‘শুধু পরিস্থিতি সামাল দিতে স্যরি বলা উচিত নয়’

 

 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
আপডেট : ০৩ নভেম্বর ২০২৬, ২২:৩০

কাউকে কষ্ট দেওয়ার পর মুখে ‘সরি’ বলা সহজ হলেও সেই কথায় সব অভিমান দূর হয় না। সম্পর্কের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে প্রয়োজন নিজের আচরণের প্রভাব বোঝা, ভুলের দায় স্বীকার করা এবং ভবিষ্যতে পরিবর্তনের প্রমাণ দেওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লিনিক্যাল মনোবিজ্ঞানী মলি হাওয়েসের মতে, আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর চারটি ধাপ অনুসরণ করলে ব্যক্তিগত সম্পর্কে তৈরি হওয়া দূরত্ব কমানো এবং পারস্পরিক আস্থা ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

নিজের লেখা ‘এ গুড অ্যাপোলজি: ফোর স্টেপস টু মেক থিংস রাইট’ বইয়ে হাওয়েস কার্যকর ক্ষমা প্রার্থনার চারটি ধাপ ব্যাখ্যা করেছেন। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা ও পরামর্শদানের অভিজ্ঞতার আলোকে তিনি দেখিয়েছেন, কীভাবে ভুলের দায় নেওয়া এবং আচরণে পরিবর্তন আনার মাধ্যমে সম্পর্কের ক্ষতি মেরামতের চেষ্টা করা যায়।

ক্ষমা চাওয়া কঠিন কেন?
নিজের ভুল স্বীকার করা অনেকের জন্যই সহজ নয়। হাওয়েসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, মানুষ সাধারণত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে অভ্যস্ত। নিজের আচরণ বা সিদ্ধান্ত ভুল ছিল কি না, তা নতুন করে পর্যালোচনা করতে মানসিক পরিশ্রম প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিজের কাজের কারণে অন্য কেউ কতটা কষ্ট পেয়েছেন, সেটিও অনেক সময় উপলব্ধি করা যায় না।

নিজের সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা ধরে রাখার প্রবণতাও ক্ষমা চাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কেউ নিজেকে ভালো মানুষ মনে করলে তার আচরণে অন্য কেউ আঘাত পেয়েছেন—এ বাস্তবতা মেনে নিতে অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। নিজের ভালো মানুষ হওয়ার বিশ্বাসের সঙ্গে অন্যকে কষ্ট দেওয়ার বিষয়টি সাংঘর্ষিক মনে হওয়ায় অনেকেই আত্মপক্ষ সমর্থনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

এ ছাড়া সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশও মানুষের আচরণে প্রভাব ফেলে। আত্মবিশ্বাসী থাকা, নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকা কিংবা ভুল স্বীকার না করাকে দৃঢ়তার পরিচয় হিসেবে দেখার প্রবণতা থাকলে ক্ষমা চাওয়ার মানসিকতা তৈরি করা কঠিন হয়ে পড়ে।

প্রথম ধাপ: আগে শুনুন, পরে বলুন ‘সরি’
হাওয়েসের মতে, আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনার শুরুতেই ‘সরি’ বলার প্রয়োজন নেই। বরং যাকে কষ্ট দেওয়া হয়েছে, তার অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি মনোযোগ দিয়ে শোনা জরুরি। এ সময় নিজের উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করা কিংবা নিজেকে নির্দোষ প্রমাণের চেষ্টা না করে অন্য ব্যক্তির ওপর নিজের আচরণের প্রভাব বোঝার দিকে মনোযোগ দিতে হবে।

অনেক সময় আমরা ধরে নিই, কাছের মানুষটি কেন কষ্ট পেয়েছেন, তা আমাদের জানা আছে। কিন্তু বাস্তবে তার অনুভূতির কারণ বা ঘটনার প্রভাব সম্পর্কে আমাদের ধারণা অসম্পূর্ণ হতে পারে। তাই অপর ব্যক্তিকে নিজের অভিজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ দিতে হবে। মাঝপথে বাধা দেওয়া, যুক্তি দেখানো কিংবা তার অনুভূতিকে ছোট করে দেখার প্রবণতা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।

