবনের দুঃখ হয়ে থাকবে,’ বলেন তিনি।
কিনফের মতো অনেক ইথিওপীয় অর্থোডক্স খ্রিস্টান পরিবারের কাছে ধর্মীয় রীতি মেনে প্রিয়জনের মরদেহ সমাহিত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কিব্রমের পরিবার সেই সুযোগ পায়নি।
মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ জুলাই পর্যন্ত এক বছরে সৌদি আরবে ১১৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের সংখ্যার দিক থেকে চীন ও ইরানের পর সৌদি আরব বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দেশ।
ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের জ্যেষ্ঠ গবেষক এবং মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্তদের নিয়ে কাজ করা সংস্থা রিপ্রিভ মেনার কেসওয়ার্ক কনসালট্যান্ট দুয়া ধাইনি বলেন, মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের মরদেহ পরিবারের কাছে ফেরত না দেওয়া শুধু প্রশাসনিক বিষয় নয়।
‘মৃতদেহ ফেরত দিতে অস্বীকৃতি জানানো কেবল একটি প্রশাসনিক বিষয় নয়। এটি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির পরিবারকেও শাস্তি দেওয়া,’ বলেন তিনি।
ধর্ম ও বিশ্বাসের স্বাধীনতা বিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ প্রতিবেদক নাজিলা ঘানেয়া সৌদি আরবের মরদেহ আটকে রাখার অভিযোগকে ‘নির্যাতন ও নিপীড়ন’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
কিব্রম ২০২০ সালে প্রথমবার বৈধ ভিসা ছাড়াই বাবার সঙ্গে সৌদি আরবে যান। সে সময় তাদের গ্রেপ্তার করে ১৫ মাস কারাগারে রাখার পর ইথিওপিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়।
পরে ইথিওপিয়ার গৃহযুদ্ধের কারণে কিব্রম আবার সৌদি আরবে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। লোহিত সাগর পাড়ি দিতে অতিরিক্ত যাত্রীবোঝাই একটি নৌকায় ওঠেন তিনি। এরপর পায়ে হেঁটে ইয়েমেন অতিক্রম করেন।
২০২৩ সালে সৌদি সীমান্ত পার হওয়ার সময় তাকে আবারও গ্রেপ্তার করা হয় এবং মাদক পাচারের অভিযোগ আনা হয়। তার বাবা জানান, তিন মাস কারাগারে থাকার পর কিব্রমকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। প্রায় তিন বছর কারাগারে থাকার পর চলতি বছরের জুনে হঠাৎ তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
কিব্রমের বাবা বলেন, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার সুযোগও পাননি তার ছেলে।
‘সে আমাদের সঙ্গে কথা বলারও সুযোগ পায়নি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমি তার মৃত্যুর খবর জানতে পারি,’ বিবিসিকে বলেন কিনফে।
তিনি বিশ্বাস করেন, তার ছেলে নির্দোষ ছিল এবং সৌদি আরবে তাকে অন্যায়ভাবে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
কিনফে বলেন, ‘আমার ছেলে হাশিশ পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিল এমন কোনো প্রমাণ নেই। কেউ আমাকে তার মৃত্যুর সনদপত্র, তার কোনো জিনিসপত্র বা মৃতদেহ দেয়নি। আমি শুধু নীরবে কাঁদি। আমি আর কীই বা করতে পারি?’
একই দিনে একই কারাগারে সিগাবু গেব্রেমারিয়াম নামের ২৬ বছর বয়সী আরেক ইথিওপীয় নাগরিকেরও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়।
ইথিওপিয়ার কেন্দ্রীয় তিগ্রায় অঞ্চলের একটি গ্রামীণ জেলার আট ভাইবোনের মধ্যে সিগাবু ছিলেন সবার বড়। ১৮ বছর বয়সের পর দারিদ্র্য ও গৃহযুদ্ধ থেকে বাঁচতে তিনি বাড়ি ছেড়েছিলেন।
তার বাবা হাগোস গেব্রেমেস্কেল বলেন, পরিবারকে সহায়তা করার জন্যই সিগাবু সৌদি আরবে গিয়েছিলেন।
‘আমাদের এলাকায় তরুণদের জন্য তেমন কোনো কাজ নেই। আমাকে সাহায্য করার জন্যই সে সৌদি আরবে গিয়েছিল,’ বলেন হাগোস।
মাদক পাচারের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হয়ে সাড়ে তিন বছর কারাগারে ছিলেন সিগাবু। মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের আগে ফেব্রুয়ারিতে শেষবার পরিবারের সঙ্গে কথা হয় তার।
‘সে বলেছিল, সে শিগগিরই দেশে ফিরে এসে বিয়ে করবে,’ বিবিসিকে বলেন হাগোস।
সিগাবুর মা লেতেখ্রিস্টোস তার জন্য পাত্রীও খুঁজছিলেন। কিন্তু ছেলের বিয়ের আয়োজনের বদলে তাকে শেষ পর্যন্ত প্রতীকী শেষকৃত্যের আয়োজন করতে হয়েছে।
‘আমার সব সন্তান মেয়ে, সে-ই ছিল একমাত্র ছেলে। বোনদের অনেক আশা ছিল যে তাদের ভাই শিগগিরই বাড়ি ফিরে আসবে। তারা তার জন্য বিয়ের গান বানাচ্ছিল। এখন, তাদের কষ্ট আমার চেয়েও বেশি,’ বলেন তিনি।
সৌদি আরবে থাকা স্বজনদের কাছ থেকে সিগাবুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর পাওয়ার পর তার পরিবার স্থানীয় একটি গির্জায় প্রতীকী শেষকৃত্য ও প্রার্থনার আয়োজন করে।
তবে ঐতিহ্যবাহী ৪০ দিনের শোক পালন করা তার মা বলেন, ছেলের মরদেহ দেশে না ফেরায় তাদের শোক আরও ভারী হয়ে উঠেছে।
