শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয় দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষের আখড়া হিসেবে পরিচিত। ঘুষের বিনিময়ে দুই কলেজের পাঁচ শিক্ষকের ৬৩ লাখ টাকার বকেয়া বিল অনুমোদন দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে মাউশির ঢাকা অঞ্চলের তত্কালীন পরিচালক প্রফেসর ফকির মো. নূরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। এমপিও নীতিমালা অনুযায়ী এই পাঁচ শিক্ষক তাদের বকেয়া বিল পাওয়ার যোগ্য নন। এ কারণে এই অফিসের উপ-পরিচালক (ডিডি) ও সহকারী পরিচালক (এডি) লিখিত আপত্তিও জানিয়েছিলেন। কিন্তু নীতিমালা উপেক্ষা করে পরিচালক একক ক্ষমতাবলে বিধিবহির্ভূতভাবে এসব বিল অনুমোদন করেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র ইত্তেফাককে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
জানা গেছে, রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলাধীন ড. কাজী মোতাহার হোসেন কলেজের পাঁচ জন প্রভাষককে বকেয়া বেতন ভাতা বিধিবহির্ভূতভাবে অনুমোদন করা হয়েছে। এরমধ্যে সংগীতের প্রভাষক মৃত্যুঞ্জয় পাঠকের অনুমোদন দেওয়া বকেয়া বিল ছিল ২০ লাখ ১০ হাজার ৪৭৬ টাকা। এছাড়া প্রভাষক আব্দুল্লাহ আল মামুনের ৭ লাখ ৩৭ হাজার টাকা, প্রভাষক জাহিদুল ইসলামের ৯ লাখ ৩১ হাজার ও প্রভাষক রফিকুল ইসলাম ৬ লাখ ৯২ হাজার টাকা বকেয়া বিল বাবদ উঠিয়ে নিয়েছেন।
একইভাবে মাউশির ঢাকা অফিসের তত্কালীন পরিচালক প্রফেসর ফকির মো. নূরুজ্জামান গোপালগঞ্জ জেলার কোটালীপাড়া উপজেলাধীন কাহী মন্টু কলেজের সংগীতের প্রভাষক প্রশান্ত কুমার মধুর দাখিলকৃত ২০ লাখ ৩৪ হাজার ৬৪১ টাকার বকেয়া বিল অনুমোদন করেন বিধিবহির্ভূতভাবে। উল্লেখ্য, প্রফেসর ফকির মো. নুরুজ্জামান গত ৬ আগস্ট বদলিজনিত কারণে অবমুক্ত হওয়ার পূর্বে এসব অবৈধ বিল অনুমোদন করেন। বর্তমানে তিনি অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) গেছেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২৮ মার্চ ২০২১ তারিখে জনবল কাঠামো ও এমপিও নীতিমালা-২০২১ জারির পূর্বে নবনিযুক্ত শিক্ষকদের বকেয়া প্রদানের নিয়ম ছিল না। উক্ত নীতিমালার ১৭.৭ ধারা মোতাবেক এনটিআরসিএ কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত শিক্ষক/কর্মকর্তাদের যোগদানের তারিখ হতে বকেয়া প্রদানের কথা উল্লেখ রয়েছে, যা ৪ ডিসেম্বর ২০২৫-এ জারিকৃত এমপিও নীতিমালা-২০২৫ এও বলবত্ রয়েছে। ঐ শিক্ষকগণ এনটিআরসিএ কর্তৃক সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে যোগদান করেননি। ২০২১-এর নীতিমালা জারির অনেক আগেই তারা যোগদান করেছিলেন বিধায় এমপিও নীতিমালা ২০১৫-এর ১১.১৬ এবং ১৭.৭ ধারা মোতাবেক এসব বকেয়া বেতন-ভাতা প্রদানের কোনো সুযোগ নেই।
