কর্মকর্তা–কর্মচারীদের নেওয়া ১১৬ কোটি টাকা বাড়তি বোনাস, দেড় বছরেও ফেরত পায়নি সোনালী ব্যাংক

আপডেট : ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৪:২৫

নীতিমালা লঙ্ঘন করে সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দেওয়া বাড়তি দুই উৎসাহ বোনাসের ১১৬ কোটি টাকা দেড় বছরেও ফেরত নেওয়া যায়নি। ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়া হয়েছিল। অথচ নীতিমালা অনুযায়ী তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত নিয়ে রাষ্ট্রীয় কোষাগারে জমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়ে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ সোনালী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালককে চিঠি দিয়েছিল আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। সর্বশেষ গত ১১ সেপ্টেম্বরও এ বিষয়ে ব্যাংকটিকে চিঠি দিয়ে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ আদায় করে সমন্বয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

সোনালী ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, ব্যাংকটিতে বোনাস নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা প্রায় ২১ হাজার ৫০০। নিয়মিত তিনটির পাশাপাশি তারা বাড়তি দুটি উৎসাহ বোনাস নিয়েছেন। প্রতিটি বোনাসের অর্থ মূলত এক মাসের মূল বেতনের সমান। ব্যাংকের একজন শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তার হিসাবে একটি বোনাসের পরিমাণ প্রায় ৬০ কোটি টাকা। সে হিসাবে বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ প্রায় ১১৬ কোটি টাকা।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই দিন পর ৭ আগস্ট সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আফজাল করিমকে অবরুদ্ধ করে একশ্রেণির কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাদের দাবি ছিল, বছরে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দিতে হবে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের নির্দেশনা অনুযায়ী তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ ছিল না।

বোনাসের দাবিতে আন্দোলন চলার একপর্যায়ে ২০ আগস্ট পদত্যাগ করতে বাধ্য হন ব্যাংকটির তৎকালীন চেয়ারম্যান জিয়াউল হাসান সিদ্দিকী। এর আগে তার নেতৃত্বাধীন পরিচালনা পর্ষদ চাপের মুখে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে পাঁচটি উৎসাহ বোনাস অনুমোদন করে। বিষয়টি নিয়ে নিরীক্ষা আপত্তিও ওঠে। বাংলাদেশ ব্যাংকও এতে সম্মতি দেয়নি।

পরে ২০২৫ সালের ২৭ মার্চ আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে চিঠি দিয়ে বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ ফেরত নেওয়ার নির্দেশ দেয়। তবে দেড় বছর পরও তা আদায় করা হয়নি।

আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, ২০২৩ সালের নীতিমালা এবং ২০২৫ সালের নীতিমালা কোনোটিতেই সোনালী ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাঁচটি বোনাস নেওয়ার সুযোগ ছিল না। বোনাস দেওয়ার পর সোনালী ব্যাংক তা অনুমোদনের জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগে আবেদন করে এবং নীতিমালা লঙ্ঘনের জন্য ক্ষমাও চায়। তবে বিভাগটি নিজেদের নীতিমালা লঙ্ঘন করে পাঁচটি বোনাস অনুমোদন করেনি।

গত ১১ সেপ্টেম্বর সোনালী ব্যাংকের এমডিকে দেওয়া চিঠিতে ২০২৩ সালের পারফরম্যান্সের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস দেওয়ার বিষয়ে অসম্মতি জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে নীতিমালাবহির্ভূতভাবে দেওয়া বাড়তি দুই বোনাসের অর্থ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে আদায় করে সমন্বয় করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরভিত্তিক পরিদর্শন প্রতিবেদনেও বিষয়টি উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০২৫ সালের ১১ মার্চ সোনালী ব্যাংকের এমডিকে দেওয়া চিঠিতে জানায়, ২০২৩ সালের জন্য পাঁচটি উৎসাহ বোনাস বাবদ ব্যাংকটি ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধ করেছে এবং ২০২৪ সালের জন্য ৪০০ কোটি টাকা সংস্থান রেখেছে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংক আরও জানায়, সোনালী ব্যাংকের নিজস্ব বোনাস নীতিমালা অনুযায়ীও তিনটির বেশি বোনাস দেওয়ার সুযোগ নেই। এরপরও ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত ব্যাংকের ৮৭০তম পর্ষদ বৈঠকে পাঁচটি বোনাস দেওয়ার প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়।

ওই অনুমোদনে শর্ত দেওয়া হয়েছিল, ভবিষ্যতে কোনো নিরীক্ষা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে আপত্তি উঠলে বাড়তি টাকা ফেরত দিতে হবে এবং সংশ্লিষ্টদের ব্যক্তিগত অঙ্গীকারনামা দিতে হবে।

এদিকে সরকারি ব্যাংকগুলোতে ঢালাওভাবে উৎসাহ বোনাস দেওয়ার প্রবণতা ঠেকাতে ২০২৫ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর নতুন নির্দেশিকা জারি করে আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ। এতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক, বিশেষায়িত ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের উৎসাহ বোনাস দেওয়ার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সূচকে মূল্যায়ন বাধ্যতামূলক করা হয়।

সোনালী, অগ্রণীসহ ছয় রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের কর্মীদের বোনাস দেওয়ার আগে পাঁচটি সূচক মূল্যায়ন করতে হবে। এগুলো হলো চলতি মূলধনের ওপর নিট মুনাফার হার, আমানতের পরিমাণ বৃদ্ধির হার, ঋণ ও অগ্রিমের পরিমাণ বৃদ্ধির হার, শ্রেণিকৃত ঋণ থেকে নগদ ও সমন্বয়ের মাধ্যমে আদায়ের হার এবং অবলোপনকৃত ঋণ থেকে নগদ আদায়ের হার।

নতুন নির্দেশনায় মোট নম্বরের ভিত্তিতে বোনাসের সংখ্যা নির্ধারণের বিধান রাখা হয়েছে। সর্বোচ্চ তিনটি উৎসাহ বোনাস দেওয়া যাবে। নম্বর কম হলে বোনাসের সংখ্যাও কমবে এবং নির্ধারিত মানের নিচে থাকলে কোনো বোনাস দেওয়া হবে না।

ইত্তেফাক/এসএ