‘আমি জানতে চাই কেন তার মৃতদেহ দেশে আসেনি। এটি আমাদের শোককে আরও ভারী করে তুলেছে, আমাদের হৃদয় ভেঙে দিচ্ছে,’ বলেন তিনি।
সিগাবুর বাবা-মা সৌদি কর্তৃপক্ষের কাছে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের প্রমাণও জানতে চান। অন্য কেউ তাদের ছেলের সরলতার সুযোগ নিয়ে তাকে মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার করেছে কি না, তা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলেছেন।
মাদক মামলায় বিদেশিদের মৃত্যুদণ্ড বেশি
অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের গত বছর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদকসংক্রান্ত অপরাধে সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ৭৫ শতাংশই বিদেশি নাগরিক।
দুয়া ধাইনি বলেন, অপরাধী চক্রগুলো প্রায়ই দুর্বল ও ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে মাদক পাচারের কাজে ব্যবহার করে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, ইথিওপিয়ার কিছু মামলায় আটক ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সীমান্ত পার হওয়ার সহায়তার বিনিময়ে তাদের বিভিন্ন জিনিস বহন করতে প্ররোচিত করা হয়েছিল। আবার কিছু পাকিস্তানি নাগরিককে নিষিদ্ধ পদার্থ গিলতে বাধ্য করার ঘটনাও নথিবদ্ধ করা হয়েছে।
ইউরোপিয়ান সৌদি অর্গানাইজেশন ফর হিউম্যান রাইটসের হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ সালে রাজা সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদ সিংহাসনে আরোহণের পর থেকে সৌদি আরবে ২ হাজারের বেশি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে। এর মধ্যে ৪২ শতাংশই বিদেশি নাগরিক।
সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালে সৌদি আরবে ৩৫৬ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, যা এক বছরে দেশটির সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের রেকর্ড।
সৌদি আইনে দূতাবাসের খরচে মৃতদেহ দেশে ফেরত পাঠানোর সুযোগ রয়েছে। তবে দুয়া ধাইনি বলেন, বাস্তবে এমন ঘটনা তারা জানেন না।
‘মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত কোনো অভিবাসী নাগরিকের মৃতদেহ তাদের পরিবারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। সৌদি নাগরিকদের ক্ষেত্রেও আমাদের নথিবদ্ধ করা ঘটনাগুলোতে একই বিষয় দেখা গেছে,’ বলেন তিনি।
অতীতে তুরস্ক ও জর্ডানের কিছু পরিবার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত স্বজনদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার দাবিতে প্রচারণা চালালেও সফল হয়নি বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, জর্ডানের একটি পরিবারকে দেওয়া মৃত্যুসনদে খুব সংক্ষিপ্ত তথ্য ছিল। সেখানে মৃতদেহ কোথায় সমাহিত করা হয়েছে বা কী পরিস্থিতিতে তার মৃত্যু হয়েছে, সে বিষয়ে কোনো তথ্য ছিল না।
বিবিসি সৌদি আরবের স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং লন্ডনে দেশটির দূতাবাসের কাছে এ বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চেয়েছিল। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ইথিওপিয়ার সৌদি দূতাবাসের কাছেও মন্তব্য জানতে চাওয়া হয়েছে।
সৌদি আরবে বর্তমানে কতজন বন্দী মৃত্যুদণ্ডের অপেক্ষায় রয়েছেন, তা সরকার প্রকাশ করে না। তবে মানবাধিকারকর্মীদের ধারণা, এই সংখ্যা শত শত হতে পারে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকা বিভাগের গবেষক জোই শিয়া বলেন, গোপনে বা কোনো পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা বন্দী ও তাদের পরিবারের মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হওয়ার অধিকার লঙ্ঘন করে।
বিবিসির সঙ্গে কথা বলা এক সৌদি কারাবন্দী জানান, ২০২৩ সালে মাদক পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। নিরাপত্তার কারণে তার পরিচয় ও অবস্থান প্রকাশ করা হয়নি। তিনি বলেন, ক্ষমা পাওয়ার আশায় রয়েছেন।
তার দাবি, চলতি বছর তিনি ১৫ জন সহবন্দীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হতে দেখেছেন। এখন প্রতিটি মুহূর্তেই নিজের মৃত্যুর আশঙ্কায় দিন কাটছে তার।
‘প্রতিবার যখন রক্ষীরা দরজা খোলে, আমরা ভাবতে থাকি এরপর কার পালা আসবে।’
তিনি এখন একটি অলৌকিক ঘটনার মাধ্যমে মুক্তির জন্য প্রার্থনা করছেন। তবে শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে অন্তত তার মরদেহ যেন পরিবারের কাছে ফেরত পাঠানো হয়—এটাই তার শেষ ইচ্ছা।
‘আমি চিন্তায় থাকি যে আমার বাবা-মা হয়তো আমার মৃতদেহটাও দেখতে পারবেন না।’
সূত্র: বিবিসি

