গাজীপুরে এক মাদরাসা অধ্যক্ষকে তুলে নিয়ে নির্যাতন, হত্যা ও লাশ গুমের অভিযোগে পুলিশের কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাবেক প্রধান মো. আসাদুজ্জামানসহ পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
এর আগে গাজীপুরে মাদরাসা অধ্যক্ষ আল আমিনকে গুম করার অভিযোগে প্রসিকিউশনের দায়ের করা পৃথক একটি আবেদন আমলে নিয়েছে ট্রাইব্যুনাল।
রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন বিচারিক প্যানেল অভিযোগ আমলে নিয়ে এ আদেশ দেয়।
প্যানেলের অন্য দুই সদস্য হলেন— বিচারপতি মো. শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মো. মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মামলায় অভিযুক্ত অন্য চার পুলিশ কর্মকর্তা হলেন— তৎকালীন সিটিটিসির অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) ইশতিয়াক আহমেদ, পরিদর্শক মো. আসাদুজ্জামান মিয়া ও মো. মেজবাহ উদ্দিন আহাম্মেদ এবং উপ-পরিদর্শক (এসআই) তৌহিদুল ইসলাম সুমন।
এর আগে গত ১৬ সেপ্টেম্বর (বুধবার) প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ওই পাঁচ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করা হয়।
প্রসিকিউশন সূত্র জানিয়েছে, মামলাটিতে প্রত্যক্ষদর্শীসহ মোট ৩০ জনের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৩(২) এবং ৪(১), ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় মানবতাবিরোধী অপরাধ (হত্যা, নির্যাতন ও গুম) সংঘটনের প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়া গেছে।
যেভাবে গুম ও হত্যা
প্রসিকিউশনের অভিযোগে বলা হয়েছে, সরকারের নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তের সমালোচক হওয়ায় ২০২৩ সালের ৩০ জানুয়ারি গাজীপুরের চতর এলাকার ‘মাদরাসা ইবনে মাসউদ’ -এর অধ্যক্ষ মাওলানা আবুল হোসেন আল-আমিনকে তুলে নিয়ে যায় সিটিটিসি। এরপর তাকে রাজধানীর মিন্টো রোডে সিটিটিসি কার্যালয়ে ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অবৈধভাবে আটকে রাখা হয়।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, টানা ১৮ দিন আটকে রেখে এডিসি ইশতিয়াকের নেতৃত্বে ওই অধ্যক্ষের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। এতে তার জীবন সংকটাপন্ন হয়ে পড়লে ১৮ ফেব্রুয়ারি রাজারবাগ কেন্দ্রীয় পুলিশ হাসপাতালে নেওয়া হয়; সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
হত্যার দায় এড়াতে অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা অধ্যক্ষ আবুল হোসেনের মৃতদেহ ঢাকার কেরানীগঞ্জের লাকিরচর এলাকায় ধলেশ্বরী নদীর ওপর তুলসীখালী ব্রিজ থেকে পানিতে ফেলে গুম করে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রসিকিউশন জানায়, ওই সময় মোট পাঁচজনকে ধরে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছিল। এর মধ্যে অধ্যক্ষ আবুল হোসেনকে হত্যা করে লাশ গুম করা হয়। বাকি চারজনকে পিটিয়ে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়।
‘জঙ্গি নাটকের আড়ালে’ গুম-হত্যা
প্রসিকিউশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পতিত শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখতে এবং ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে সিটিটিসি ‘জঙ্গি নাটকের’ আড়ালে বিরোধী মতাদর্শীদের ওপর পদ্ধতিগত গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্যাতন চালাতো।
তৎকালীন সিটিটিসি প্রধান আসাদুজ্জামানের প্রত্যক্ষ নির্দেশ ও পরিকল্পনায় অধ্যক্ষ আবুল হোসেনকে হত্যা করা হয় বলেও প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ট্রাইব্যুনালকে জানানো হয়েছে।