দ্বিতীয় ধাপ: নিজের ভুলের দায় স্বীকার করুন
অন্যের অভিজ্ঞতা মন দিয়ে শোনার পর নিজের আচরণের দায় নেওয়ার পালা। এ পর্যায়ে আত্মপক্ষ সমর্থন না করে স্বীকার করতে হবে, নিজের কাজ বা কথায় অপর ব্যক্তি কষ্ট পেয়েছেন।

‘তুমি কষ্ট পেয়ে থাকলে আমি দুঃখিত’ কিংবা ‘তুমি আমাকে ভুল বুঝেছ বলে দুঃখিত’—এ ধরনের বক্তব্যে ক্ষমা প্রার্থনার দায় পরোক্ষভাবে অন্য ব্যক্তির অনুভূতি বা উপলব্ধির ওপর চাপানো হয়। এর পরিবর্তে ‘আমার আচরণে তোমাকে কষ্ট দিয়েছি, এ জন্য আমি দুঃখিত’—এভাবে বলা বেশি দায়িত্বশীল।

তবে কাউকে কষ্ট দেওয়ার অর্থ সব সময় ইচ্ছাকৃতভাবে অন্যায় করা নয়। ভুল বোঝাবুঝি কিংবা অনিচ্ছাকৃত আচরণেও অন্য ব্যক্তি আঘাত পেতে পারেন। হাওয়েসের মতে, ক্ষমা চাওয়ার উদ্দেশ্য নিজেকে শাস্তির মুখে ঠেলে দেওয়া নয়; বরং নিজের আচরণের প্রভাব বুঝে সম্পর্ক মেরামতের দায়িত্ব নেওয়া।

তৃতীয় ধাপ: ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নিন
শুধু দুঃখ প্রকাশ করলেই সম্পর্কের ক্ষতি দূর হয় না। ভুলের কারণে যে ক্ষতি হয়েছে, তা পুষিয়ে দেওয়ার জন্য বাস্তব কোনো উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি। ব্যক্তিগত সম্পর্কে এই ক্ষতিপূরণ সব সময় অর্থ বা বস্তু দিয়ে করতে হয় না। অনেক ক্ষেত্রে আন্তরিক কোনো উদ্যোগ কিংবা নতুন করে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা তৈরির চেষ্টা যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

যেমন, কারও গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েও যেতে না পারলে পরে তার সঙ্গে বিশেষ সময় কাটানোর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। কোনো প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ হলে নতুন করে সেটি পূরণের সুযোগ চাওয়া যায়।

অতীতের ঘটনা পরিবর্তন করা সম্ভব নয়। তবে সেই ঘটনার কারণে তৈরি হওয়া কষ্ট কমাতে এবং সম্পর্কের মধ্যে ইতিবাচক অভিজ্ঞতা ফিরিয়ে আনতে চেষ্টা করা যায়। হাওয়েসের মতে, এ ধরনের উদ্যোগ সম্পর্কের দুই পক্ষকে নতুনভাবে একসঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়।

চতুর্থ ধাপ: একই ভুলের পুনরাবৃত্তি ঠেকান
ক্ষমা প্রার্থনার শেষ ধাপ হলো নিজের আচরণে স্থায়ী পরিবর্তন আনা। অনেক সময় অপর ব্যক্তি ক্ষমা করে দিলে কিংবা সম্পর্ক স্বাভাবিক হতে শুরু করলে মানুষ মনে করেন, সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। কিন্তু একই ভুলের পুনরাবৃত্তি হলে পুরোনো কষ্ট আবারও ফিরে আসতে পারে।

তাই শুধু ‘আর এমন হবে না’ বলে প্রতিশ্রুতি দিলেই চলবে না। যে অভ্যাস বা পরিস্থিতির কারণে ভুলটি ঘটেছে, সেটি পরিবর্তনের উদ্যোগ নিতে হবে। যেমন, সময়মতো দায়িত্ব পালন করতে না পারার কারণে সম্পর্কে সমস্যা তৈরি হলে সময় ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনতে হবে। বারবার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের ঘটনা ঘটলে নিজের সক্ষমতা বিবেচনা করে বাস্তবসম্মত প্রতিশ্রুতি দেওয়া প্রয়োজন।

হাওয়েসের মতে, পরিবর্তনের পক্ষে কার্যকর ব্যবস্থা না থাকলে ভালো উদ্দেশ্যও শেষ পর্যন্ত কাজে নাও আসতে পারে। তাই ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি একই ভুল এড়ানোর বাস্তব পরিকল্পনা থাকা জরুরি।

ভাঙা সম্পর্ক কি নতুনভাবে গড়ে তোলা সম্ভব?
সম্পর্ক মেরামতের বিষয়টি বোঝাতে হাওয়েস জাপানি শিল্পধারণা ‘কিনৎসুকুরোই’-এর উদাহরণ দিয়েছেন। এ পদ্ধতিতে ভেঙে যাওয়া মাটির পাত্রের ফাটল সোনালি উপাদান দিয়ে জোড়া লাগানো হয়। এতে ভাঙনের চিহ্ন পুরোপুরি আড়াল না করে বরং সেটিকেই নতুন সৌন্দর্যের অংশ হিসেবে তুলে ধরা হয়।

মানুষের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও ভুল বা আঘাতের স্মৃতি পুরোপুরি মুছে ফেলা সম্ভব নাও হতে পারে। তবে সেই অভিজ্ঞতার পর সম্পর্ক কীভাবে মেরামত করা হচ্ছে, তা ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। দুই পক্ষ যখন নিজেদের অনুভূতি ভাগ করে নেন, ক্ষতির দায় স্বীকার করেন এবং সম্পর্ক ঠিক করার জন্য একসঙ্গে কাজ করেন, তখন নতুন ধরনের বোঝাপড়া তৈরি হতে পারে।

ক্ষমা গ্রহণেও প্রয়োজন সময়
ক্ষমা চাওয়ার মতো ক্ষমা গ্রহণের ক্ষেত্রেও তাড়াহুড়া করা উচিত নয়। অনেক সময় সম্পর্ক স্বাভাবিক করার আশায় কষ্ট পাওয়া ব্যক্তি নিজের অনুভূতি পুরোপুরি প্রকাশ করার আগেই ক্ষমা করে দেন। এতে ঘটনার প্রকৃত কারণ কিংবা সমস্যার গভীরতা অমীমাংসিত থেকে যেতে পারে।

হাওয়েসের পরামর্শ, নিজের কষ্ট বুঝতে এবং তা প্রকাশ করতে প্রয়োজনীয় সময় নেওয়া উচিত। তাৎক্ষণিকভাবে কথা বলার মানসিক প্রস্তুতি না থাকলে পরে আলোচনার জন্য সময় নির্ধারণ করা যেতে পারে। ক্ষমা গ্রহণ করলেই যে সঙ্গে সঙ্গে সবকিছু আগের মতো হয়ে যেতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই।

কখন ক্ষমা চাওয়া উচিত নয়?
হাওয়েসের মতে, আন্তরিকতা ছাড়া ক্ষমা চাওয়ার বিশেষ কোনো মূল্য নেই। শুধু পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কিংবা অন্য ব্যক্তিকে শান্ত করার জন্য এমন কথা বলা উচিত নয়, যা নিজের উপলব্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

একইভাবে, কেউ যদি স্পষ্টভাবে যোগাযোগ বন্ধ করে দেন কিংবা নির্দিষ্ট ঘটনা নিয়ে আর কথা বলতে না চান, তাহলে তার সিদ্ধান্ত ও ব্যক্তিগত সীমারেখার প্রতি সম্মান দেখানো জরুরি। ক্ষমা চাওয়ার ইচ্ছা থাকলেও তা চাপিয়ে দেওয়া ঠিক নয়।

সরাসরি ক্ষমা চাওয়ার সুযোগ না থাকলেও নিজের আচরণ পর্যালোচনা করা, ভুল থেকে শিক্ষা নেওয়া এবং ভবিষ্যতে একই ধরনের ক্ষতি না করার চেষ্টা করা সম্ভব। কারণ, আন্তরিক ক্ষমা প্রার্থনার সার্থকতা শুধু মুখের কথায় নয়; বরং দায়িত্ব স্বীকার ও আচরণে ইতিবাচক পরিবর্তনের মধ্যেই প্রকাশ পায়।

 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
 
ইত্তেফাক/এসজেএস