যোগ্যতাবিহীন শিক্ষকদের এমপিওভুক্তকরণ: নারায়ণগঞ্জ জেলার সদর থানাধীন নারায়ণগঞ্জ গার্লস স্কুল অ্যান্ড কলেজের ১০ জন শিক্ষককে আইন ও বিধি বহির্ভূতভাবে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে। এই ক্ষেত্রেও ফকির মোহাম্মদ নূরুজ্জামান তার একক সিদ্ধান্তে গত ২৮ জুন এসব এমপিও ফাইল অনুমোদন করেন। প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালের জুলাই মাসে এমপিওভুক্ত হয়। ২০২৩ সালের ১৩ জুন আঞ্চলিক যাচাই কমিটির প্রতিবেদনে দেখা যায় যে, কলেজ শাখার ১৫ জন শিক্ষকের মধ্যে ১০ জনেরই নিয়োগকালে নিবন্ধন সনদ ছিল না। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ সংক্রান্ত ২০০৫ সালের ১ নম্বর আইনের ১০(২) ধারা মোতাবেক নিবন্ধন সনদ ছাড়া শিক্ষক হিসেবে নিয়োগের সুযোগ নেই। এসব বিষয়ে মামলা ও তদন্ত চলমান ছিল। সবকিছু উপেক্ষা করে কাম্য যোগ্যতাবিহীন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকদের এমপিওভুক্ত করা হয়।
জাল কাগজপত্র সত্ত্বেও এমপিওভুক্তকরণ ও বকেয়া বিল প্রদান: সূত্র জানায়, গাজীপুর জেলার সদর উপজেলাধীন সাহাজ উদ্দিন সরকার স্কুল অ্যান্ড কলেজের অন্তত ১০ থেকে ১২ জন শিক্ষক ও কর্মচারীকে (ল্যাব সহকারীসহ) কাম্য যোগ্যতাবিহীন ও নিয়োগসংক্রান্ত জাল কাগজপত্রের মাধ্যমে এমপিওভুক্ত ও পরবর্তীতে বকেয়া বিল বিধিবহির্ভূতভাবে অনুমোদন করেন মো. নূরুজ্জামান। ২০২৫ সালে এসব বিল অনুমোদন করা হয়। ইংরেজি বিষয়ের প্রভাষক জান্নাতুল ফেরদৌসের নিয়োগকালীন সময়ে নিবন্ধন সনদ ছিল না। তার নিয়োগ দেখানো হয়েছে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবর। ২০১৫ থেকে ২০২৫ সালে এমপিওভুক্ত হওয়া পর্যন্ত ব্যানবেইস ডাটাবেসে তার নাম পাওয়া যায়নি। অথচ ২০২৩ সালের ৬ এপ্রিলে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ জারিকৃত পরিপত্র মোতাবেক নতুন এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি এমপিওভুক্তির জন্য যোগদানের পর থেকে বছরভিত্তিক ব্যানবেইস ডাটাবেজে নাম থাকা আবশ্যক। এছাড়া উক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের এমপিওভুক্তির জন্য জেলা যাচাই-বাছাই কমিটির প্রত্যয়নও জাল বলে প্রতীয়মান হয়। একজন সদস্যের স্বাক্ষর জাল করা হয়েছে বলে ডিডি-এডির তদন্তে উঠে আসে।
অভিযোগের ব্যাপারে ফকির মো. নূরুজ্জামান ইত্তেফাককে বলেন, ‘নিয়ম মেনেই শিক্ষকদের বকেয়া বিল অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। আমি দায়িত্ব পালনকালে বিধিবহির্ভূত কোনো কাজ আমি করিনি। এমপিওভুক্তকরণের ক্ষেত্রে বিগত অন্তবর্তীকালীন সরকারের সময় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের লিখিত নির্দেশনা ছিল বলে দাবি করেন তিনি।’
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের ঢাকা আঞ্চলিক কার্যালয়ের বর্তমান পরিচালক প্রফেসর মো. ইদ্রিস আলী গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার আগে এসব বকেয়া বিল অনুমোদন ও এমপিওভুক্তকরণের ঘটনা ঘটেছে। তবে বিষয়টি যেহেতু জানতে পেরেছি, তাই এটা খতিয়ে দেখবেন বলে জানান তিনি।

