এই মানুষের ভিড়ে ‘সেই মানুষ’ কোথায়?

আপডেট : ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৪৫

আজিকার সমাজ মানুষে মানুষে ঠাসা; কিন্তু সেইখানে যেন ‘প্রকৃত মানুষ’ নাই। শহর বাড়িতেছে, দালান উঠিতেছে, প্রযুক্তি হাতের মুঠায় আসিতেছে, সভ্যতার গায়ে লাগিতেছে আধুনিকতার নিত্যনূতন পালক; তথাপি কোথায় যেন হারাইয়া যাইতেছে মানুষের সেই চিরচেনা পরিচয়টি। মায়ামমতা, বিবেক, সহমর্মিতা, সংযম প্রভৃতি সদ্‌গুণের দুর্ভিক্ষের এই ক্ষণে দাঁড়াইয়া ‘এই দুনিয়া এখন তো আর সেই দুনিয়া নাই, মানুষ নামের মানুষ আছে দুনিয়া বোঝাই, এই মানুষের ভিড়ে আমার সেই মানুষ নাই’-জনপ্রিয় এই বাংলা গানের কথাই যেন সত্য বলিয়া প্রমাণ হইতেছে। চারিপাশের নানা নির্মম ঘটনা আইনস্টাইনের বহুল প্রচলিত সেই কথাটিও প্রাসঙ্গিক করিয়া তুলিয়াছে; তিনি বলিয়াছেন, ‘সফল মানুষ হওয়ার চাইতে মূল্যবোধসম্পন্ন মানুষ হওয়ার চেষ্টা করাই শ্রেয়।’ তবে আমাদের দুর্ভাগ্য, মূল্যবোধের সেই শিক্ষা আমরা কেবল বইয়ের পাতায় রাখিয়াই জীবন চালাইতেছি, জীবনের বাস্তবতায় তাহার প্রয়োগ নাই।

সম্প্রতি চুয়াডাঙ্গায় ১১ মাস বয়সি এক শিশুকে বিষাক্ত কীটনাশক প্রয়োগে হত্যাচেষ্টার অভিযোগ উঠিয়াছে শিশুটির মায়ের বিরুদ্ধে। পারিবারিক কলহের জেরেই এমন জঘন্য ঘটনা ঘটিয়াছে বলিয়া অভিযোগ। পরিবারে অশান্তি থাকিবে, দাম্পত্যে টানাপড়েন থাকিবে, অভাব-অনটন থাকিবে: কিন্তু তাহার দায় একটি নিষ্পাপ শিশুকে কেন বহন করিতে হইবে? উদ্বেগের আরও কারণ, ইউনিসেফের তথ্য বলিতেছে, বাংলাদেশে এক হইতে ১৪ বছর বয়সি শিশুর বিপুলসংখ্যক নিয়মিত সহিংসতার শিকার। অর্থাৎ, ‘সহিংসতার সংস্কৃতি’ অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিশুর জীবনে বাহিরের পৃথিবী নহে, বরং আপন ঘরের দরজা দিয়াই প্রবেশ করিতেছে। ইহা কীসের আলামত? এই দায় কাহার?

সাম্প্রতিক আরও কয়েকটি ঘটনা আমাদের বিবেককে নাড়া দিয়াছে। খুলনায় 'ভাত চুরি' করিয়া খাওয়ার অভিযোগে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে মারধর এবং ছাদ হইতে ফালাইয়া হত্যার অভিযোগ উঠিয়াছে। উচ্চশিক্ষার স্বপ্ন লইয়া বাড়ি ছাড়িয়া আসা একজন তরুণকে শেষ পর্যন্ত লাশ হইয়া ফিরিতে হইতেছে-এ কেমন সমাজ? আবার, একটি মোবাইল ফোনকে কেন্দ্র করিয়া কিশোর অপ্রতীমের প্রাণহানির ঘটনাও আমাদের সামনে একই প্রশ্ন রাখিয়াছে যে, এক প্লেট ভাত, একটি ফোন কিংবা সামান্য কোনো বিরোধ কি মানুষের জীবনের চাইতেও বড়? আমরা এই সহজ সত্যটুকুও কীভাবে ভুলিয়া যাইতেছি?

সবচাইতে ভয়ংকর হইল, আইন নিজের হাতে তুলিয়া লইবার প্রবণতা। সন্দেহ হইলেই পিটুনি, অভিযোগ উঠিলেই বিচার, আর উত্তেজিত জনতার হাতে মানুষের প্রাণ-ইহা কোনো সভ্য সমাজের চিত্র হইতে পারে না। আইনের শাসন এবং বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থা দুর্বল হইলে এই প্রবণতা আরও ভয়ংকর হইয়া উঠিতে পারে। প্রতিদিন পত্রপত্রিকাগুলির পাতায় এমন সকল নিষ্ঠুর ঘটনার সংবাদ পাওয়া যাইতেছে, যাহার প্রেক্ষাপটে আমাদের এখন কেবল অপরাধীর শাস্তির কথা ভাবিলেই চলিবে না, পাশাপাশি ভাবিতে হইবে-হঠাৎ কী এমন হইল, যাহার কারণে এমন সকল ভয়ানক অপরাধের জন্ম হইতেছে? আমরা মনে করি, ইহার জন্য সর্বাগ্রে দায়ী সমাজজীবনে ‘মূল্যবোধের অভাব’। কারণ, আইন অপরাধীকে শাস্তি দিতে পারে; কিন্তু অপরাধী তৈরি হওয়া ঠেকাইতে জরুরি মূল্যবোধের শিক্ষার বিস্তার। এই দুইয়ের সমন্বয় ছাড়া সুস্থ সমাজ গড়া সম্ভব নহে। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমনটি বলিয়াছেন, ‘মনুষ্যত্বের শিক্ষাই চরম শিক্ষা, আর সমস্তই তাহার অধীন।’ অতএব, সুস্থ-সুন্দর সমাজজীবন গঠনে মূল্যবোধের শিক্ষার কোনোই বিকল্প নাই। এই কারণে পরিবারে সহনশীলতা, বিদ্যালয়ে নৈতিক শিক্ষা, তরুণদের মানসিক ও সামাজিক সহায়তা, মাদকবিরোধী কার্যক্রম এবং দ্রুত ও দৃশ্যমান আইনি ব্যবস্থা প্রভৃতি সকল কিছুকে একই সামাজিক উদ্যোগের অংশ করিবার ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বারবার তাগাদা দিতেছেন।

মহান আল্লাহ তায়ালা সতর্ক করিয়া বলিয়াছেন-‘তোমরা পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করিও না।’ অথচ আমরা যেন ক্রমেই সেই নিষেধাজ্ঞার বিপরীত পথে হাঁটিতেছি। আজ তাই প্রশ্নটি কেবল আইনশৃঙ্খলার নহে, বরং প্রশ্নটি 'মানুষ' হওয়ার। অগণিত মানুষে ভরা এই পৃথিবীতে যদি একজন অসহায় শিশুও নিরাপদ না থাকে, যদি ক্ষুধার্ত তরুণের ভাগ্যে দুই মুঠো ভাতের পরিবর্তে জোটে লাঞ্ছনা-মৃত্যু কিংবা কোনো তুচ্ছ বস্তু মানুষের জীবনের চাইতে মূল্যবান হইয়া উঠে, তাহা হইলে আমাদের সত্যিই এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজিয়া দেখিবার সময় আসিয়াছে যে, সমাজে মানুষ আছে;, কিন্তু ‘সেই মানুষটি’ কোথায় হারাইয়া গেল?

ইত্তেফাক/এমএস

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন